বাংলাদেশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন অর্থ বা রিজার্ভ মানির প্রবাহ আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি ছিল ঋণাত্মক ০ দশমিক ১২ শতাংশ। এরপর তা ধারাবাহিকভাবে বেড়ে চলতি বছরের আগস্টে ১৭ দশমিক ৮৬ শতাংশে পৌঁছেছে।
রিজার্ভ মানি বলতে প্রচলিত মুদ্রা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা আমানতের সমষ্টিকে বোঝায়। এটি পুরো অর্থ ব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং ব্যাংকগুলোর ঋণ সৃষ্টির মাধ্যমে বাজারে অর্থের পরিমাণ বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু আধা-রাজস্ব কার্যক্রম, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে তারল্য সহায়তা এবং ভর্তুকিযুক্ত ঋণ ব্যবস্থার কারণে বাজারে অতিরিক্ত অর্থ প্রবাহিত হচ্ছে।
তাদের মতে, একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি চালানোর কথা বলছে, অন্যদিকে বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ বাড়ছে। এতে মুদ্রানীতির কাঙ্ক্ষিত প্রভাব দুর্বল হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, উচ্চ নীতিসুদ বজায় রাখা ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে কম সুদে ব্যাংকগুলো অর্থ পাচ্ছে।
তিনি বলেন, রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা চাপ তৈরি করে এবং বিষয়টি উদ্বেগের।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ১০ শতাংশ নীতিসুদ বজায় রেখেছিল। বর্তমানে নীতিসুদ রয়েছে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং রিজার্ভ মানি বাড়ার কারণে মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংক ডিসেম্বর পর্যন্ত নীতিসুদ কমানোর বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্টে দেশের সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জুলাইয়ে এটি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের জুলাই থেকে ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা কিনেছে, যার ফলে বাজারে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রবেশ করেছে।
তবে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কম থাকায় এর প্রভাব কিছুটা সীমিত রয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যদি রিজার্ভ মানির প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ে, তাহলে কঠোর মুদ্রানীতির পরিস্থিতিতে এটি বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু নীতিসুদ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; অর্থ সরবরাহ, ব্যাংক খাতের তারল্য এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাও সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।

