২২ আগস্ট ২০২৬ শনিবার রাতে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি নির্মাণাধীন তিনতলা বাড়ি থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী (৬৫), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, কন্যা ও কনিষ্ঠ পুত্রের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে পুলিশ একে ডাকাতি-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড হিসেবে দেখলেও, পরদিন রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ দাবি করেন—প্রতিবেশী দুই তরুণ সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস ছাদে মাদক (ইয়াবা) সেবনের সময় ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় একে একে চারজনকে হত্যা করেছে। দুজনকে আটকের পর একই দিন বিকেলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি (ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায়) দেওয়া হয় এবং তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়।
নিহত পরিবারের স্বজনেরা, বিশেষত প্রীতিলতার বোন পূজা চক্রবর্তী ও পরিবারের জামাতা বিশ্বজিৎ রায় পুলিশের এই বয়ান প্রকাশ্যেই প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, দুই তরুণের শারীরিক সামর্থ্য একসঙ্গে চারজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করার মতো নয়, এবং পুরো বিবরণে অনেক প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
পুলিশের বক্তব্যের আইনি ভিত্তি কী?
লক্ষণীয় যে, হত্যার বিস্তারিত বিবরণ থেকে কে কাকে কীভাবে, কোন ক্রমে হত্যা করেছে, হত্যার পর কী খেয়েছে, গোসল করেছে কি না—এই পুরো আখ্যানটি এসেছে “গ্রেপ্তারকৃতদের বরাত দিয়ে” পুলিশ কমিশনারের মুখ থেকে, অর্থাৎ পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে দেওয়া বিবৃতির ভিত্তিত। এখানেই আসে সাক্ষ্য আইনের প্রাসঙ্গিকতা।
বাংলাদেশে প্রযোজ্য সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ২৪ থেকে ৩০ ধারা পর্যন্ত স্বীকারোক্তি সংক্রান্ত বিধান রয়েছে। মূল কাঠামোটি এরকম:
- ধারা ২৪ — ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রলোভন বা প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি ফৌজদারি মামলায় অপ্রাসঙ্গিক বলে গণ্য হবে।
- ধারা ২৫ — কোনো অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশ অফিসারের কাছে যে স্বীকারোক্তি দেন, তা তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ, সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার যা “স্বীকারোক্তি” বলে জানিয়েছেন, তার বিবরণমূলক অংশ নিজে থেকেই আদালতে সাক্ষ্য হিসেবে অচল।
- ধারা ২৬ — আসামি পুলিশ হেফাজতে থাকাকালে যদি স্বীকারোক্তি দেন, তা-ও অপ্রাসঙ্গিক—যদি না তা একজন ম্যাজিস্ট্রেটের সরাসরি উপস্থিতিতে গ্রহণ করা হয়।
- ধারা ২৭ — এখানেই একমাত্র ব্যতিক্রম। পুলিশ হেফাজতে থাকা অভিযুক্তের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে যদি কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা আলামত (“fact”) আবিষ্কৃত/উদ্ধার হয়, তাহলে সেই তথ্যের শুধু ততটুকু অংশ সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে যতটা সরাসরি সেই আবিষ্কারের সঙ্গে সম্পর্কিত। পুরো বিবৃতি নয়, কেবল আলামত-সংশ্লিষ্ট অংশটুকু।
এই কাঠামোর মূল উদ্দেশ্য ঐতিহাসিকভাবেই হেফাজতে থাকা অসহায় আসামিকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায় ও পুলিশি বাড়াবাড়ি থেকে সুরক্ষা দেওয়া।
এই মামলায় ২৭ ধারার প্রয়োগযোগ্য অংশ কতটুকু?
