গ্রামের ছোটখাটো বিরোধ মেটাতে এখন অনেকের ভরসার জায়গা হয়ে উঠছে গ্রাম আদালত। মাত্র ২০ টাকা খরচে আবেদন করে অল্প সময়ের মধ্যেই বিচার পাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আস্থা দুটোই বাড়ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষরা কম খরচে স্থানীয়ভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করছেন।
যশোরের কেশবপুর উপজেলার সাগরদাঁড়ী ইউনিয়নের ক্ষুদ্র ভুষিমাল ব্যবসায়ী জাহিদুর রহমান শিমুল দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়িক লেনদেনের আটকে থাকা এক লাখ টাকা ফেরত পাওয়ার জন্য স্থানীয় সালিশে ঘুরেছেন। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। পরে গ্রাম আদালতে আবেদন করে অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের পাওনা টাকা ফেরত পান।
শিমুল জানান, আবেদন থেকে নিষ্পত্তি পর্যন্ত তার মোট খরচ হয়েছে মাত্র ১৮০ টাকা। এর মধ্যে যাতায়াত ও নাস্তার খরচও ছিল। তিনি বলেন, গ্রাম আদালত না থাকলে উচ্চ আদালতে যেতে হতো। সেখানে মামলা চালাতে অনেক সময় ও অর্থ ব্যয় হতো।
শুধু শিমুল নন, যশোরের বিভিন্ন উপজেলার আরও অনেক মানুষ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। স্বল্প ব্যয়ে এবং দ্রুত সময়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিচার পাওয়ায় গ্রাম আদালতের প্রতি সাধারণ মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে।
চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের স্বরুপপুর গ্রামের আলম খান ৪০ হাজার টাকা পাওনা আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন চিন্তায় ছিলেন। আদালতে মামলা চালানোর সামর্থ্য না থাকলেও গ্রাম আদালতের মাধ্যমে মাত্র ২৮ দিনের মধ্যে তিনি নিজের টাকা ফেরত পান। তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ১০০ টাকা।
আলম খান বলেন, এই টাকা ফেরত পেয়ে তিনি আবার ব্যবসা শুরু করার পরিকল্পনা করছেন। এত কম খরচে দ্রুত বিচার পাবেন, তা তিনি আগে কল্পনাও করেননি।
ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়নের রাবেয়া বেগমও গ্রাম আদালতের মাধ্যমে দ্রুত বিচার পেয়েছেন। পারিবারিক বিরোধ ও মারামারির ঘটনায় প্রথমে তিনি আদালতে গেলেও পরে বিষয়টি গ্রাম আদালতের আওতাভুক্ত হওয়ায় সেখানে পাঠানো হয়। পরে দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে তিনি ক্ষতিপূরণ পান।
রাবেয়া বেগম জানান, খাওয়া ও যাতায়াতসহ তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬১০ টাকা। আগে তিনি জানতেন না যে গ্রাম আদালতের মাধ্যমেও বিচার পাওয়া যায়।
ছয় মাসে দুই হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি:
বাংলাদেশে গ্রাম আদালত সক্রিয়করণ (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের ডিস্ট্রিক্ট ম্যানেজার অ্যাডভোকেট মহিতোষ কুমার রায় জানান, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত যশোর জেলার আটটি উপজেলার ৯৩টি ইউনিয়নে মোট দুই হাজার ৪৯টি মামলা দায়ের হয়।
এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদে সরাসরি দায়ের হয় এক হাজার ৯৫২টি মামলা এবং জেলা আদালত থেকে পাঠানো হয় ৯৭টি মামলা। মোট মামলার মধ্যে এক হাজার ২৩৫টি ছিল দেওয়ানি এবং ৮১৪টি ছিল ফৌজদারি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দায়ের হওয়া মামলার ৯৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ নিষ্পত্তি হয়েছে। এসব মামলার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের মোট ৪১ কোটি ৮৮ লাখ ৫৪ হাজার ১০০ টাকা ক্ষতিপূরণ আদায় করে দেওয়া হয়েছে। জেলায় একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে গড়ে সময় লাগছে মাত্র ১০ দিন। মামলা আবেদনকারীদের মধ্যে পুরুষ ছিলেন এক হাজার ২২৬ জন এবং নারী ছিলেন ৮২৩ জন।
যেসব মামলার বিচার হয়:
গ্রাম আদালতে মূলত ছোট পরিসরের দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলার বিচার করা হয়। দেওয়ানি মামলার মধ্যে রয়েছে পাওনা টাকা আদায়, জমি দখল, অস্থাবর সম্পত্তি উদ্ধার, কৃষি শ্রমিকের মজুরি, খোরপোষ ও গবাদি পশুর কারণে ফসল নষ্টের ক্ষতিপূরণ।
ফৌজদারি মামলার মধ্যে রয়েছে ছোটখাটো মারামারি, চুরি, প্রতারণা, যাতায়াতে বাধা, হুমকি, নারীর শ্লীলতাহানি ও গবাদি পশু সংক্রান্ত বিরোধ।
তবে গ্রাম আদালতের এখতিয়ারেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। নাবালকের স্বার্থ জড়িত বিষয়, সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিরোধ কিংবা ৭৫ হাজার টাকার বেশি আর্থিক বিরোধ এই আদালতে বিচার করা যায় না। এছাড়া সিটি করপোরেশন বা পৌর এলাকার বাসিন্দাদের ক্ষেত্রে এই আদালতের এখতিয়ার প্রযোজ্য নয়।
সাফল্যের পাশাপাশি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ:
স্থানীয়ভাবে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করলেও মাঠপর্যায়ে গ্রাম আদালত পরিচালনায় নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় জনপ্রতিনিধিদের। রাজনৈতিক চাপ, প্রভাবশালী পক্ষের হস্তক্ষেপ এবং সমন জারির পরও বিবাদীপক্ষের অনুপস্থিতি বিচার প্রক্রিয়াকে অনেক সময় জটিল করে তোলে।
মণিরামপুর উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৈয়বুর রহমান জানান, তারা সপ্তাহে দুই দিন গ্রাম আদালত পরিচালনা করেন। প্রতিটি আদালতে গড়ে চার থেকে পাঁচটি মামলার নিষ্পত্তি হয়। অধিকাংশ মামলাই ১৫ দিনের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, অনেক সময় রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করতে হয়। আবার নোটিশ পাওয়ার পরও অনেক বিবাদী আদালতে উপস্থিত হন না। এতে বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
যশোর আইনজীবী সমিতির সাবেক সহকারী সম্পাদক অ্যাডভোকেট তাহমিদ আকাশ মনে করেন, গ্রাম আদালত উচ্চ আদালতের মামলার চাপ কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
তার মতে, ছোট ছোট বিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে নিষ্পত্তি হওয়ায় সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুটোই বাঁচছে। একই সঙ্গে আদালতের মামলাজটও কমছে।
তবে তিনি বলেন, অনেক ইউনিয়নে নির্বাচিত চেয়ারম্যান না থাকায় গ্রাম আদালতের কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। এছাড়া পৌর এলাকায় এখনও গ্রাম আদালতের কার্যক্রম চালু না হওয়ায় সেখানকার মানুষ এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করতে সম্প্রতি যশোর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অর্ধবার্ষিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউএনডিপি এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আওতায় এই সভা আয়োজন করা হয়।
সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন। সেখানে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করতে স্থানীয় সালিশ নিরুৎসাহিত করা, প্রচারণা বৃদ্ধি, আলাদা এজলাস স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের সুপারিশ করা হয়।

