আজ ১২ রবিউল আউয়াল। মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে দিনটি গভীর আবেগ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মস্মরণে দিনটি বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে ঈদে মিলাদুন্নবী নামে পালিত হয়। বাংলাদেশে ২০২৬ সালে ১২ রবিউল আউয়াল পড়েছে ২৬ আগস্টে এবং এ উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
কিন্তু ঈদে মিলাদুন্নবী শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামের ইতিহাস, ধর্মতাত্ত্বিক বিতর্ক, মুসলিম সংস্কৃতির বৈচিত্র্য এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে মহানবী (সা.)-এর আদর্শকে জীবনে ধারণ করার প্রশ্ন।
জন্মের দিন, নাকি স্মরণের দিন?
আরবি ‘মাওলিদ’ শব্দের অর্থ জন্ম বা জন্ম-সম্পর্কিত স্মরণ। ইসলামী ঐতিহ্যে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মকে স্মরণ করে রবিউল আউয়াল মাসে বিভিন্ন দেশে ধর্মীয় আলোচনা, সীরাত মাহফিল, দরুদ, কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
তবে মহানবী (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট জন্মতারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। সুন্নি মুসলিম সমাজে ১২ রবিউল আউয়াল সবচেয়ে প্রচলিত তারিখ হলেও শিয়া ঐতিহ্যে ১৭ রবিউল আউয়ালকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে দিনটির ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়ে ঐকমত্য থাকলেও সুনির্দিষ্ট তারিখের প্রশ্নে ঐতিহাসিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের প্রচলিত ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে ১২ রবিউল আউয়ালই ঈদে মিলাদুন্নবী হিসেবে পালিত হয়। সরকারি কর্মসূচি ও জাতীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটির সামাজিক গুরুত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
উৎসবের ইতিহাস: প্রথম যুগ থেকে পরবর্তী বিস্তার
ঈদে মিলাদুন্নবীর বর্তমান রূপ ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই ছিল কি না এ প্রশ্নে ইতিহাসবিদ ও আলেমদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সংগঠিতভাবে মাওলিদ উদযাপনের বিকাশ ঘটে ইসলামের পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে। মিসরের ফাতিমি শাসনামলে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের জন্মস্মরণ উপলক্ষে আনুষ্ঠানিক আয়োজনের নজির পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৩শ শতকের শুরুতে ইরবিলে একটি বৃহৎ মাওলিদ আয়োজনকে সুন্নি বিশ্বের সংগঠিত মাওলিদ উদযাপনের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এরপর মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দিনটি পালনের স্বতন্ত্র ধারা গড়ে তোলে। কোথাও শোভাযাত্রা, কোথাও সীরাত আলোচনা, কোথাও কবিতা ও নাত, আবার কোথাও দান-সদকা ও খাবার বিতরণের মাধ্যমে দিনটি পালিত হয়।
অর্থাৎ, ঈদে মিলাদুন্নবী কেবল একটি ধর্মীয় স্মরণানুষ্ঠান নয়; এটি বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
কেন বিতর্ক?
ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে মুসলিম সমাজে প্রধান বিতর্কটি মূলত ধর্মীয় বৈধতার প্রশ্নে।
একদল আলেম মনে করেন, মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ, তাঁর জীবন ও শিক্ষা আলোচনা এবং মানবকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে তাঁর জন্মস্মরণ করা ধর্মীয় আবেগের স্বাভাবিক প্রকাশ। তাদের কাছে মূল বিষয় হলো উদযাপনের ধরন যেন ইসলামের মৌলিক নীতির বিরোধী না হয়।
অন্যদিকে, আরেকদল আলেম ও ইসলামী চিন্তাধারা মনে করে, মহানবী (সা.), তাঁর সাহাবি ও প্রথম প্রজন্মের মুসলমানরা এভাবে জন্মদিন উদযাপন করেননি। তাই এটিকে পরবর্তীকালের সংযোজন বা বিদআত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঐতিহাসিকভাবেও মাওলিদ উদযাপন নিয়ে এই মতপার্থক্য দীর্ঘদিনের।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো বিতর্ক থাকলেও মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, তাঁর মর্যাদা এবং তাঁর শিক্ষা অনুসরণের প্রশ্নে মুসলিমদের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ নেই। মতভেদ মূলত কীভাবে স্মরণ করা হবে, সেই পদ্ধতি নিয়ে।
শুধু আয়োজন নয়, আদর্শের প্রশ্ন
ঈদে মিলাদুন্নবী নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত এটিই আমরা কি মহানবীকে শুধু স্মরণ করি, নাকি তাঁর দেখানো পথেও চলি?
