বিশেষ বিশ্লেষণ
একটি দুর্বল ব্যাংককে আরেকটি শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করলেই কি সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? বাইরে থেকে বিষয়টি বেশ সহজ মনে হয় দুটি ব্যাংক মিলে একটি বড় ব্যাংক হবে, আমানতকারীর আস্থা ফিরবে, পরিচালন ব্যয় কমবে। কিন্তু ব্যাংকের ভেতরে যদি খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও সুশাসনের সমস্যা থেকে যায়, তাহলে মার্জার শুধু দুর্বল ব্যাংকের নাম বদলাতে পারে, রোগ সারাতে পারে না। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এখন ঠিক এই প্রশ্নটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ সমস্যাটি ছোট নয়। বিশ্বব্যাংকের জুন ২০২৬-এর হিসাবে, মার্চ শেষে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২.৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭.৯ শতাংশ। আর ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মূলধন-ঝুঁকি অনুপাত বা ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড-অ্যাসেটস রেশিও নেমে গিয়েছিল ঋণাত্মক ২.৬ শতাংশে। অর্থাৎ কিছু ব্যাংকের সমস্যা এখন শুধু তারল্যের নয়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখার মতো মূলধনই যথেষ্ট নেই।
পাঁচ ব্যাংক এক হলো, কিন্তু আসল প্রশ্ন রয়ে গেল
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ব্যাংক একীভূতকরণের এই মডেলের বাস্তব প্রয়োগ শুরু করেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে পাঁচটি দুর্বল শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে শনাক্ত ও পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই একীভূতকরণ করা হয়েছে। তবে এখানে শুধু পাঁচটি ব্যাংককে একটি প্রতিষ্ঠানের ছাতার নিচে আনা হয়নি; নতুন ব্যাংকটির মূলধন শক্তিশালী করতেও বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া হয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয় ৪০ হাজার কোটি টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দিয়েছে। অর্থাৎ ঘটনাটি শুধু মার্জার নয়, মার্জারের সঙ্গে রিক্যাপিটালাইজেশনও আর এখানেই বাংলাদেশের ব্যাংক একীভূতকরণ পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি লুকিয়ে আছে।
এখানেই বোঝা যায়, মার্জার আর রিক্যাপিটালাইজেশন একই জিনিস নয়। মার্জার হলো দুটি বা একাধিক ব্যাংকের সম্পদ, দায়, আমানত, শাখা ও কার্যক্রমকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনা। আর রিক্যাপিটালাইজেশন হলো ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা। একটি ব্যাংকের ১০০ টাকা সম্পদের বিপরীতে যদি প্রকৃত ক্ষতি এত বেশি হয় যে তার মূলধন প্রায় শেষ, তখন শুধু আরেকটি ব্যাংকের সঙ্গে সেটিকে জুড়ে দিলেই সেই ক্ষতি অদৃশ্য হয় না। কেউ না কেউ সেই ক্ষতির বোঝা বহন করবে পুরোনো শেয়ারহোল্ডার, নতুন ব্যাংক, সরকার বা শেষ পর্যন্ত করদাতা।
এই কারণেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ মূল্যায়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা এসেছে। সংস্থাটি বলেছে, অকার্যকর বা নন-ভায়াবল ব্যাংককে ব্যালান্স শিট পরিষ্কার না করে মার্জ করা উচিত নয়। আগে দেখতে হবে ব্যাংকটি আদৌ বাঁচানোর মতো অবস্থায় আছে কি না, তার প্রকৃত সম্পদ ও খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত, এবং একীভূত করার পর নতুন ব্যাংকের ওপর সেই ক্ষতির বোঝা কতটা পড়বে। অর্থাৎ প্রশ্ন শুধু “কাকে কার সঙ্গে মার্জ করা হবে” নয়; তার আগের প্রশ্ন হলো “কী নিয়ে মার্জ করা হবে?”
