বিশেষ বিশ্লেষণ
ডলারের দাম বাড়লে প্রথম যে কথাটি মাথায় আসে, তা হলো – সবকিছুর দামই বুঝি বাড়বে। কিন্তু গল্পটা এত সরল নয়। একই ডলারের দাম বাড়া একজন আমদানিকারকের জন্য বাড়তি খরচ, একজন রপ্তানিকারকের জন্য বাড়তি টাকার আয়, আবার প্রবাসী পরিবারের জন্য হতে পারে বাড়তি স্বস্তি। অর্থাৎ ডলার শক্তিশালী হওয়া আসলে কারও জন্য লাভ, কারও জন্য ক্ষতি আর বাংলাদেশের মতো আমদানি ও রপ্তানি দুটির ওপরই নির্ভরশীল অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরও জটিল।
চলুন একটু সহজ করে ভাবার চেস্টা করি, কোনো রপ্তানিকারক বিদেশে ১ লাখ ডলারের পণ্য বিক্রি করলেন। ডলারের বিনিময় হার যদি ১২০ টাকা থেকে ১২৫ টাকা হয়, একই ১ লাখ ডলার দেশে এনে তিনি ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা পাবেন, যেখানে আগের হিসাবে পেতেন ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। কাগজে-কলমে আয় বাড়ল ৫ লাখ টাকা। এখানেই ডলার শক্তিশালী হওয়ার প্রথম সুবিধা। বিশেষ করে যেসব রপ্তানিকারকের উৎপাদন খরচের বড় অংশ স্থানীয় মুদ্রায়; শ্রমিকের মজুরি, স্থানীয় পরিবহন, ভাড়া, বিদ্যুৎ বা অন্যান্য দেশীয় খরচ তাদের মুনাফার ব্যবধান কিছুটা বাড়তে পারে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের মতো রপ্তানিনির্ভর শিল্প তাই দুর্বল টাকার কিছু সুবিধা পেতে পারে। তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘কিন্তু’ আছে। পোশাক কারখানাকে কাপড়, তুলা, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য কাঁচামাল আমদানি করতে হলে সেই সুবিধার একটা অংশ আবার ডলারের বাড়তি দামে চলে যায়। ফলে ডলার বাড়ল মানেই রপ্তানিকারকের লাভ বাড়ল এমন সরল হিসাব করা যাবে না।
বরং আমদানিকারকের ক্ষেত্রে হিসাবটা অনেক বেশি সরাসরি। ধরুন, একটি প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ ডলারের কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। বিনিময় হার ১২০ টাকা হলে খরচ ১২ কোটি টাকা; ১২৫ টাকা হলে একই পণ্যের জন্য লাগবে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম একটুও না বাড়লেও শুধু মুদ্রার দামের কারণে খরচ বাড়ল ৫০ লাখ টাকা। এই বাড়তি খরচ কোথাও না কোথাও সামঞ্জস্য করতে হবে; ব্যবসায়ী হয় মুনাফা কমাবেন, নয়তো পণ্যের দাম বাড়াবেন। এখান থেকেই ডলারের দাম ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্কটি সাধারণ মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বাংলাদেশের ওপর করা বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে টাকার বড় অবমূল্যায়ন আমদানি খরচ বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল; তাদের হিসাব অনুযায়ী, ওই অর্থবছরে প্রায় ২০ শতাংশ টাকার অবমূল্যায়ন সামগ্রিক মূল্যস্তর প্রায় ৫ শতাংশ বাড়াতে ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু এবার গল্পের সবচেয়ে মানবিক জায়গায় আসা যাক – প্রবাসী আয়। একজন প্রবাসী যদি মাসে ১ হাজার ডলার দেশে পাঠান, ডলারের দাম ১২০ টাকা থেকে ১২৫ টাকা হলে তাঁর পরিবার একই পরিমাণ ডলারের বিপরীতে ৫ হাজার টাকা বেশি পাবে। বাংলাদেশের মতো রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতিতে এটি ছোট বিষয় নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে প্রায় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৭.৩ শতাংশ বেশি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসেও এসেছে প্রায় ২.৮৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে টাকার দুর্বলতা প্রবাসী পরিবারের স্থানীয় মুদ্রায় আয় বাড়াতে পারে এবং একই সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বাড়লে দেশের রিজার্ভেও সহায়তা করে।
