বিশেষ বিশ্লেষণ
বাংলাদেশের মানচিত্রের দিকে তাকালে একটি বিষয় সহজেই চোখে পড়ে। পশ্চিমে ভারতের মূল ভূখণ্ড, পূর্বে উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। অর্থাৎ দক্ষিণ এশিয়ার একটি বড় অংশের জন্য সমুদ্রপথে যাওয়ার দরজা, আবার উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য অপেক্ষাকৃত স্বল্প দূরত্বের একটি সম্ভাব্য বাণিজ্যপথ। কিন্তু শুধু মানচিত্রে সুবিধাজনক জায়গায় থাকলেই কোনো দেশ বাণিজ্যিক হাব হয়ে যায় না। এখানে, আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই ভৌগোলিক সুবিধাকে কম খরচ, কম সময় এবং নির্ভরযোগ্য লজিস্টিক সেবায় রূপ দিতে পারবে?
সম্প্রতি জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুয়ুকি কাতাওকা বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল বা ‘সেভেন সিস্টার্স’-এর সঙ্গে যোগাযোগ উন্নত করা গেলে বাংলাদেশ জাপানি কোম্পানিগুলোর জন্য উৎপাদন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হতে পারে, এমন সম্ভাবনার কথা তিনি তুলে ধরেছেন।
যদিও বাস্তবায়নটা সহজ নয়, কথাটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য বাংলাদেশকে ব্যবহার করা শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয় নয়; এর পেছনে আছে খুব সাধারণ একটি অর্থনৈতিক যুক্তি; দূরত্ব কমলে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই কমবে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণাতেও বলা হয়েছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দর ও পরিবহন নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে পণ্য পরিবহনের দূরত্ব কমবে। ভারতের এই অঞ্চলটি মূল ভারতের সঙ্গে একটি সংকীর্ণ স্থলপথের মাধ্যমে যুক্ত হওয়ায় সেখানে পরিবহন ব্যয় ও সময়ের চাপ দীর্ঘদিনের সমস্যা।
বাংলাদেশের সুবিধাটা কোথায়?
চলুন, একটু সহজ করে ভাবা যাক। ভারতের আসাম, মেঘালয় বা ত্রিপুরার কোনো ব্যবসায়ী যদি সমুদ্রপথে পণ্য আনতে চান, তাহলে তার জন্য বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হলে একটি বিকল্প রুট পাওয়া যায়। ভারত-বাংলাদেশ চুক্তির অধীনে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের একাধিক রুট ইতোমধ্যে নির্ধারিত হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম/মোংলা থেকে আগরতলা, দাওকি, সুতারকান্দি ও শ্রীমন্তপুরের রুট রয়েছে।
শুধু সড়ক নয়, নৌপথও এখানে বড় সম্পদ। ভারত-বাংলাদেশের ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড প্রটোকলের আওতায় দুই দেশের নির্ধারিত নদীপথ ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের সুযোগ রয়েছে। ভারতের ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্ক উত্তর-পূর্ব ভারতকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করার বিকল্প তৈরি করেছে এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রটোকল রুটে প্রায় ৪.৬৮ মিলিয়ন টন পণ্য পরিবহন হয়েছে।
এখানেই বাংলাদেশের সম্ভাবনার আসল জায়গাটি। আমরা যদি ‘হাব’ বলতে শুধু অন্য দেশের পণ্য আমাদের ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে পার করে দেওয়াকে বুঝি, তাহলে সুযোগটি ছোট। কিন্তু যদি বন্দর, গুদাম, কাস্টমস, পরিবহন, প্যাকেজিং, প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিল্পাঞ্চল এবং আর্থিক সেবাকে একসঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে বিষয়টি বদলে যায়। তখন বাংলাদেশ শুধু ট্রানজিট রুট নয়, একটি লজিস্টিকস ও উৎপাদন কেন্দ্র হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
সমস্যা হলো, রাস্তা থাকলেই বাণিজ্য চলে না
এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটা। একটি পণ্য সীমান্ত পার হতে কত সময় নেয়, কাস্টমসে কতক্ষণ আটকে থাকে, বন্দরে কতদিন পড়ে থাকে, এক পরিবহন থেকে আরেক পরিবহনে কতবার বদলাতে হয়, এসবই ব্যবসার খরচের অংশ। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি বিশ্লেষণ বলছে, বাংলাদেশে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ব্যয় বাড়ার পেছনে অপর্যাপ্ত পরিবহন অবকাঠামোর পাশাপাশি জটিল বিধিবিধান, ম্যানুয়াল প্রক্রিয়া এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধাও ভূমিকা রাখে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য করার চেয়ে দূরের ব্রাজিল বা জার্মানির সঙ্গে বাণিজ্য করাও তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হতে পারে।
এটি আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কারণ ভৌগোলিক সুবিধা নিজে কোনো প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নয়; সেটিকে লজিস্টিকস সুবিধায় পরিণত করতে হয়। ২০২৫ সালের জাপানিজ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপিং ইকোনমিজের একটি গবেষণাতেও উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্ভাবনার প্রধান বাধা হিসেবে দুর্বল অবকাঠামো, উচ্চ লজিস্টিকস ব্যয় এবং নিয়ন্ত্রক জটিলতার কথা উঠে এসেছে। ৭১টি কোম্পানির ওপর জরিপ ও মাঠপর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে গবেষণাটি দেখিয়েছে, অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্কার ও বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণও প্রয়োজন।
অর্থাৎ চট্টগ্রাম থেকে সীমান্ত পর্যন্ত একটি ভালো মহাসড়ক বানালেই হবে না। বন্দর থেকে ট্রাক বের হতে কত সময় লাগে, সীমান্তে কাগজপত্র কত দ্রুত সম্পন্ন হয়, পণ্য এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার সময় কোথায় থামে, রেল ও নৌপথের সঙ্গে সড়ক কতটা সহজে যুক্ত হয়; সবকিছুকে একই ব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। একটি ভালো রাস্তা পুরো লজিস্টিকস চেইনের দুর্বলতা ঢেকে দিতে পারে না।
