বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ব্যবসার গল্পই বেশি শোনা যায়। বড় শিল্প, বড় বিনিয়োগ, বড় ঋণ অর্থনীতির আলোচনায় এগুলোই সামনে থাকে। অথচ দেশের অসংখ্য ছোট দোকান, কারখানা, ওয়ার্কশপ, পরিবহন ব্যবসা, অনলাইন উদ্যোগ, নারী উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠান কিংবা পারিবারিক ব্যবসা মিলেই তৈরি হয়েছে এমন একটি খাত, যার অবদান মোট দেশজ উৎপাদনে প্রায় এক-চতুর্থাংশ। প্রশ্ন হলো, অর্থনীতিতে এত বড় ভূমিকা রাখা এই খাতকে আমরা অর্থায়ন ও নীতিসহায়তায় কতটা গুরুত্ব দিচ্ছি? সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন হিসাবেও এমএসএমই খাতের জিডিপি অবদান প্রায় ২৫ শতাংশের কথা উঠে এসেছে; আর ২০২৬ সালের সরকারি আলোচনায় এ অবদান ২৭–৩০ শতাংশের কাছাকাছি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতিতে বড়, ব্যাংকের খাতায় কতটা বড়?
এখানেই আসল বৈপরীত্য। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট ব্যাংকঋণের মধ্যে সিএমএসএমই খাতের ঋণের অংশ ছিল ১৮.৪ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনীতিতে প্রায় এক-চতুর্থাংশ অবদান রাখার দাবি থাকা একটি খাত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মোট ঋণের এক-পঞ্চমাংশেরও কম পাচ্ছে।
বিষয়টি শুধু শতাংশের হিসাব নয়। একটি বড় প্রতিষ্ঠানের ঋণ দিতে ব্যাংকের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, হিসাব-নিকাশ ও ঝুঁকি মূল্যায়ন তুলনামূলকভাবে সহজ। কিন্তু ছোট উদ্যোক্তার ক্ষেত্রে সমস্যা শুরু হয় অন্য জায়গায়। অনেকের পর্যাপ্ত জামানত নেই, ব্যবসার হিসাব নিয়মিত নয়, নগদ লেনদেন বেশি, আনুষ্ঠানিক আর্থিক বিবরণী দুর্বল এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ আয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যও ব্যাংকের হাতে থাকে না। ফলে উদ্যোক্তা যখন ব্যাংকের দরজায় যান, তখন ব্যাংক শুধু ব্যবসার সম্ভাবনা দেখে না; দেখে ঝুঁকি কমানোর নিশ্চয়তাও। এ কারণেই অর্থায়নের প্রশ্নটি এমএসএমই খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গাগুলোর একটি হয়ে আছে। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশবিষয়ক একটি প্রকল্প নথিতেও অর্থায়নের সুযোগকে এমএসএমই প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
শুধু ঋণের অভাব নয়, আছে ‘ব্যাংকযোগ্য’ হওয়ার সংকট
এখানে আরেকটি বিষয় বুঝতে হবে। এমএসএমই উদ্যোক্তাকে শুধু কম সুদে ঋণ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ব্যাংক যদি একজন উদ্যোক্তার ব্যবসার আয়-ব্যয় ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য না পায়, তাহলে কম সুদের ঋণ থাকলেও সেই অর্থ উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণেই বাংলাদেশে ছোট ব্যবসার জন্য ঋণ নিশ্চয়তা, পুনঃঅর্থায়ন, ক্রেডিট গ্যারান্টি ও ডিজিটাল আর্থিক তথ্যভিত্তিক ঋণ মূল্যায়নের মতো ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। IFC-এর হিসাবে, বাংলাদেশে এমএসএমই খাতে অর্থায়ন ঘাটতি প্রায় ২.৮ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে প্রায় ১ কোটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। অর্থাৎ সমস্যার ব্যাপ্তি যে ছোট নয়, সেটি সংখ্যাতেই বোঝা যায়।
এই ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকও একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে ২৫ হাজার কোটি টাকার সিএমএসএমই প্রি-ফাইন্যান্সিং স্কিমের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরপর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৮ হাজার কোটি টাকার একটি নতুন পুনঃঅর্থায়ন স্কিম চালু করে। জুনে আবার ৫ হাজার কোটি টাকার একটি ঘূর্ণায়মান পুনঃঅর্থায়ন তহবিল চালু করা হয়, যেখানে ব্যাংকগুলো সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদ বা মুনাফায় উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ পায়।
তাহলে প্রশ্নটা স্বাভাবিক, এতগুলো উদ্যোগের পরও যদি ছোট ব্যবসার ঋণ মোট ব্যাংকঋণের ২০ শতাংশের কাছাকাছি থাকে, তাহলে সমস্যা কোথায়? উত্তরটি সম্ভবত শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিতে নেই। ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা, উদ্যোক্তার কাগজপত্র, জামানতের শর্ত, ঋণ প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবার সীমাবদ্ধতা সবগুলো একসঙ্গে কাজ করছে। অর্থাৎ সরকার তহবিল তৈরি করলেই অর্থায়নের দরজা খুলে যায় না; দরজার সামনে থাকা বাধাগুলোও সরাতে হয়।
চাকরি তৈরির সবচেয়ে বড় জায়গাটা কি এখানেই?
