বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাঁচ দশকের বেশি সময়ের দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। ছাত্ররাজনীতির উত্তাল দিন থেকে শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি, স্থানীয় সরকার, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব—জীবনের একের পর এক সংগ্রামী অধ্যায় পেরিয়ে- বিপুল ভোটে আজ তিনি হলেন- বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
৭৮ বছর বয়সে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মির্জা ফখরুলের এই যাত্রা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, নানা উত্থান-পতন, আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব, কারাবরণ, দলীয় দুঃসময়ে সংগঠনকে ধরে রাখা এবং রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা ও প্রশাসনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা। একজন ছাত্রনেতা থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছানোর এই পথ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম, শেকড় পঞ্চগড়ে
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শহরের কালীবাড়ি এলাকায় তার শৈশব ও বেড়ে ওঠা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা নেন ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকের জন্য ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা ঠাকুরগাঁওয়ে হলেও মির্জা ফখরুলের পারিবারিক শেকড় রয়েছে পঞ্চগড়ে। পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামই তার পৈতৃক নিবাস। তার বাবা মির্জা রুহুল আমীন এবং চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ—দুজনেরই জন্ম এই গ্রামে।
|
মির্জাপুরের নামেই গড়ে উঠেছে মির্জাপুর ইউনিয়ন। ওই গ্রামের সম্ভ্রান্ত মির্জা পরিবারে জন্মেছিলেন মির্জা ফখরুলের বাবা মির্জা রুহুল আমীন, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘চোখা মিয়া’ নামে পরিচিত ছিলেন। শিক্ষকতা ও আইন পেশার পাশাপাশি রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজনীতিতেও সক্রিয় হন এবং সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের আরেক উজ্জ্বল নাম মির্জা গোলাম হাফিজ। ১৯২০ সালের ২ জানুয়ারি মির্জাপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া মির্জা গোলাম হাফিজ আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ভূমি প্রশাসন মন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
একই পরিবারের দুই ভাইয়ের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ছিল। সেই রাজনৈতিক পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের মির্জা ফখরুলও দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। আজ রাষ্ট্রপতির পদে তার অভিষেক সেই পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করল।

ছাত্রজীবনেই রাজনীতির হাতেখড়ি
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ছাত্রজীবনেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় তিনি বামপন্থী ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্ব দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি এবং এসএম হল শাখার নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি।
১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন মির্জা ফখরুল। সেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাকে কারাবরণও করতে হয়।
ছাত্রজীবনের এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনের ভিত তৈরি করে দেয়। রাজনীতি তার কাছে শুধু দলীয় কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং আন্দোলন, সংগঠন এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার মধ্য দিয়েই তার রাজনৈতিক বোধ পরিণত হয়।
শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু
রাজনীতির পাশাপাশি মির্জা ফখরুলের শিক্ষাজীবনও ছিল সমৃদ্ধ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে পড়াশোনা শেষ করে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ঢাকা কলেজে অর্থনীতি পড়ানোর মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।
সরকারি চাকরির এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও আয়-ব্যয় পরীক্ষণ অধিদপ্তরে নিরীক্ষক হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। ১৯৮২ সালে এইচ এম এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর বারী পদত্যাগ করার আগ পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন।
পরে আবার শিক্ষকতায় ফিরে ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষকতা করেন।
শিক্ষকতা, প্রশাসন ও রাজনীতির এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে আরও পরিণত করে।
পৌরসভা থেকে জাতীয় রাজনীতিতে
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসে ১৯৮৮ সালে। সে বছর স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।
স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে। জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান। এরপর ধাপে ধাপে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উঠে আসেন।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য থেকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব—দলীয় রাজনীতির প্রতিটি ধাপে নিজের সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের প্রথম সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন এবং পরে দীর্ঘদিন সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন।
সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী
জাতীয় নির্বাচনী রাজনীতিতে মির্জা ফখরুলের বড় সাফল্য আসে ২০০১ সালে। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।
বিএনপি সরকারে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
এর মাধ্যমে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে যেমন জাতীয় পর্যায়ে তার অবস্থান আরও শক্ত হয়, তেমনি রাষ্ট্র পরিচালনার সরাসরি অভিজ্ঞতাও অর্জন করেন তিনি।
২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬—দুটি আসন থেকেই নির্বাচিত হন। তবে নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিএনপির দুঃসময়ের কান্ডারি
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় শুরু হয় বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার সময়ে। ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে তিনি দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব মনোনীত হন।
২০১১ সালে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন। পাঁচ বছর এই দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালে বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর টানা এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি দলের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এই সময়ে বিএনপির জন্য পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত কঠিন। দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি, তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন, নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নানা বাধার মধ্যে দলের সাংগঠনিক নেতৃত্ব সামলাতে হয়েছে তাকে।
রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং আন্তর্জাতিক মহলে দলের অবস্থান তুলে ধরা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই মির্জা ফখরুল ছিলেন বিএনপির অন্যতম প্রধান মুখ।
এই দীর্ঘ সময়ে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলকে এগিয়ে নেওয়ার কারণে বিএনপির একটি বড় অংশের কাছে তিনি দুঃসময়ের কান্ডারি হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

