আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে একাধিক নতুন খাতকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনের ফলে স্টেডিয়ামে টিকিট কেটে খেলা দেখা, নাটক বা গানের অনুষ্ঠান উপভোগ করলেও কর দিতে হতে পারে সাধারণ মানুষকে। একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে শুল্ক, কর ও ভ্যাট পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। পাশাপাশি পুঁজিবাজার, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প খাতে কিছু কর ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের দপ্তরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান–এর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত হয়। দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত বৈঠক চলে।
এনবিআর সূত্র জানিয়েছে, আগামী বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও খেলাধুলাকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর আওতায় নাটক, সংগীতানুষ্ঠান ও স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে টিকিট কাটার ওপর সরাসরি কর আরোপের বিধান আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটিরশিল্প, তাঁত, শীতলপাটি, কামার-কুমারের কাজ এবং হাতে তৈরি বিভিন্ন শিল্পপণ্যের জন্য পৃথক শুল্ক-কর-ভ্যাট কাঠামো আনার আলোচনা হয়েছে। এসব খাতে রাজস্ব হার বাড়তে পারে বলে জানা গেছে।
বৈঠকের শুরুতেই ভ্যাট কাঠামো নিয়ে আলোচনা হয়। অনেক নতুন পণ্য ও খাতে ভ্যাট ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশের ওপর ভ্যাট মওকুফ সুবিধা আগামী বাজেটেও বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশীয় প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পকে এগিয়ে নিতে সরকার সব ধরনের সহায়তা দেবে। সহজ ঋণ সুবিধাও দেওয়া হবে।
অন্যদিকে আমদানি করা ল্যাপটপ, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, প্রিন্টার, টোনার ও অন্যান্য আইটি পণ্যের ওপর শুল্ক-কর-ভ্যাট বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে কতটা বাড়ালে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব কম হবে, তা নিয়ে হিসাব করছে এনবিআর।
ইন্টারনেট সেবা ও সফটওয়্যার আমদানির ওপর ভ্যাট বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায় আসে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সম্ভাব্য রাজস্ব আয় ও প্রযুক্তি খাতের ওপর প্রভাব বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
করদাতার সংখ্যা বাড়াতে নতুন কর অঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কোন কোন জেলায় নতুন কর অঞ্চল স্থাপন করা হবে, তা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। কর কর্মকর্তাদের জেলা পর্যায়ে কাজ করতে অনাগ্রহের প্রসঙ্গ উঠলে অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের যেখানেই দায়িত্ব দেওয়া হবে, সেখানেই কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ের করযোগ্য ব্যক্তিদের করের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কর প্রশাসনে সততা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার নির্দেশও দেন অর্থমন্ত্রী। করদাতাদের হয়রানি বা অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
আগামী বাজেটে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের কর সুবিধা বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের করযোগ্য আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ কর রেয়াত বহাল থাকতে পারে। একই সঙ্গে বার্ষিক আয়ের ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিনিয়োগযোগ্য রাখা, ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত মূলধনি মুনাফায় কর অব্যাহতি এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত কর ছাড়ের সুবিধাও অব্যাহত থাকতে পারে।
তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ আয়ের একটি অংশ করমুক্ত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি লভ্যাংশ বিতরণের সময় ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখার বিধানে কিছুটা শিথিলতার বিষয়ও বিবেচনা করছে সরকার। আইপিওর মাধ্যমে শেয়ার ছাড়লে কর রেয়াত বাড়ানোর প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। তবে এতে রাজস্ব আদায় কমে যেতে পারে বলে আপত্তি জানিয়েছে এনবিআর।
বর্তমানে নিবন্ধিত স্টার্টআপের টার্নওভারের ওপর করহার ০.১ শতাংশ। উদ্যোক্তাদের আকৃষ্ট করতে আগামী বাজেটে এই খাতে কর মওকুফ সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে সরকার এখনো কঠোর অবস্থানেই রয়েছে বলে বৈঠক সূত্রে জানা গেছে।