এমএসএমই খাতের গুরুত্ব বোঝার আরেকটি পথ হলো কর্মসংস্থান। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২৫ সালের বাংলাদেশভিত্তিক তথ্যভান্ডারেও এমএসএমই খাতকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে; ২০২৪ সালের অর্থনৈতিক শুমারির তথ্যও সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এখানে বড় সম্ভাবনাটি হলো একটি বড় শিল্প কারখানা একবারে অনেক বিনিয়োগ করতে পারে, কিন্তু হাজার হাজার ছোট ব্যবসা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকায় তারা স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একটি ছোট পোশাক কারখানা, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, মেরামতকেন্দ্র, ডিজিটাল সেবা প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় সরবরাহকারী হয়তো একা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় সংখ্যা তৈরি করে না। কিন্তু এমন হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান মিলেই কর্মসংস্থানের একটি বিশাল ভিত্তি তৈরি হয়। বিশ্বব্যাপীও এমএসএমইকে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
আর এখানেই এমএসএমই খাতকে শুধু ‘ছোট ব্যবসা’ হিসেবে দেখার সমস্যা। একটি ব্যবসা যখন ঋণ পায়, তখন শুধু একজন উদ্যোক্তা অর্থ পান না; তিনি নতুন কর্মী নিতে পারেন, উৎপাদন বাড়াতে পারেন, নতুন যন্ত্র কিনতে পারেন, সরবরাহকারীর কাছ থেকে বেশি পণ্য নিতে পারেন। অর্থাৎ একটি ঋণের প্রভাব ব্যবসার সীমানা ছাড়িয়ে স্থানীয় অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিপরীতে, অর্থায়ন না পেলে একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসা ছোটই থেকে যায়। উদ্যোক্তা নতুন কর্মী নিয়োগ করতে পারেন না, প্রযুক্তি আনতে পারেন না, বড় বাজারে ঢুকতে পারেন না। ফলে অর্থায়নের ঘাটতি শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের ঘাটতিতেও পরিণত হয়।
তাহলে সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা কোথায় আটকে?
