বিশেষ বিশ্লেষন
জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, শেয়ার বা অন্য কোনো মূলধনি সম্পদ বিক্রি করে হাতে বড় অঙ্কের টাকা এলেই পুরো অর্থকে আয় ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবার বিক্রির সময় উৎসে কর দেওয়া হয়েছে বলেই বিষয়টি শেষ, এমন ধারণাও ভুল হতে পারে। আয়কর আইনের মূল প্রশ্নটি একটু ভিন্ন: সম্পদটি কত দামে অর্জন করা হয়েছিল, বিক্রির সময় প্রকৃত মূল্য কত ছিল এবং সেই ব্যবধান থেকে কতটা মূলধনি লাভ তৈরি হয়েছে?
ধরুন, আপনি ২০ বছর আগে ২০ লাখ টাকায় একটি জমি কিনেছিলেন। এখন সেটি ১ কোটি টাকায় বিক্রি করলেন। আপনার হাতে এসেছে ১ কোটি টাকা। কিন্তু করের হিসাবের ভাষায় ১ কোটি টাকা পুরোটা আপনার আয় নয়। আইন অনুযায়ী মূলধনি লাভ সাধারণভাবে সম্পদের বিক্রয় বা হস্তান্তরমূল্য এবং তার অর্জনমূল্যের পার্থক্য থেকে নির্ধারিত হয়। ফলে সরল হিসাবে ২০ লাখ টাকা অর্জনমূল্য হলে লাভ দাঁড়ায় ৮০ লাখ টাকা। তবে বাস্তব হিসাব আরও নির্ভর করবে অর্জনমূল্যের সঙ্গে আইনসম্মতভাবে যুক্ত ব্যয়, বিক্রয়মূল্য এবং সম্পদের ন্যায্য বাজারমূল্যের মতো বিষয়গুলোর ওপর। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ৫৭ ও ৫৮ ধারায় মূলধনি লাভের এই কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
আসল হিসাবটা শুরু হয় ক্রয়মূল্য থেকে
এখানে একটি বিষয় খুব সহজভাবে বোঝা দরকার। কোনো সম্পদ বিক্রি থেকে পাওয়া টাকা আর সেই সম্পদ থেকে অর্জিত লাভ দুটি এক জিনিস নয়। আয়কর আইনের ৫৮ ধারা অনুযায়ী মূলধনি লাভ নির্ধারণে সম্পদের ওপেন মার্কেট বিক্রয় বা হস্তান্তরমূল্য থেকে অর্জনমূল্য বাদ দেওয়ার কাঠামো রয়েছে। আর অর্জনমূল্যের মধ্যে শুধু সম্পদ কেনার দামই নয়, নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মালিকানা হস্তান্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ব্যয় এবং সম্পদের উন্নয়ন ব্যয়ের মতো উপাদানও থাকতে পারে। অর্থাৎ ১৫ লাখ টাকায় জমি কিনে পরে সেটির উন্নয়ন ও হস্তান্তরের সঙ্গে আইনসম্মতভাবে যুক্ত আরও কিছু ব্যয় করলে শুধু দলিলে লেখা ১৫ লাখ টাকা দিয়েই সব সময় প্রকৃত অর্জনমূল্য শেষ হয়ে যায় না।
এ কারণেই সম্পদ কেনার সময় থেকেই নথি রাখা গুরুত্বপূর্ণ। পুরোনো দলিল, ক্রয়মূল্য, উন্নয়ন ব্যয়, মালিকানা হস্তান্তরের ব্যয় এসবের প্রমাণ পরে সম্পদ বিক্রির সময় করের হিসাবকে অনেক বেশি পরিষ্কার করে। বিষয়টি অনেকটা ব্যবসার হিসাবের মতো। একজন ব্যবসায়ী যেমন বিক্রির মোট টাকা আর প্রকৃত মুনাফাকে এক করে দেখেন না, তেমনি ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রেও বিক্রয়মূল্য আর মূলধনি লাভকে আলাদা করে দেখতে হবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে। আইনে ওপেন মার্কেট বিক্রয় বা হস্তান্তরমূল্য নির্ধারণে প্রাপ্ত বা প্রাপ্য অর্থ এবং হস্তান্তরের তারিখের ন্যায্য বাজারমূল্যের মধ্যে যেটি বেশি, সেটিকে বিবেচনার বিধান রয়েছে। এমনকি ঘোষিত মূল্য এবং ন্যায্য বাজারমূল্যের মধ্যে নির্দিষ্ট সীমার বেশি পার্থক্য থাকলে কর কর্তৃপক্ষের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতাও আছে। তাই দলিলে কম মূল্য দেখিয়ে বাস্তবে বেশি দামে সম্পদ বিক্রি করলে সেটি শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যক্তিগত সমঝোতার বিষয় হিসেবে থেকে যায় না; করের হিসাবেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
