যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে ইরান এখন এমন এক পাল্টা কৌশলের দিকে এগোচ্ছে, যার প্রভাব শুধু দুই দেশের অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। বরং এর প্রভাব পড়তে পারে পারস্য উপসাগর, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে।
২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে প্রায় ৬০ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় এনেছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য ইরানের অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে আরও সংকুচিত করা এবং দেশটির সঙ্গে ব্যবসা করা অন্য দেশগুলোর ওপরও চাপ তৈরি করা। তবে এবার তেহরানের প্রতিক্রিয়াও আগের তুলনায় কঠোর।
ইরানের সম্ভাব্য সবচেয়ে বড় পাল্টা অস্ত্র হলো জ্বালানি ও নৌপথ। দেশটির কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, অর্থনৈতিক চাপ যদি আরও বাড়ানো হয় তাহলে ইরান পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল পরিবহন আরও সীমিত করতে পারে। সাবেক রেভল্যুশনারি গার্ডস প্রধান মোহসেন রেজাইয়ের বক্তব্যও সেই হুমকিকে স্পষ্ট করেছে। অর্থাৎ ওয়াশিংটন যদি ইরানের তেল বিক্রি বন্ধ বা কঠোরভাবে সীমিত করতে চায় তাহলে তেহরানও এমন পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তেল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়।
এখানেই হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব। এই সরু জলপথটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় বর্তমানে এ পথে জাহাজ চলাচল অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন সামুদ্রিক তথ্য বিশ্লেষণেও দেখা যাচ্ছে, সংঘাতের কারণে হরমুজে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। আগস্টের শুরুতেও পারস্য উপসাগরে কয়েক ডজন জাহাজ আটকে থাকার তথ্য পাওয়া যায় এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় অনেক নিচে ছিল।
তাই ইরানের জন্য হরমুজ শুধু একটি নৌপথ নয়, এটি এখন কৌশলগত চাপ তৈরির প্রধান হাতিয়ার। তেহরান যদি পুরোপুরি পথ বন্ধ করে দেয় অথবা জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এতটা বাড়িয়ে দেয় যে আন্তর্জাতিক জাহাজ কোম্পানিগুলো ওই পথ এড়িয়ে চলে, তাহলে বাস্তবে একটি সামুদ্রিক অবরোধ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ইতোমধ্যে বিকল্প রুট ব্যবহারের চেষ্টা শুরু হয়েছে এবং আঞ্চলিক দেশগুলো হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমানোর পথ খুঁজছে।
তবে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে তেহরান সহজেই হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারবে। এই পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ইরানের নিজের জন্যও রয়েছে। কারণ ইরানের অর্থনীতিও তেল রপ্তানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হলে ইরানের নিজস্ব তেল বিক্রিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে তেহরানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হতে পারে পুরোপুরি পথ বন্ধ করার বদলে নিয়ন্ত্রিতভাবে ঝুঁকি বাড়ানো- যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে আতঙ্ক তৈরি হয় কিন্তু ইরানের নিজের রপ্তানি ব্যবস্থাও পুরোপুরি ধ্বংস না হয়।
ইরানের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোকে চাপের মধ্যে রাখা। সরাসরি ব্যাপক হামলা না চালিয়েও ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা অন্যান্য উপায়ে তেল স্থাপনা ও বন্দরগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করা সম্ভব। এতে সরবরাহ কমার পাশাপাশি বীমা খরচ, পরিবহন ব্যয় এবং ঝুঁকি প্রিমিয়াম বেড়ে যাবে। অর্থাৎ একটি জাহাজ বাস্তবে আক্রান্ত না হলেও হামলার আশঙ্কাই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
লোহিত সাগরও ইরানের সম্ভাব্য চাপ তৈরির আরেকটি ক্ষেত্র। ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিদের মাধ্যমে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ বাড়ানো হলে হরমুজ ও লোহিত সাগর- দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই ঝুঁকি তৈরি হবে। ইতোমধ্যে লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। ফলে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক করিডরে একই সময়ে অস্থিরতা তৈরি হলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া ও ইউরোপমুখী পণ্য পরিবহনের খরচ আরও বাড়তে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে তেলের বাজারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- যুদ্ধ ও হরমুজ সংকটের মধ্যেও তেলের দাম আগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্থায়ীভাবে উঠে যায়নি। এর পেছনে রয়েছে চীনের তুলনামূলক দুর্বল চাহিদা, বিভিন্ন দেশের জরুরি তেল মজুত থেকে সরবরাহ এবং বাজারের অংশগ্রহণকারীদের হিসাব-নিকাশ। কিন্তু এই সুরক্ষা বলয়ও সীমাহীন নয়। রয়টার্সের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ তেল ইতোমধ্যে বাজারে ছাড়া হয়েছে এবং স্থল ও সমুদ্রভিত্তিক মজুতও কমছে। ফলে নতুন করে বড় ধরনের সরবরাহ ধাক্কা এলে বাজারের পক্ষে তা সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।