সংবাদ সম্মেলনে যেসব বিষয় “আলামত” হিসেবে উদ্ধারের কথা বলা হয়েছে—খেজুরের বিচি, অর্ধেক কামড়ানো শসা, আগুনে পোড়ানো সোনার চুড়ি/অলংকার- এগুলো ধারা ২৭-এর অধীনে সম্ভাব্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ হতে পারে, যদি তদন্তকারী প্রমাণ করতে পারেন যে এসব বস্তুর অবস্থান সম্পর্কে তথ্য সিদ্ধার্থ/মুগ্ধের কাছ থেকেই প্রথম পাওয়া গেছে এবং তার ভিত্তিতেই উদ্ধার হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার জন্য খেজুরের বিচি পাঠানো হয়েছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে এসেছে। কিন্ত প্রশ্ন থেকে যায়
কিন্তু হত্যার ক্রম, উদ্দেশ্য (“পরিচয় ফাঁসের আশঙ্কা”), কে প্রথমে কাকে মারল, গামছা দিয়ে গলা পেঁচানোর বিবরণ—এই আখ্যানমূলক অংশগুলো ধারা ২৭-এর “আবিষ্কারযোগ্য বস্তু (fact discovered)”-র আওতায় পড়ে না। এগুলো নিছক পুলিশ হেফাজতে দেওয়া বিবৃতি, যা ধারা ২৫ ও ২৬ অনুযায়ী আসামিদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণযোগ্য নয়।
ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দির বাস্তবতা
২৩ আগস্ট বিকেলে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানা যায়, এটিই একমাত্র আইনসিদ্ধভাবে গ্রহণযোগ্য পর্যায়। তবে এই জবানবন্দিরও কিছু শর্ত পূরণ হতে হয়:
তা স্বেচ্ছায় ও ভয়ভীতিমুক্তভাবে প্রদত্ত হতে হবে (ধারা ২৪); এবং ম্যাজিস্ট্রেট আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে নিশ্চিত হবেন যে তিনি পুলিশি প্ররোচনা/নির্যাতনের শিকার হননি এবং জবানবন্দি প্রত্যাহারের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া আসামিকে জানাতে হবে যে তার স্বীকারোক্তি তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যাবে।
গ্রেপ্তারের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদ সম্মেলন ও একই দিনে আদালতে জবানবন্দি—এই দ্রুততা আইনগতভাবে অসম্ভব নয়, তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীর মাধ্যমে ভবিষ্যতে “চাপের মুখে দেওয়া স্বীকারোক্তি” যুক্তি উত্থাপনের সুযোগ তৈরি করে রাখে।
ডোমের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ‘গোপন’ তথ্য
ঘটনাস্থল-সংশ্লিষ্ট একজন ডোমের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মা ও মেয়ে—উভয়ের ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা যৌন নির্যাতনের ইঙ্গিত বহন করতে পারে। এই দাবি একজন সূত্রের বক্তব্য মাত্র—এখনো কোনো সরকারি বা চিকিৎসা প্রতিবেদনে এর নিশ্চয়তা মেলেনি, ফলে একে যাচাই-নিরপেক্ষভাবেই গ্রহণ করা প্রয়োজন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশের সরকারি ভাষ্যে এই সংক্রান্ত কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি জবাব না দিয়ে ঘটনাটিকে “স্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড” বলে উল্লেখ করে প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান।
পুলিশের বয়ান আর বাস্তবতার পার্থক্য
পূর্বে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনারের নিজে আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিস্তারিত বিবরণ দেওয়ার বিষয়টি একাধিক গণমাধ্যমে বড় করে প্রতিবেদিত হয়েছে। সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে এটি “মানবিক” উপাদান হলেও, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এখানে কিছু বিষয় অস্পষ্টতার ঝুঁকি থাকে।
বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে হত্যার কারন হিসেবে ইয়াবা সেবনে বাধা দেয়াকে দেখানো হচ্ছে তা মূলত পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য, একে আসামীর দেয়া আদালতে দেয়া পূর্ন জবানবন্দি হিসেবে দেখা যাবে না।
এছাড়া পুলিশি ভাষ্যমতে খুনি হত্যাকান্ড ঘটানোর পর শসা, খেজুর খেয়ে, বাথরুমে গিয়ে গোসল করে। কিন্ত অপরাধবিজ্ঞান বলে কোন অপেশাদার তরুন যখন প্রথমবার আকস্মিকভাবে কোন ভয়াবহ হত্যা কান্ড ঘটায় তাইলে তাদের পক্ষে লাশের পাশে স্বাভবিক থেকে খাওয়া দাওয়া অসম্ভব। কারন সে সময় তার স্নায়ুর উপর বিপুল চাপ তৈরী হয়। এছাড়া কারেন্টের তার কেটে দেয়া, কোন সাড়া শব্দ না হওয়া, ঘটনাকে আরো অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়।
নিহতের স্বজনদের সংশয়, দুই তরুণের শারীরিক সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন, কারণ হিসেবে “মাদক সেবনে বাধা” তত্ত্বে অবিশ্বাস, এগুলো নিজে থেকে আইনি প্রমাণ নয়, তবে তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন।
নিহতের স্বজনদের সংশয়, দুই তরুণের শারীরিক সামর্থ্য নিয়ে। “মাদক সেবনে বাধা” গল্পের প্রতি অবিশ্বাস, ডোমের বরাতে আসা অস্বস্তিকর তথ্য, চিকিৎসকের এড়িয়ে যাওয়া জবাব, এই বিষয়গুলো এককভাবে চূড়ান্ত আইনি প্রমাণ নয়, তবে এগুলো তদন্তের স্বচ্ছতা যাচাইয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন। একটি পরিবারের চারজন সদস্যের প্রাণহানির মতো গুরুতর ঘটনায় জনগণের আস্থা তৈরি করতে হলে তদন্তকারী সংস্থার উচিত, দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতাকে প্রাধান্য দেওয়া, ফরেনসিক প্রমাণ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তমূলক বয়ান না দেওয়া, এবং পরিবারের ও গণমাধ্যমের প্রশ্নগুলোর স্বচ্ছ জবাব দেওয়া। তা না হলে ন্যায়বিচারের পথ আরও জটিল ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।