সব দুর্বল ব্যাংকের জন্য একই ওষুধ কেন কাজ করে না?
এখানে তিনটি শব্দ বুঝে নেওয়া দরকার মার্জার, লিকুইডেশন এবং রিক্যাপিটালাইজেশন। ধরুন, একটি ব্যাংকের সমস্যা সাময়িক। আমানতকারীরা আতঙ্কে টাকা তুলছেন, কিন্তু ব্যাংকের মূল ব্যবসা মোটামুটি কার্যকর এবং সম্পদের মানও ভালো। এ ক্ষেত্রে তারল্য সহায়তা, নতুন মূলধন বা একটি শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূতকরণ কাজে আসতে পারে। কারণ ব্যাংকটির মূল সমস্যা তখন হয়তো আস্থার সংকট, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা বা সাময়িক লিকুইডিটি চাপ।
কিন্তু সমস্যা যদি আরও গভীর হয় ধরা যাক, বছরের পর বছর জালিয়াতি হয়েছে, বিপুল ঋণ আদায় হচ্ছে না, সম্পদের প্রকৃত মূল্য হিসাবের খাতার চেয়ে অনেক কম এবং নতুন করে টাকা ঢাললেও লাভজনক ব্যাংক হওয়ার সম্ভাবনা নেই তাহলে শুধু রিক্যাপিটালাইজেশনও সমাধান নয়। বরং সেটি হতে পারে পুরোনো ভুলের দাম নতুন করে জনগণের টাকা দিয়ে পরিশোধ করা। বিশ্বব্যাংকও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য পুনর্গঠন, আমানত সুরক্ষা এবং ব্যাংক রেজোলিউশনের সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দিয়েছে। জুনে ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন অনুমোদনের সময় বিশ্বব্যাংক বিশেষভাবে ব্যাংক রেজোলিউশন, ডিপোজিট প্রটেকশন ও পুনর্গঠন কৌশল তৈরির কথা বলেছে।
আর কোনো ব্যাংক যদি কার্যত অচল হয়ে যায় এবং তাকে বাঁচানোর খরচ বাঁচিয়ে রাখার সম্ভাব্য সুবিধার চেয়ে বেশি হয়, তখন আসে লিকুইডেশন। শব্দটি শুনতেই ভয় লাগতে পারে, কারণ এর অর্থ ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে সম্পদ বিক্রি করে পাওনাদারদের পাওনা মেটানোর প্রক্রিয়ায় যাওয়া। কিন্তু সব সময় ব্যাংক বন্ধ করে দেওয়া সবচেয়ে খারাপ সমাধান নয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, যদি কোনো ব্যাংক আর টেকসই না হয়, দ্রুত ও সুশৃঙ্খল রেজোলিউশন অনেক সময় বছরের পর বছর কৃত্রিমভাবে তাকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে কম ক্ষতিকর হতে পারে। আইএমএফের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, পুনঃমূলধনীকরণ বা মার্জার ব্যর্থ ব্যাংকের ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে, আর সুশৃঙ্খল রেজোলিউশনের মাধ্যমে আমানতকারীদের সুরক্ষা দিয়ে কার্যকর অংশ অন্য ব্যাংকের কাছে স্থানান্তর করা অনেক ক্ষেত্রে বেশি বাস্তবসম্মত।
ইতিহাসও বলে, বড় ব্যাংক মানেই শক্তিশালী ব্যাংক নয়
২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর ব্যাংক রেজোলিউশনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল “ঠু বিগ টু ফেইল” ধারণাটিও বিপজ্জনক হতে পারে। ২০২৩ সালে সমস্যায় পড়া সুইজারল্যান্ডের ক্রেডিট সুইসকে ইউবিএসের সঙ্গে একীভূত করা হয়েছিল। এতে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের আর্থিক অস্থিরতা ঠেকানো সম্ভব হলেও আইএমএফ পরে উল্লেখ করেছে, সরকারি গ্যারান্টি ও তারল্য সহায়তার মাধ্যমে এই অধিগ্রহণে বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত একটি আরও বড়, আরও সিস্টেমিক ব্যাংক তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ একটি দুর্বল প্রতিষ্ঠানকে বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করা গেলেই ঝুঁকি শেষ হয় না; কখনো কখনো ঝুঁকিটা আরও বড় প্রতিষ্ঠানের শরীরে চলে যায়।