রাজনৈতিক ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার পেছনে তার রাজনৈতিক ত্যাগের বিষয়টিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, কারাবরণ করেছেন এবং মামলা-হামলার মুখোমুখি হয়েছেন। দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে সামনের সারিতে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি এবং তারেক রহমানের প্রবাসজীবনে দলকে সাংগঠনিকভাবে ধরে রাখার দায়িত্বও তার ওপর ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিএনপির জাতীয় রাজনীতি সামলানো তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
তার ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো রাজনৈতিক বক্তব্যে তুলনামূলকভাবে সংযত থাকা। প্রতিপক্ষের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে চলা এবং শালীনতা বজায় রাখার জন্য তিনি রাজনৈতিক মহলে আলাদা পরিচিতি তৈরি করেছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকা এবং সাদামাটা জীবনযাপনের ভাবমূর্তিও তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের মত।
শুধু বিএনপির নেতা নন
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রপতি কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের। ফলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এমন একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, যিনি দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারবেন—এমন ধারণা থেকেই তার নাম সামনে আসে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়, জাতীয় ঐক্যের রাজনীতিতে ভূমিকা এবং তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য তাকে এই ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে আসে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, সংকটকালে রাষ্ট্রপতির জন্য শুধু সাংবিধানিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা, ধৈর্য এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এসব গুণের প্রকাশ ঘটেছে বলেই তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে উপযুক্ত মনে করা হয়েছে।
শিক্ষা ও অভিজ্ঞতার অনন্য সমন্বয়
মির্জা ফখরুলের জীবনের দিকে তাকালে তার শিক্ষাগত ও পেশাগত অভিজ্ঞতার একটি বিশেষ সমন্বয় দেখা যায়।
অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পর শিক্ষকতা করেছেন। সরকারি প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করেছেন। স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন। সংসদ সদস্য হিসেবে আইনসভায় দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগের অংশ ছিলেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিব হিসেবে দল পরিচালনা করেছেন।
অর্থাৎ শিক্ষা থেকে প্রশাসন, প্রশাসন থেকে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় সরকার থেকে সংসদ, সংসদ থেকে মন্ত্রিসভা এবং সেখান থেকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্ব—রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা তার জীবনে যুক্ত হয়েছে।
এই অভিজ্ঞতার সমন্বয়ই তাকে রাষ্ট্রপতি পদে একজন আলাদা প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০২৪-এর পালাবদল থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছিল একটি বড় বাঁক। ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনসহ দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে।
এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামও নতুন পর্যায়ে পৌঁছে।
২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান তিনি।
কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এলো আজ। দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর সৃষ্ট পরিস্থিতিতে ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদকে ১৬৭ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন।
একসময়ের ছাত্রনেতা এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অভিভাবক।

মির্জাপুর থেকে বঙ্গভবন
মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি হওয়ার গল্পের সঙ্গে তাই জড়িয়ে আছে ঠাকুরগাঁওয়ের শৈশব এবং পঞ্চগড়ের মির্জাপুরের পারিবারিক শেকড়। জড়িয়ে আছে একজন রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরাধিকার। জড়িয়ে আছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি। জড়িয়ে আছে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান। জড়িয়ে আছে শিক্ষকতার শ্রেণিকক্ষ, সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা এবং পৌরসভার জনপ্রতিনিধিত্ব।
জড়িয়ে আছে সংসদ সদস্য হওয়া, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন এবং বিএনপির দুঃসময়ে দলের মহাসচিব হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়ার দীর্ঘ অধ্যায়।
সবশেষে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ ও অপেক্ষার পর দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছানোর গল্প।
ছাত্ররাজনীতির মিছিল থেকে বঙ্গভবনের শপথের মঞ্চ—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই যাত্রা তাই এক দিনের গল্প নয়, এটি কয়েক দশকের রাজনৈতিক পথচলার পরিণতি।
একজন শিক্ষক থেকে রাজনীতিক, রাজনীতিক থেকে সংসদ সদস্য, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী থেকে একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের মহাসচিব, মন্ত্রী এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি—মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের এই দীর্ঘ রূপান্তর বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকল।
আজ বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির আসনে বসে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার নতুন পরিচয় পেলেন—তিনি এখন শুধু বিএনপির মহাসচিব নন, তিনি এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি।

