আইসক্রিম বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় ঈগলু ব্র্যান্ডের কোম্পানি আব্দুল মোনেম লিমিটেডের বিরুদ্ধে আইসক্রিম তৈরিতে ৪৫ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর)। ঘোষণার অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করে আইসক্রিম বানানো হয়েছে। সেই আইসক্রিম বিক্রিও করা হয়েছে। কিন্তু অতিরিক্ত সেই দুধ ব্যবহার করে বানানো আইসক্রিমের ওপর দেয়া হয়নি রাজস্ব।
এক বা দুই বছর নয় চার অর্থবছর পরিশোধ করা হয়নি প্রায় ৪৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার রাজস্ব (সম্পূরক শুল্ক, ভ্যাট ও উৎসে ভ্যাট)। এছাড়া দুই অর্থবছর প্রতিষ্ঠান পরিশোধ করেনি প্রায় ৮৯ লাখ টাকার উৎসে ভ্যাট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পূর্ব) থেকে প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। তবে অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করে আইসক্রিম বানানোর বিষয়টি সঠিক নয় বলে কোম্পানির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এনবিআর সূত্রমতে, দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আব্দুল মোনেম লিমিটেড। এই গ্রুপের আব্দুল মোনেম লিমিটেডের তৈরি ঈগলু হলো দেশের আইসক্রিম ব্র্যান্ডের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড। দেশে বছরে প্রায় ৬ কোটি লিটারের বেশি আইসক্রিম চাহিদার প্রায় ৩৮ শতাংশ পূরণ করে ঈগলু। ঈগলু আইসক্রিম তৈরিতে উপকরণ হিসেবে অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করা হয়েছে এবং সেই অতিরিক্ত দুধ দিয়ে তৈরি আইসক্রিমের ওপর সঠিকভাবে রাজস্ব পরিশোধ করা হয়নি বলে অভিযোগ পায় কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা (পূর্ব)। এরই ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন (সিএ রিপোর্ট), দাখিলপত্র (ভ্যাট রিটার্ন) ও মূসক-সংক্রান্ত দলিলাদি যাচাই করা হয়।
বিশেষ করে ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ পর্যন্ত চার অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন, দাখিলপত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র পর্যালোচনা করে ব্যাপক গরমিল পান ভ্যাট কর্মকর্তারা। চার অর্থবছরে আইসক্রিমে সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট পরিহার ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটির উৎসে ভ্যাট পরিহারের তথ্য উঠে আসে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়; যার ভিত্তিতে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানকে দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত চার অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করে যে আইসক্রিম তৈরি করেছে, তার ওপর ৫ শতাংশ হারে প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক (এসডি) ১১ কোটি ১ লাখ ৯১ হাজার ৮৯৫ টাকা এবং ভ্যাট ১৫ শতাংশ হারে ৩৪ কোটি ৭১ লাখ ৪ হাজার ৪৬৯ টাকা। এছাড়া লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার ওপর উৎসে ভ্যাট প্রযোজ্য। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৯-২০ ও ২০২২-২৩ অর্থবছর এই দুই অর্থবছরে প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট ৮৯ লাখ ৬৯ হাজার ৩০১ টাকা পরিশোধ করা হয়নি। অর্থাৎ চার অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করে যে আইসক্রিম তৈরি করে বিক্রি করেছে, তাতে প্রযোজ্য ৪৫ কোটি ৭২ লাখ ৯৬ হাজার ৩৬৪ টাকা রাজস্ব (সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট) পরিশোধ করা হয়নি। তবে সুদ ব্যতীত এই হিসাব করা হয়েছে। সুদসহ পরিহার করা এই রাজস্বের পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে।
ভ্যাট কমিশনারেটের হিসাবে দেখা গেছে, আব্দুল মোনেম লিমিটেড ২০১৯-২০ অর্থবছর কারখানায় অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করে যে পরিমাণ আইসক্রিম তৈরি করা হয়েছে তার ওপর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ১ লাখ ৬ হাজার ৯৭৪ টাকা, ভ্যাট ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৯৭০ টাকা। একইভাবে ওই অর্থবছর প্রতিষ্ঠানের ব্যয় বা কেনাকাটার ওপর প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট ২৩ লাখ ২২ হাজার ৩৪৪ টাকা। এছাড়া ২০২০-২১ অর্থবছর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ১ কোটি ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৭ টাকা ও ভ্যাট ৩ কোটি ৩৮ লাখ ১৮ হাজার ৭৬ টাকা; ২০২১-২২ অর্থবছর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ৩ কোটি ৯৬ লাখ ৩৮ হাজার ৪৩৬ টাকা ও ভ্যাট ১২ কোটি ৪৮ লাখ ৬১ হাজার ৭১ টাকা; ২০২২-২৩ অর্থবছর প্রযোজ্য সম্পূরক শুল্ক ৫ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার ৫৮৮ টাকা ও ভ্যাট ১৮ কোটি ৮০ লাখ ৮৮ হাজার ৩৫২ টাকা। একইসঙ্গে ২০২২-২৩ অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটির প্রযোজ্য উৎসে ভ্যাট ৬৬ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫৭ টাকা। মূল্য সংযোজন ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ১৫, ২৭, ২৮, ৩১, ৩৩, ৪৫, ৪৬, ৪৯, ৫১ ও ৭৩ ধারা এবং মূল্য সংযোজন ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এর বিধি ২৫ ও ৪০ প্রতিষ্ঠান লঙ্ঘন করেছে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভ্যাট কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ভ্যাট-সংক্রান্ত দলিলাদি যাচাইয়ে আরও কিছু অনিয়ম পেয়েছেন বলে কারণ দর্শানো নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আব্দুল মোনেম লিমিটেড ২০১৯-২০ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত বার্ষিক প্রতিবেদনে যে পরিমাণ ক্রয়মূল্য দেখিয়েছে, তার চেয়ে দাখিলপত্রে (ভ্যাট রিটার্ন) ১১৭ কোটি ৮৯ লাখ ১৬ হাজার ৯০০ টাকা বেশি দেখিয়েছে। এই অনিয়মের বিষয়েও প্রতিষ্ঠানকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিলম্বে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করায় সুদ বাবদ আরও ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৬৬ টাকা দাবি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে ১০ জানুয়ারি দাবিনামা-সংবলিত কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
ঢাকা পূর্ব ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনার কাজী মুহম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেন, এই কমিশনারেটের আওতাধীন বড় ও ছোট যেকোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান হোকÑযাদের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার প্রবণতা আছে বা কমপ্লায়েন্স করে না, রেকর্ড আছে তারা বড় হোক আর ছোট হোকÑসবাইকে যথাযথ আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। রাজস্ব আদায়ে আমরা বদ্ধপরিকর। আমরা সব কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম বা ফাঁকি উদ্ঘাটনে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করছি। অচিরেই অনেক প্রতিষ্ঠানের ফাঁকি ও অনিয়ম সামনে আসবে, রাজস্ব আদায়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, ১৯৬৪ সাল থেকে ঈগলু আইসক্রিম পাকিস্তানি ব্যবসায়ী কে রহমানের মালিকানাধীন ছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বাংলাদেশে ঈগলু ব্র্যান্ডের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত থাকে। পরবর্তী সময়ে সরকারি পদক্ষেপে ১৯৮২ সালে কোম্পানিটি নিলামে ওঠে, যা আব্দুল মোনেম লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুুল মোনেম নিলামে কিনে নেন। এরপর ১৯৮৭ সালে বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এবং বাজারের চাহিদা মেটাতে ঢাকার শ্যামপুর শিল্প এলাকায় একটি নতুন কারখানা স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৯২ সালে ঈগলু আইসক্রিম ফ্যাক্টরিতে বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন শুরু হয়।
অনিয়ম বা রাজস্ব পরিহারের বিষয়টি অস্বীকার করেন আব্দুল মোনেম লিমিটেডের (ঈগলু) চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) শামীম আহমেদ। তিনি বলেন, ভ্যাট অফিসের কিছু বুঝার ভুল হয়েছে। আইসক্রিম তৈরিতে যে উপকরণ দেয়া হয়, তার মধ্যে একটি হলো সলিড মিল্ক পাউডার, অপরটি হলো ক্রিম মিল্ক পাউডার। করোনার আগে ফুল মিল্ক পাউডারের জন্য আমরা বাটার অয়েল নিয়ে আসতাম। সে সময় বাটার অয়েল চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়। তখন আমরা বাটার অয়েলের পরিবর্তে হোল্ড মিল্ক পাউডার নিয়ে আসি। তখন থেকে বাটার অয়েলের পরিবর্তে হোল্ড মিল্ক ব্যবহার করা হয়েছেÑতা ডিক্লারেশনে উল্লেখ করেছি। আমরা তাদের (ভ্যাট অফিসকে) একটা ক্ল্যারিফিকেশনও দিয়েছি। তারপরও তারা আমাদের শোকজ করেছে। অতিরিক্ত দুধ ব্যবহার করে আইসক্রিম তৈরি করা হয়নি বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, আমরা যা উপকরণ ব্যবহার করেছি, তার চেয়ে বেশি ভ্যাট দেয়া হয়েছে।