পাঁচ বছর পার হলেই হিসাব বদলে যায়
ব্যক্তি করদাতার জন্য সম্পদ কত দিন ধরে মালিকানায় ছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান কর কাঠামোয় কোম্পানি ছাড়া অন্য করদাতার ক্ষেত্রে সাধারণ মূলধনি সম্পদ পাঁচ বছরের মধ্যে হস্তান্তর করলে মূলধনি লাভ করদাতার মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রযোজ্য স্বাভাবিক করহারে করযোগ্য হয়। আর সম্পদ অর্জনের পাঁচ বছর অতিক্রম করার পর হস্তান্তর হলে মূলধনি লাভের ওপর ১৫ শতাংশ হারে করের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ একই পরিমাণ লাভ হলেও সম্পদটি কখন কেনা হয়েছিল, সেই তথ্য করের অঙ্ক বদলে দিতে পারে।
এখানে একটি সহজ উদাহরণ নেওয়া যাক। একজন ব্যক্তি ৫০ লাখ টাকা লাভ করলেন। যদি প্রযোজ্য নিয়মে সম্পদটি পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে তাঁর মালিকানায় থাকার পর বিক্রি হয়ে থাকে, তাহলে মূলধনি লাভের ওপর ১৫ শতাংশ হারে করের হিসাব হবে অর্থাৎ সরল হিসাবে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু পাঁচ বছরের মধ্যে বিক্রির ক্ষেত্রে একই ৫০ লাখ টাকা স্বাভাবিক মোট আয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রযোজ্য স্ল্যাব অনুযায়ী করের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সম্পদ বিক্রির আগে শুধু ‘কত দামে বিক্রি করব’ ভাবলেই হবে না; ‘কবে কিনেছিলাম’ প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সব সম্পদ এবং সব করদাতার ক্ষেত্রে একই নিয়ম ধরে নেওয়া যাবে না। তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজ, কোম্পানির সম্পদ এবং বিশেষ ধরনের সম্পদের জন্য আলাদা বিধান থাকতে পারে। তাই ‘মূলধনি লাভ মানেই ১৫ শতাংশ’ এমন সরলীকরণও ঠিক নয়। করদাতার ধরন, সম্পদের ধরন এবং প্রযোজ্য বিশেষ বিধান দেখে কর নির্ধারণ করতে হয়।
জমি-ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে কোথায় ঝুঁকি বেশি
বাংলাদেশে মূলধনি সম্পদ বিক্রির সবচেয়ে আলোচিত ক্ষেত্রগুলোর একটি জমি ও ভবন। এখানে সমস্যা শুধু দাম বাড়ার নয়; দলিলের মূল্য, প্রকৃত লেনদেনমূল্য এবং ন্যায্য বাজারমূল্য; তিনটি বিষয় একসঙ্গে সামনে আসে। আইন অনুযায়ী ঘোষিত হস্তান্তরমূল্যের তুলনায় ন্যায্য বাজারমূল্য নির্দিষ্ট সীমার বেশি হলে কর কর্তৃপক্ষ মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যেতে পারে। ফলে কাগজে-কলমে একটি মূল্য দেখিয়ে বাস্তবে অন্য অঙ্কের লেনদেন করার প্রবণতা ভবিষ্যতে কর-সংক্রান্ত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
ডেভেলপারের সঙ্গে জমি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও একই কারণে হিসাব আরও গুরুত্বপূর্ণ। একজন জমির মালিক নগদ অর্থের পাশাপাশি ফ্ল্যাট পেলে শুধু হাতে পাওয়া নগদকে বিক্রয়মূল্য ধরে নিলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। জমির বিনিময়ে পাওয়া সম্পদের মূল্যও সংশ্লিষ্ট হিসাবের অংশ হতে পারে। এ ধরনের লেনদেনে চুক্তিপত্র, প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের মূল্য এবং জমির অর্জনমূল্য সবকিছু মিলিয়ে হিসাব করা দরকার। আইনেও ডেভেলপার থেকে পাওয়া অর্থ ও ফ্ল্যাটের মূল্য বিবেচনার বিশেষ বিধান রয়েছে।
উৎসে কর দিলেই কি হিসাব শেষ?