কিন্তু আসল প্রশ্ন ‘সংযোগ’ কতটা কার্যকর হবে
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে সড়ক, রেল ও বন্দর তিন দিকেই বিনিয়োগ করছে। আখাউড়া-লাকসাম রেলপথের ডাবল লাইন প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল রেলপথের সক্ষমতা বাড়ানো; বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রকল্প নথিতে বলা হয়েছে, এই অংশে দৈনিক ট্রেন চলাচলের সক্ষমতা ৩১ জোড়া থেকে প্রায় ৭২ জোড়ায় উন্নীত করার লক্ষ্য ছিল। একই প্রকল্পকে আঞ্চলিক ও ট্রান্স-এশিয়ান রেল সংযোগ উন্নয়নের বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবেও দেখানো হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক উন্নয়ন এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলকে নতুন বাণিজ্যিক করিডরে পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করছে। জাইকার অর্থায়নে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো বাংলাদেশের কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে লজিস্টিকস কার্যক্রম সহজ করা। ২০২৩ সালে জাইকা মাতারবাড়ী বন্দর, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক এবং জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ-সংক্রান্ত তিন প্রকল্পে মোট ১৬৫.৩১৯ বিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত ঋণ সহায়তার চুক্তি করে।
মাতারবাড়ীর গুরুত্ব এখানেই শেষ নয়। জাপানের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ বা বিগ-বি উদ্যোগে অর্থনৈতিক অবকাঠামো, বিনিয়োগ পরিবেশ ও আঞ্চলিক কানেক্টিভিটিকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশকে একটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিসর হিসেবে বিবেচনা করে বঙ্গোপসাগর থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত পর্যন্ত শিল্পমূল্য শৃঙ্খল গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছে।
তবে এখানেও একটি পার্থক্য মনে রাখা জরুরি। বন্দর বানানো আর বন্দরকে আঞ্চলিক হাবে পরিণত করা এক জিনিস নয়। একটি বন্দর তখনই সত্যিকার অর্থে হাব হয়, যখন সেখানে পণ্য আসে, দ্রুত খালাস হয়, সড়ক-রেল-নৌপথে ছড়িয়ে যায়, গুদাম ও শিল্পকারখানায় যায় এবং আবার নতুন পণ্য নিয়ে ফিরে আসে। অর্থাৎ অবকাঠামো হলো প্রথম শর্ত; ব্যবসায়িক ব্যবহার হলো আসল পরীক্ষা।
জাপানের ভূমিকা কোথায়?
জাপানের জন্য এই অঞ্চলের গুরুত্ব শুধু বাংলাদেশে বিনিয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বন্দর, রেল, সড়ক ও নগর অবকাঠামোয় অর্থায়ন করেছে। মাতারবাড়ীকে ঘিরে জাপানের বিগ-বি ধারণার মূল লক্ষ্যগুলোর একটি হলো অবকাঠামোকে শিল্প ও আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির সঙ্গে যুক্ত করা। ২০২৫ সালে জাপানের সহায়তায় মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে সম্ভাব্য বহুমুখী সংযোগ নিয়ে গবেষণাও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের জন্য জাপানের সবচেয়ে মূল্যবান ভূমিকা শুধু অর্থায়ন নয়। প্রকল্পকে ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় পরিণত করার দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বন্দর নির্মাণের পাশাপাশি কাস্টমস ডিজিটাইজেশন, লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা, শিল্পমূল্য শৃঙ্খল, দক্ষ জনবল এবং জাপানি কোম্পানিগুলোর সরবরাহকারী নেটওয়ার্ককে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে বিনিয়োগের প্রভাব অনেক বড় হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়েও জেট্রো বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস ও আঞ্চলিক কানেক্টিভিটির উন্নতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে।
তাই আমাদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন এটা নয় যে, ‘আমরা কি আঞ্চলিক হাব হতে পারব কিনা’ বরং প্রশ্ন হলো, আমরা কি অন্য দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক রুট তৈরি করতে পারব কিনা, কারণ ব্যবসায়ী কোনো দেশের মানচিত্র দেখে পণ্য পাঠান না। তিনি হিসাব করেন, কত খরচ, কত সময়, কত ঝুঁকি এবং কতটা নির্ভরযোগ্যতা। বাংলাদেশ যদি এই চারটি জায়গায় প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে, তাহলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল শুধু একটি বাজার থাকবে না; এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় লজিস্টিকস, উৎপাদন ও সেবা বাজার হয়ে উঠতে পারে।
আর যদি অবকাঠামো তৈরি হয় কিন্তু সীমান্তে পণ্য আটকে থাকে, বন্দর থেকে কারখানায় পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে, কাস্টমস প্রক্রিয়া জটিল থাকে কিংবা এক পরিবহন ব্যবস্থা থেকে আরেকটিতে পণ্য স্থানান্তরের খরচ বেশি হয়, তাহলে আমাদের ভৌগোলিক সুবিধা কাগজেই থেকে যাবে।
শেষ পর্যন্ত আঞ্চলিক হাব হওয়ার প্রতিযোগিতা রাস্তা বানানোর নয়; সময় ও খরচ কমানোর। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুযোগ হয়তো মানচিত্রে আগেই দেওয়া আছে। এখন দরকার সেই মানচিত্রকে এমন একটি কার্যকর বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত করা, যেখানে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বাংলাদেশ এবং বঙ্গোপসাগর একে অন্যের বাজার ও সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