বাংলাদেশে সমস্যা যে সরকার বুঝতে পারছে না, তা বলা যাবে না। পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা, ঋণ নিশ্চয়তা, প্রি-ফাইন্যান্সিং এবং এসএমই ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও ব্যবসায়িক সহায়তা এসব উদ্যোগের উপস্থিতিই তার প্রমাণ। এসএমই ফাউন্ডেশন বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসায়িক সেবা, নারী উদ্যোক্তা ডিরেক্টরি, পণ্য ডিরেক্টরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
কিন্তু নীতির সংখ্যা আর বাস্তব ফলাফল এক বিষয় নয়। একজন উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো তিনি প্রয়োজনের সময় কত দ্রুত ঋণ পাবেন, কী শর্তে পাবেন এবং সেই ঋণের জন্য কতটা কাগজপত্র ও জামানত দিতে হবে। একটি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের তহবিল ৫ হাজার কোটি বা ২৫ হাজার কোটি টাকা হলেই সেটি সফল হয়ে যায় না। কতজন নতুন উদ্যোক্তা ঋণ পেলেন, কতজন নারী উদ্যোক্তা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঢুকলেন, কতটি ব্যবসা ঋণ নিয়ে বড় হলো, কতটি নতুন চাকরি তৈরি হলো সাফল্যের হিসাব সেখানে। এখানেই নীতির ঘোষণার সঙ্গে বাস্তব বাস্তবায়নের পার্থক্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়।
ছোট ব্যবসা বড় হতে না পারলে বড় অর্থনীতিও আটকে যাবে
আরেকটি বড় সমস্যা হলো উৎপাদনশীলতা। অর্থায়ন পেলেও অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল হিসাবরক্ষণ, বাজারসংযোগ কিংবা রপ্তানি মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকে। ফলে তারা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু বড় হতে পারে না। একটি ব্যবসা পাঁচজনকে নিয়ে বছরের পর বছর একই জায়গায় থাকলে সেটি কর্মসংস্থানের একটি ছোট উৎস; কিন্তু সেই ব্যবসা যদি ৫০ বা ১০০ কর্মীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারে, তখন তার অর্থনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বাড়ে।
তাই এমএসএমই নীতির লক্ষ্য শুধু ‘আরও ঋণ’ হওয়া উচিত নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত আরও উৎপাদনশীল ব্যবসা, আরও বড় ব্যবসা এবং আরও বেশি কর্মসংস্থান। এ জন্য ঋণের পাশাপাশি প্রযুক্তি, দক্ষতা, হিসাবরক্ষণ, কর ও লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজ করা, বাজারসংযোগ এবং রপ্তানির সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। বিশ্বব্যাংক ও আইএফসি দুই প্রতিষ্ঠানই ছোট ব্যবসার জন্য অর্থায়নের পাশাপাশি উপযোগী সহায়তা ও কার্যকর নীতিগত পরিবেশের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়।
‘অবহেলিত সন্তান’ শব্দটি কি তাহলে পুরোপুরি ঠিক?
সম্ভবত পুরোপুরি নয়। কারণ এমএসএমই খাতকে ঘিরে সরকারি উদ্যোগ একেবারে কম নেই। বরং বাংলাদেশের সমস্যা এখন অনেকটা অন্য জায়গায়, যে খাতকে অর্থনীতির মেরুদণ্ড বলা হচ্ছে, তাকে সেই গুরুত্ব অনুযায়ী একটি কার্যকর ব্যবসায়িক পরিবেশ দিতে পারছি কি না।
এখানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হতে পারে ব্যাংকিং ব্যবস্থায়। ছোট উদ্যোক্তার জন্য একই ঋণপদ্ধতি ব্যবহার করে বড় করপোরেটের মতো ঝুঁকি মূল্যায়ন করলে চলবে না। ব্যবসার নগদ প্রবাহ, ডিজিটাল লেনদেন, বিক্রির ইতিহাস, কর তথ্য ও অন্যান্য বিকল্প তথ্য ব্যবহার করে ঋণ মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ঋণ নিশ্চয়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হবে, যাতে শুধু জামানত না থাকার কারণে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা বাদ না পড়েন। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ও চলমান পুনঃঅর্থায়ন উদ্যোগগুলোকে এই ধরনের বাস্তব পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করাই হবে বড় পরীক্ষা।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুব সহজ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যদি লাখ লাখ ছোট ব্যবসা কাজ করে, কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং স্থানীয় বাজার সচল রাখে, তাহলে তাদের ছোট রেখেই কি আমরা বড় অর্থনীতির স্বপ্ন দেখতে পারি? এমএসএমইকে শুধু ‘সহায়তা প্রয়োজন এমন একটি খাত’ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সক্রিয় অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। কারণ বড় শিল্পের কয়েকটি প্রকল্প হয়তো দ্রুত শিরোনাম তৈরি করে, কিন্তু দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ছড়িয়ে থাকা ছোট ব্যবসাগুলোই প্রতিদিন অর্থনীতির চাকা ঘোরায়। সেই চাকায় যদি অর্থের অভাব, নীতির জটিলতা ও ব্যাংকিংয়ের অনাস্থা লাগাম হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সমস্যা শুধু উদ্যোক্তার নয়, শেষ পর্যন্ত পুরো অর্থনীতির।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