এই জায়গাতেই অনেক করদাতা ভুল করেন। সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় উৎসে কর বা অন্য কোনো কর পরিশোধ করা হয়েছে মানেই সম্পদ বিক্রির পুরো কর-দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয়ে গেছে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। কারণ উৎসে কর সংগ্রহ এবং মূলধনি লাভের ওপর চূড়ান্ত কর নির্ধারণ একই বিষয় নয়। প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী উৎসে পরিশোধিত করের ক্রেডিট বা সমন্বয়ের সুযোগ থাকলে সেটি রিটার্নে যথাযথভাবে দেখাতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রিটার্নে সম্পদ বিক্রির তথ্যের সামঞ্জস্য। ধরুন, আপনি জমি বিক্রি করে ব্যাংকে ১ কোটি টাকা পেলেন। পরের বছর সেই টাকা দিয়ে একটি ফ্ল্যাট কিনলেন। কিন্তু আগের রিটার্নে জমি বিক্রির তথ্য নেই। তখন নতুন সম্পদ কেনার অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিপরীতে জমি বিক্রি, অর্জিত মূলধনি লাভ এবং সংশ্লিষ্ট করের তথ্য রিটার্নে সঠিকভাবে থাকলে অর্থের গতিপথ অনেক বেশি স্বচ্ছ থাকে।
করের হিসাবের চেয়ে বড় বিষয় নথির হিসাব
আমার দৃষ্টিতে, সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, কর পরিকল্পনা বিক্রির দিন থেকে শুরু হয় না; শুরু হয় সম্পদ কেনার দিন থেকেই। আপনি যদি ১৫ বছর আগে একটি জমি কিনে থাকেন, তখনকার দলিল, ক্রয়মূল্য এবং সংশ্লিষ্ট বৈধ ব্যয়ের নথি আজকের কর হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে। পুরোনো নথি হারিয়ে গেলে পরে প্রকৃত অর্জনমূল্য প্রমাণ করাই কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এখানে করদাতার জন্য একটি বাস্তবসম্মত নিয়ম হতে পারে: সম্পদ কেনার সময় নথি সংরক্ষণ, ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের রেকর্ড রাখা এবং বিক্রির সময় প্রকৃত মূল্য ও করের হিসাব আলাদা করে করা। এতে কর কমানোর কোনো কৃত্রিম চেষ্টা থাকে না; বরং আইন যে হিসাব চায়, সেটিই পরিষ্কারভাবে উপস্থাপন করা হয়। একই সঙ্গে কর কর্তৃপক্ষের জন্যও লেনদেন যাচাই করা সহজ হয়।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি খুব সাধারণ। আপনি ১ কোটি টাকায় একটি জমি বিক্রি করেছেন, এটি একটি লেনদেন। কিন্তু সেই জমি থেকে আপনার প্রকৃত মূলধনি লাভ কত হয়েছে এটি করের জন্য আলাদা প্রশ্ন। এই দুই সংখ্যাকে এক করে ফেললেই ভুলের শুরু। আবার শুধু উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়েছে বলে রিটার্নে মূলধনি আয়ের হিসাব বাদ দেওয়াও নিরাপদ নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ মূলধনি লাভকে আলাদা কাঠামোয় দেখে; তাই সম্পদ বিক্রির সময় সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো অর্জনমূল্য, প্রকৃত হস্তান্তরমূল্য, ন্যায্য বাজারমূল্য, মালিকানার সময়কাল এবং আগে পরিশোধিত কর সবকিছুর হিসাব মিলিয়ে তারপর রিটার্নে তা দেখানো। সম্পদ বিক্রি করে হাতে কত টাকা এল, সেটি প্রথম প্রশ্ন নয়; সেই সম্পদ থেকে আপনার প্রকৃত লাভ কত হলো; কর আইনের দৃষ্টিতে আসল প্রশ্ন সেটিই।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

