চলতি অর্থবছরের বাজেটে কৃষিপণ্য, সোলার সরঞ্জাম, কম্পিউটার, বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ও মসলাসহ পঞ্চাশের বেশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক-কর কমানো হলেও তার সুফল খুচরা বাজারে পৌঁছাচ্ছে না। বরং বেশিরভাগ পণ্যের দাম আগের মতোই আছে, আর কিছু পণ্যের দাম উল্টো বেড়ে গেছে। ফলে ভোক্তারা যে সুবিধা পাওয়ার কথা ছিল, তার প্রতিফলন বাস্তবে দেখা যাচ্ছে না।
ব্যবসায়ীরা এই দাম বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি, দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট এবং বন্যা-অতিবৃষ্টির মতো একাধিক কারণ তুলে ধরছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু কর কমিয়ে দেওয়াই যথেষ্ট নয়—এই সুবিধা আসলে ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা দরকার।
চলতি বছরের ১১ জুন উপস্থাপিত নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে তেষট্টিটি নিত্যপণ্যের কর কমানো হয়েছিল। এর মধ্যে সব ধরনের আমদানি করা মসলার ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়, আর চাল, আটা, গম, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি ও ভোজ্যতেলসহ প্রায় ষাটটি মৌলিক পণ্যের আমদানি ও সরবরাহে উৎসে কর কমিয়ে আনা হয় প্রায় শূন্যের কাছাকাছি পর্যায়ে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। ট্রেডিং করপোরেশনের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম বেড়েছে সাড়ে এগারো শতাংশের মতো, বোতলজাত তেলের দাম বেড়েছে ছয় থেকে নয় শতাংশ। মসলার দাম বেড়েছে দশ থেকে ষোলো শতাংশ পর্যন্ত, চিনির দাম বেড়েছে সামান্য, আর সাধারণ মানের খেজুরের দাম বেড়েছে প্রায় সতেরো শতাংশ। এমনকি গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটারে পাঁচ টাকা বাড়ানোর অনুমতিও দিয়ে দিয়েছে, যদিও ব্যবসায়ীরা প্রথমে দশ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
একজন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পরিচালক জানান, আমদানি পর্যায়ে সব খরচ বেড়ে গেছে, বিশেষত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচও বেড়েছে, যার প্রভাবে প্রতি লিটারে আঠারো থেকে বিশ টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে।
চালের বাজারেও একই ধরনের চিত্র। বর্তমানে খুচরা বাজারে মোটা চাল, মিনিকেট, নাজিরশাইলের মতো বিভিন্ন জাতের চালের দাম আগের তুলনায় বাড়তি অবস্থায় আছে। পাইকারি বিক্রেতাদের ভাষ্য, হাতবদল ও পরিবহন খরচ বাড়ায় বস্তাপ্রতি বাড়তি দাম গুনতে হচ্ছে তাদেরও। সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধি হয়েছে তুলনামূলক বেশি—এক মাস আগের তুলনায় প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে লক্ষণীয়ভাবে।
সোলার পণ্যের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে করছাড়ের বিপরীত ফল। জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের কারণে অনেকেই সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছেন, কিন্তু লিথিয়াম ব্যাটারি, সোলার প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর শুল্ক কমানোর পরও রাজধানীর বাজারে দাম কমেনি—চাহিদা বাড়ার সুযোগে কিছু ক্ষেত্রে দাম আরও বেড়েছে। রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, একটি সম্পূর্ণ সোলার সিস্টেম বসাতে গ্রাহকের এখন খরচ পড়ছে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার বেশি।
একজন সোলার প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যাখ্যা করেন, সরকার বাণিজ্যিকভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে করছাড় দিলেও তার সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না, কারণ সোলার মাউন্টিং কাঠামো ও ব্যাটারিতে এখনো অর্ধেকের বেশি হারে কর বহাল আছে। তিনি মনে করেন, শুধু কর অবকাশ দিয়ে কাজ হবে না—সহজ শর্তে ঋণসুবিধাও চালু করা জরুরি।
কম্পিউটার সরঞ্জামের বাজারেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। র্যাম, এসএসডি ও গ্রাফিকস কার্ডের দাম গত এক বছরে বেশ কিছুটা বেড়ে গেছে, কোনো কোনো মডেলে দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে ব্যতিক্রম হিসেবে মনিটরের দাম করহার কমার পর প্রায় বিশ শতাংশ কমেছে বলে জানা গেছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে একটি ভোক্তা অধিকার সংগঠনের একজন কর্মকর্তা বলেন, বাজেটে যত পণ্যেই শুল্ক-কর কমানো হোক, খুচরা পর্যায়ে তার কোনো প্রতিফলন নেই। তিনি মনে করেন, সরকারের দেওয়া এই সুবিধা আসলে কোথায় যাচ্ছে, তা নজরদারি করা প্রয়োজন—কারণ বিপুল অঙ্কের করছাড় দেওয়া হলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল পাচ্ছেন না। তিনি আরও বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্তের সুবিধা মাঝখানে অন্য কেউ ভোগ করছে কি না, তা খতিয়ে দেখা এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া দরকার।