যে মানুষটি আরবের গোত্রকেন্দ্রিক, বৈষম্যপূর্ণ ও সংঘাতময় সমাজে ন্যায়বিচার, মানবমর্যাদা, দয়া, ক্ষমা ও দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিয়েছেন, তাঁর জন্মস্মরণ যদি শুধু মিছিল, আলোকসজ্জা, ব্যানার বা আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেই স্মরণের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের শিক্ষা। তিনি দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলেছেন, প্রতিবেশীর অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন, ব্যবসায় সততা, পরিবারে দায়িত্বশীলতা এবং সমাজে ন্যায়বিচারের শিক্ষা দিয়েছেন। আজকের বাস্তবতায় এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
কারণ আমরা এমন এক সমাজে বাস করছি, যেখানে ধর্মীয় আবেগ প্রবল, কিন্তু একই সঙ্গে দুর্নীতি, বৈষম্য, সহিংসতা, প্রতারণা ও অসহিষ্ণুতাও বিদ্যমান। প্রশ্ন হলো নবীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ কি শুধু স্লোগানে থাকবে, নাকি সেই ভালোবাসা মানুষের অধিকার রক্ষায়ও প্রতিফলিত হবে?
বাংলাদেশে ঈদে মিলাদুন্নবীর সামাজিক তাৎপর্য
বাংলাদেশে দিনটি ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি সামাজিক সংহতিরও একটি উপলক্ষ। বিভিন্ন স্থানে ওয়াজ, সীরাত আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
তবে একটি বহুমতপূর্ণ ধর্মীয় সমাজে এ দিনটি পালনের ক্ষেত্রে সংযম ও পারস্পরিক সম্মান গুরুত্বপূর্ণ। কেউ ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করেন, কেউ করেন না এই মতপার্থক্যকে বিভেদের অস্ত্র বানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ মহানবী (সা.)-এর জীবন নিজেই ছিল মানুষের মধ্যে সম্পর্ক, ন্যায় ও উত্তম চরিত্র প্রতিষ্ঠার শিক্ষা।
সবশেষে ঈদে মিলাদুন্নবীর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত একটি দিনকে কেন্দ্র করে আবেগ প্রকাশ নয়, বরং একটি জীবনকে কেন্দ্র করে নিজেকে বদলে নেওয়া।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা যদি সত্যিই হৃদয়ে থাকে, তবে তার প্রতিফলন হওয়া উচিত সত্যবাদিতায়, ন্যায়বিচারে, সহনশীলতায়, দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মিতায় এবং ক্ষমতার অপব্যবারের বিরুদ্ধে অবস্থানে।
তাই ঈদে মিলাদুন্নবীকে ঘিরে বিতর্ক থাকতেই পারে, উদযাপনের পদ্ধতিতেও মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু নবীর আদর্শ নিয়ে বিভ্রান্তির সুযোগ কম। তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে অর্থবহ উপায় হয়তো তাঁকে নিয়ে শুধু কথা বলা নয় বরং তাঁর শেখানো মানবিকতা, ন্যায় ও নৈতিকতাকে নিজের জীবন ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করা।
কারণ নবীপ্রেমের সবচেয়ে বড় প্রমাণ আয়োজনের আকারে নয়, চরিত্রের পরিবর্তনে।