আবার তুরস্কের ২০০১ সালের ব্যাংকিং সংকটেও দেখা যায়, কয়েকটি ব্যাংক একীভূত করার পরও সব প্রতিষ্ঠান টেকেনি। কিছু ব্যাংক পরে বন্ধ করে দেওয়া হয়, আবার কিছু ব্যাংকের সম্পদ ও দায় অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। অর্থাৎ রেজোলিউশনের সফলতা নির্ভর করে শুধু “মার্জ” শব্দটির ওপর নয়; নির্ভর করে কে নতুন ব্যাংকটি চালাবে, পুরোনো ক্ষতি কে নেবে, সম্পদের প্রকৃত মূল্য কত এবং আমানতকারীদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে তার ওপর।
বাংলাদেশের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। একদিকে দুর্বল ব্যাংককে আলাদা আলাদা রেখে দিলে আমানতকারীর আস্থা, ঋণপ্রবাহ ও পুরো অর্থনীতিতে সমস্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে সব দুর্বল ব্যাংককে কয়েকটি বড় ব্যাংকের মধ্যে গুঁজে দিলে তৈরি হতে পারে “ঠু বিগ টু ফেইল” ধরনের প্রতিষ্ঠান। তখন কোনো বড় ব্যাংক আবার সমস্যায় পড়লে সরকার হয়তো বলতে পারবে না, “এটিকে বন্ধ হতে দিই” কারণ তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে কোটি কোটি আমানত, অসংখ্য ব্যবসা এবং পুরো অর্থনীতির ঋণপ্রবাহ।
তাই বাংলাদেশের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ ব্যাংকের সংখ্যা কমানো নয়, দুর্বলতার কারণ কমানো। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ব্যাংক রেজোলিউশন কাঠামো, ডিপোজিট প্রটেকশন ব্যবস্থা এবং ২০২৬ সালের ব্যাংক রেজোলিউশন ও ডিপোজিট প্রটেকশন আইনের লক্ষ্যও মূলত এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করা। জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৬-এর মুদ্রানীতি নথিতে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, নতুন কাঠামোর আওতায় দুর্বল প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, ছোট আমানতকারীকে সুরক্ষা এবং মোরাল হ্যাজারড কমানোর জন্য রেজোলিউশন টুল ব্যবহার করা হবে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা “মার্জার ভালো, নাকি লিকুইডেশন ভালো?” এভাবে দেখলে ভুল হবে। যে ব্যাংক সামান্য মূলধন ও ভালো ব্যবস্থাপনায় ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তার জন্য রিক্যাপিটালাইজেশন যুক্তিযুক্ত হতে পারে। যে ব্যাংকের কার্যক্রম টেকসই কিন্তু একা টিকে থাকা কঠিন, তার জন্য মার্জার কার্যকর হতে পারে। আর যে ব্যাংকের ক্ষতি এত গভীর যে তাকে বাঁচানোর খরচ ভবিষ্যৎ ক্ষতির চেয়ে বেশি, সেখানে সুশৃঙ্খল লিকুইডেশন বা অন্য ধরনের রেজোলিউশনই হয়তো কম ক্ষতিকর পথ। অর্থাৎ দুর্বল ব্যাংককে বাঁচানোই লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত আমানতকারী, অর্থনীতি এবং করদাতার ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে একটি কার্যকর ব্যাংকিং ব্যবস্থা তৈরি করা। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

