বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমার ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দাম প্রতি লিটারে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী এবং সাধারণ মানুষের ওপর বড় ধরনের অন্যায় হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
তাদের মতামত ও সাম্প্রতিক সামাজিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারের এমন সিদ্ধান্তের মারাত্মক সমন্বয়হীনতা রয়েছে। নীতি নির্ধারকেরা বিশ্ববাজারের সঠিক চিত্র বিবেচনা না করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে তারা মনে করছেন। ফলে ইতিমধ্যে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা সাধারণ জনগণ এবং সীমিত আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নতুন এক মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, একজন সাধারণ নাগরিক সরাসরি লিটার মেপে জ্বালানি তেল ক্রয় না করলেও পরোক্ষভাবে এই বর্ধিত মূল্যের শতভাগ আর্থিক দায়ভার তাকেই বহন করতে হয়।
ডিজেল ও তেলের দাম বাড়ার সাথে সাথেই পণ্য পরিবহন, কৃষি সেচ, শিল্প উৎপাদন এবং সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার পরিচালন ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষকের সেচ ও উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় চাল, ডাল, সবজি ও মাছ-মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি দ্রব্যের বাজারে নতুন করে আগুনের আঁচ লাগে।
বাজার তদারকি সংস্থার নজরদারির অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরাও এই সুযোগে সিন্ডিকেট তৈরি করে পণ্যের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেয়, যার পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে সীমিত আয়ের চাকরিজীবী ও শ্রমজীবী মানুষের পকেটে।
এই মূল্যবৃদ্ধির নেপথ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) আর্থিক ক্ষতি কমানোর অজুহাত তুলে ধরা হলেও বাজার বিশ্লেষকেরা একে নীতিগত দুর্বলতা হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশে তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় করে দাম বাড়ানো হলেও বিশ্ববাজারে দাম কমানোর সুফল দেশের ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছানোর তেমন কোনো নজির নেই।
সরকারের উচিত ছিল বিপিসি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, অপচয় ও অনিয়ম বন্ধ করে আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু তা না করে আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত পূরণে গিয়ে সরাসরি জনগণের আয়ের ওপর এক ধরনের পরোক্ষ আঘাত হানা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
দেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি আট শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যার কারণে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়া দূরের কথা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। কাজের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সংকটে উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মানুষের সঞ্চয় এখন শূন্যের কোঠায়।
এমন পরিস্থিতিতে তেলের দাম এক ধাক্কায় ২০ টাকা বাড়ানোয় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর যাপিত জীবন চরম বিষিয়ে উঠেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া এই মানুষগুলো ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় নতুন করে আর ধারের সুযোগও পাচ্ছে না। অর্থনৈতিক নীতি যদি গণমানুষের আয়ের বাস্তব সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তবে এই নীতি দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে পুরোপুরি অচল করে দিতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন।
তাদের মতে, একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। পরোক্ষ কর এবং দফায় দফায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কোনো টেকসই অর্থনৈতিক সমাধান সম্ভব নয়, বরং সাধারণ মানুষের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে তা সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর আরও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তাই বাজারের ওপর থেকে অসাধু সিন্ডিকেটের প্রভাব দূর করা এবং সীমিত আয়ের মানুষদের সুরক্ষায় সমন্বিত নীতি গ্রহণ করাই এখন সময়ের দাবি।