এই কারণেই ইরানের হুমকিকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ কমে গেছে। বর্তমানে বিশ্ব জ্বালানি বাজার এমনিতেই বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক তেল উৎপাদন সংঘাতপ্রবণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত এবং বৈশ্বিক পরিশোধন সক্ষমতারও উল্লেখযোগ্য অংশ অচল রয়েছে। ফলে নতুন করে ইরানকেন্দ্রিক সরবরাহ সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব আগের সংকটগুলোর তুলনায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে ইরানের পাল্টা কৌশলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সামরিক নয়, অর্থনৈতিক। যুক্তরাষ্ট্র এবার শুধু ইরানকে লক্ষ্য করেনি; ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা তৃতীয় দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ওয়াশিংটনের এই কৌশলের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে চীন, রাশিয়া এবং অন্যান্য বড় বাণিজ্য অংশীদার কতটা মার্কিন চাপ মেনে চলে তার ওপর। বিশেষ করে চীন ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল ক্রেতা হওয়ায় বেইজিং যদি তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যায় তাহলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে।
এখানে যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় দ্বিধা রয়েছে। চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরাসরি কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে ইরানের ওপর চাপ বাড়তে পারে ঠিকই কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কেও নতুন বাণিজ্যিক ও আর্থিক সংঘাত তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে ওয়াশিংটন আপাতত এমন ব্যবস্থা নিয়েছে, যাতে ইরানের ওপর চাপ বাড়ে কিন্তু চীনের সঙ্গে বৃহত্তর আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ না হয়ে যায়। এ কারণেই এবারের নিষেধাজ্ঞাকে কঠোর হলেও সর্বোচ্চ মাত্রার পদক্ষেপ বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে তেহরানও বুঝতে পারছে যে হরমুজ পুরোপুরি বন্ধ করা মানে আন্তর্জাতিক সামরিক প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ানো। তাই ইরানের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পাল্টা কৌশল হতে পারে ধাপে ধাপে চাপ বাড়ানো। প্রথমে তেল রপ্তানি কমানো, এরপর নির্দিষ্ট জাহাজ বা রুটকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা, উপসাগরীয় অবকাঠামোর বিরুদ্ধে হুমকি বাড়ানো এবং প্রয়োজন হলে মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে লোহিত সাগরে চাপ সৃষ্টি করা- এ ধরনের বহুস্তরীয় কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সরাসরি যুদ্ধের তুলনায় কম খরচে বেশি অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত এখন আর শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সামরিক দ্বন্দ্ব নয়। এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক জ্বালানি ও বাণিজ্য সংকটে রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে ইরানকে দুর্বল করতে চাইছে আর ইরান তার হাতে থাকা ভূগোল ও জ্বালানি পরিবহনপথকে ব্যবহার করে সেই চাপের মূল্য বিশ্ববাজারের ওপর ছড়িয়ে দিতে চাইছে। এই কৌশলের কারণে ওয়াশিংটনের প্রতিটি নতুন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই মূল প্রশ্ন ইরান হরমুজ বন্ধ করবে কি না, শুধু সেটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো- ইরান কতটা নিয়ন্ত্রিতভাবে হরমুজকে অস্থিতিশীল রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কতদূর পর্যন্ত অর্থনৈতিক চাপ বাড়াতে গিয়ে চীন ও বৈশ্বিক তেলবাজারের সঙ্গে নতুন সংঘাতে জড়াবে। কারণ হরমুজে কয়েক দিনের অস্থিরতাও যদি দীর্ঘস্থায়ী সরবরাহ সংকটে রূপ নেয়, তাহলে এর খরচ শুধু ইরান বা যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, বিশ্বের প্রায় সব বড় অর্থনীতিকেই বহন করতে হবে।
এই দিক থেকে ২৫ আগস্ট ২০২৬-এর পরিস্থিতিতে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী পাল্টা অস্ত্র তার তেল নয়, বরং তেল পরিবহনের পথ। আর যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সামরিক শক্তি নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর তার প্রভাব। আগামী দিনের সংঘাতে কে কতটা শক্তিশালী, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে-কে নিজের অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের পাশাপাশি বিশ্ববাজারের ওপর কতটা চাপ তৈরি করতে পারে এবং সেই চাপের প্রতিক্রিয়া নিজের অর্থনীতিতে কতটা সহ্য করতে পারে।

