ব্রাজিলের আমাজন জঙ্গলের গভীরে মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা শত শত বিশাল কাঠামো খুঁজে পেয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের ধারণা, লাখ লাখ মানুষের একটি প্রাচীন সভ্যতা এসব কাঠামো তৈরি করেছিল। আকাশ থেকে লেজার স্ক্যানের মাধ্যমে ঘন বনের নিচের এই নকশা শনাক্ত করা গেছে। আবিষ্কারটি আমাজনকে মানুষের বসতিহীন এক অরণ্য হিসেবে দেখার দীর্ঘদিনের ধারণাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক সাময়িকী নেচারে। স্পেন, ফিনল্যান্ড, ব্রাজিল ও ডেনমার্কের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের একদল বিজ্ঞানী এতে কাজ করেছেন। তাঁরা লাইডার (লাইট ডিটেকশন অ্যান্ড রেঞ্জিং) নামের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। এই প্রযুক্তিতে লেজার পালস ছুড়ে দূরত্ব মাপা হয় এবং এর মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের জটিল ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা যায়। ফলে গাছ না কেটে এবং প্রতিটি জায়গায় সশরীরে না গিয়েই বিশাল এলাকা বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয়েছে।

হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃবিজ্ঞানী এবং গবেষণাপত্রের সহলেখক মার্টি পার্সিনেন জানান, আমাজনে এটিই প্রথম সত্যিকারের উচ্চাভিলাষী লাইডার জরিপ। এর আগে এ ধরনের ভূ-লিপি কেবল বন উজাড় হয়ে যাওয়া এলাকাতেই পাওয়া গিয়েছিল। এবার ঘন বনের ভেতরেও এর অস্তিত্ব ধরা পড়ল।
গবেষক দল মোট চার হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালায়। ভূ-লিপি বলতে বোঝানো হচ্ছে মাটিতে তৈরি করা বিশাল নকশা বা আকৃতি, যা জিওগ্লিফ নামেও পরিচিত। জরিপে এমন ৪৩২টি কাঠামো শনাক্ত হয়েছে। এগুলোর বেশির ভাগই আগে কখনো নথিভুক্ত হয়নি। গবেষকদের হিসাবে, এসব কাঠামো খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তৈরি করা হয়েছিল।
এসব কাঠামো যে সভ্যতার হাতে গড়া, তাকে অ্যাকুইরি সভ্যতা বলা হচ্ছে। গবেষকদের অনুমান, এই সভ্যতা প্রায় এক লাখ ৮৩ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। আয়তনের দিক থেকে এটি মোটামুটি কম্বোডিয়া বা সিরিয়ার সমান। ১০০ থেকে ৩০০ খ্রিস্টাব্দের সময়কে সভ্যতাটির সবচেয়ে সমৃদ্ধ যুগ ধরা হচ্ছে। তখন সেখানে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস করতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আমাজন জিওগ্লিফস ইনস্টিটিউটের সভাপতি ও দলের সদস্য জীবাশ্মবিজ্ঞানী আলসেউ রানজি এই আবিষ্কারের সময়কাল নিয়ে একটি তুলনা টেনেছেন। তাঁর ভাষ্য, গ্রিসে যখন পিথাগোরাস তাঁর উপপাদ্য নিয়ে কাজ করছিলেন, প্রায় একই সময়ে আমাজনের মানুষেরা বিশাল জ্যামিতিক শিল্পকর্ম গড়ছিল।
নির্মাণের মাপ দেখলেই বোঝা যায়, কাজটি সহজ ছিল না। রানজি জানান, গবেষকেরা ১৫ মিটার পর্যন্ত চওড়া এবং পাঁচ মিটার গভীর নালা খুঁজে পেয়েছেন। এত বড় কাঠামো তৈরির জন্য বড় সম্প্রদায়ের সম্মিলিত শ্রম দরকার ছিল। ওই অঞ্চলে কোনো পাথর পাওয়া যায় না। তাই তাঁর ধারণা, মাটি বহনের জন্য মানুষ কাঠের সরঞ্জাম ও ঝুড়ি ব্যবহার করত। তবে আমাজনের আর্দ্র আবহাওয়ায় জৈব পদার্থ দ্রুত পচে যায়। এ কারণে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। গবেষকদের মতে, বিপুল সংখ্যক কর্মী, শ্রম বিভাজন এবং গণিত ও জ্যামিতির যথেষ্ট জ্ঞান ছাড়া এমন নির্মাণ সম্ভব ছিল না।