এখানে আরেকটি মজার বিষয় আছে। একজন রপ্তানিকারক ও একজন আমদানিকারক একই সময়ে ব্যবসা করলেও ডলারের দামের প্রভাব একেবারে উল্টো হতে পারে। ধরুন, একটি ওষুধ কোম্পানি বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে দেশে ওষুধ তৈরি করে। ডলার বাড়লে তার কাঁচামালের খরচ বাড়বে। অন্যদিকে একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ডলারে আয় করে, কিন্তু তার কর্মীদের বেতন ও অফিস খরচ মূলত টাকায়; তার ক্ষেত্রে একই ডলার বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক। অর্থাৎ আসল প্রশ্ন ‘ডলার বাড়ছে কি না’ নয়; প্রশ্ন হলো আপনার ব্যবসার আয় কোন মুদ্রায় আর খরচ কোন মুদ্রায়?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতাও এই হিসাবটি বুঝতে সাহায্য করে। ২০২২ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে টাকার ওপর চাপ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তঃব্যাংক ডলার-টাকা বিনিময় হার ৮৬.২০ টাকা থেকে ১০২.০৭ টাকায় উঠে যায় অর্থাৎ কয়েক মাসেই টাকার উল্লেখযোগ্য অবমূল্যায়ন হয়। পরে আমদানি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে অর্থনীতিকে সামলাতে হয়েছে। ওই সময়ে দেখা গেছে, দুর্বল টাকা একদিকে রপ্তানি ও রেমিট্যান্সকে স্থানীয় মুদ্রায় বেশি মূল্য দিয়েছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও খাদ্যের দামে চাপ তৈরি করেছে।
তাহলে ডলার শক্তিশালী হওয়া বাংলাদেশের জন্য ভালো, নাকি খারাপ? উত্তরটি আসলে ‘কার জন্য’ দিয়ে শুরু করতে হবে। ডলারে আয় করা রপ্তানিকারক, ফ্রিল্যান্সার বা বিদেশি ক্লায়েন্টের কাছ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাওয়া ব্যবসা সুবিধা পেতে পারে। প্রবাসী পরিবারের টাকার অঙ্কও বাড়তে পারে। কিন্তু আমদানিকারক, আমদানি-নির্ভর শিল্প, বিদেশি ঋণ পরিশোধকারী প্রতিষ্ঠান এবং শেষ পর্যন্ত আমদানি করা পণ্যের ভোক্তা চাপের মুখে পড়েন। এমনকি রপ্তানিকারকও যদি উৎপাদনের বড় অংশ আমদানিনির্ভর হয়, তাহলে তাঁর পাওয়া অতিরিক্ত ডলারের মূল্য বাড়লেও খরচও বাড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডলারের দাম বাড়া নিজে কোনো লাভ বা ক্ষতির গল্প নয়; এটি অর্থনীতির ভেতরে সম্পদের পুনর্বণ্টনের গল্প। একজনের বাড়তি টাকা অন্য কারও বাড়তি খরচ হয়ে উঠতে পারে। তাই শুধু রপ্তানি বাড়ছে বা রেমিট্যান্স বাড়ছে দেখে খুশি হওয়ার সুযোগ নেই; দেখতে হবে আমদানির খরচ কতটা বাড়ছে, মূল্যস্ফীতিতে কতটা চাপ পড়ছে, ব্যবসার প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা কী অবস্থায় আছে এবং শেষ পর্যন্ত বাড়তি ডলারের আয় অর্থনীতিতে কতটা উৎপাদনশীল কাজে ফিরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৬.৪ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ শক্তিশালী করা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এমন একটি বিনিময় হার ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে ডলারের দাম অর্থনীতির বাস্তব চাহিদা-জোগানের সংকেত দেবে কিন্তু হঠাৎ বড় ধাক্কা দিয়ে ব্যবসা, বাজার ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে অস্থির করে তুলবে না।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