এসব কাঠামো কী কাজে লাগত, তা নিয়ে ধারণাও বদলেছে। একসময় মনে করা হতো, এগুলো দুর্গ বা প্রতিরক্ষামূলক স্থাপনা, যা বসতিকে হামলা থেকে রক্ষা করত। এখন বিশেষজ্ঞদের বেশির ভাগ মনে করেন, এগুলো স্থায়ী বসবাসের জায়গা ছিল না। বরং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রয়োজনে মানুষের জমায়েতের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রানজির মতে, এ ধারণা সত্যি হলে ওই মানুষেরা সম্ভবত শান্তিতেই বাস করত। কারণ, এত শ্রম ও সময় এসব নির্মাণে ব্যয় করা মানে তাঁদের বড় কোনো শত্রুর দুশ্চিন্তা ছিল না।
পার্সিনেন আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, এই মানুষেরা প্রকৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিল। তাঁরা কখনো রেইনফরেস্টকে গাছহীন প্রান্তরে পরিণত করেননি। ভুট্টা, স্কোয়াশ ও ম্যানিওক চাষের জন্য যতটুকু জমি দরকার, বন কেবল ততটুকুই পরিষ্কার করা হয়েছিল।
খননে দেখা গেছে, কাঠামোগুলো যত্নের সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণও করা হতো। ব্রাজিলের পারার ফেডারেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ ও নৃবিজ্ঞানী রুয়ান কার্লোস লোপেস বলেন, বিষয়টি শুধু নির্মাণের ছিল না। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এগুলো টিকিয়ে রাখাও জরুরি ছিল। এর জন্য নিশ্চয়ই সঞ্চিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভান্ডার ছিল।
লাইডার চিত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে। জিওগ্লিফগুলো জঙ্গলে বিচ্ছিন্ন কোনো স্থাপনা ছিল না। রানজি জানান, গবেষকেরা এসব স্থাপনাকে যুক্ত করা ৩৫০ কিলোমিটার রাস্তার মানচিত্র তৈরি করেছেন। স্থাপনার কাছাকাছি গেলে রাস্তাগুলো আরও চওড়া হয়ে যেত। অর্থাৎ পুরো অঞ্চলই একটি সংগঠিত যোগাযোগব্যবস্থার আওতায় ছিল।
গবেষকদের কাছে একটি বিষয় এখনো রহস্য। আনুমানিক ৮৫০ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই ভূ-লিপি নির্মাণ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়। কেন, তা স্পষ্ট নয়। রানজি এ ঘটনার সঙ্গে মায়া সভ্যতার মিল দেখেছেন। মেক্সিকো ও মধ্য আমেরিকার মায়া কেন্দ্রগুলোও প্রায় একই সময়ে পরিত্যক্ত হয়েছিল। তাঁর ধারণা, নবম শতাব্দীতে হয়তো বড় ধরনের কোনো পরিবেশগত সংকট দেখা দিয়েছিল। তবে এটি এখনো অনুমানের পর্যায়ে রয়েছে।
এই আবিষ্কার আমাজনের জনসংখ্যা নিয়ে হিসাবও নতুন করে সামনে এনেছে। আগের গবেষণায় ধারণা করা হয়েছিল, ইউরোপীয়দের আসার আগে পুরো আমাজনে ১০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ বাস করত। পরবর্তী অনুমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ৫০ লাখ থেকে এক কোটিতে পৌঁছায়। এখন তুলনামূলক ছোট একটি এলাকাতেই যদি ৩০ লাখ মানুষ থেকে থাকে, তাহলে এই হিসাব আবারও ওপরের দিকে সংশোধন করতে হতে পারে।
আরেকটি পুরোনো ধারণাও এতে দুর্বল হয়েছে। অনেকে মনে করতেন, আমাজনের মানুষ প্রধানত বড় নদীর তীরে থাকত, কারণ সেখানে খাদ্য সহজে মেলে। কিন্তু এই ভূ-লিপিগুলো মূলত নদীগুলোর মাঝের উঁচু এলাকায় পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যায়, নদী থেকে দূরে বিপুল মানুষ বসতি গড়েছিল, বন বদলে ফেলেছিল এবং ফসল ফলিয়েছিল। রানজির ভাষ্য, তাঁরা ভূপ্রকৃতি বুঝতেন এবং নদীর বাইরে পায়ে হেঁটে চলাচলের পথ ধরেই জীবন চালাতেন।
লোপেস এ প্রসঙ্গে বলেন, আমাজন কোনো বিশাল প্রাকৃতিক অরণ্য নয়। বরং এটি মানুষের কর্মকাণ্ডে গড়ে ওঠা একটি বিশাল ঐতিহাসিক উদ্যান।
সব মিলিয়ে এই গবেষণা প্রমাণ করে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রান্তীয় বনও একসময় সংগঠিত ও জ্ঞানসমৃদ্ধ মানবসমাজের আবাস ছিল। প্রযুক্তির সাহায্যে বনের আড়ালে থাকা ইতিহাস নতুন করে পড়া যাচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত এলাকায় লাইডার জরিপ হলে আমাজনের মানববসতির ইতিহাস আরও স্পষ্ট হতে পারে।

