সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো স্বস্তির বার্তা নিয়ে এলেও এর আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একদিকে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা সরকারি কর্মীদের আয় বাড়ছে। অন্যদিকে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক কর্মজীবী মানুষ এখনো আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য করতে পারছেন না। ফলে নতুন পে-স্কেল শুধু বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নয়; এটি আয়বৈষম্য, মূল্যস্ফীতি, সরকারি ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি অর্থনৈতিক বিষয় হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বড় চাপগুলোর একটি হলো মূল্যস্ফীতি। বাজারে খাদ্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে দেশের বড় অংশের মানুষের আয় বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২২ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে একজন শ্রমজীবী মানুষের আয় যতটা বেড়েছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে তার চেয়েও বেশি।
এর অর্থ দাঁড়ায়, নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। একজন কর্মী আগের চেয়ে কিছুটা বেশি টাকা পেলেও সেই টাকা দিয়ে আগের পরিমাণ পণ্য ও সেবা কেনা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও তীব্র। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও যাতায়াতের মতো অপরিহার্য খাতে ব্যয় হয়ে যায়। এসব খাতে দাম বাড়লে সঞ্চয় বা অন্যান্য ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত থাকে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের ঘোষণা এসেছে। সরকারি কর্মীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির ক্ষতি বিবেচনায় নিলে বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা কঠিন। সর্বশেষ বড় ধরনের বেতন কাঠামো কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর এক দশকে মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক সময় মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরে থেকেছে। ফলে পুরোনো বেতন কাঠামোয় থাকা সরকারি কর্মীদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার যুক্তিও রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্র যখন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আয় সমন্বয় করছে, তখন একই মূল্যস্ফীতির ধাক্কায় থাকা অন্য শ্রেণির মানুষের জন্য কী ব্যবস্থা থাকছে?
নতুন পে-স্কেলের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো বেতন বৃদ্ধির মাত্রা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে সরকারি চাকরিতে সর্বনিম্ন মাসিক বেতন ছিল ১৩০ টাকা। সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন ছিল ২ হাজার টাকা। নতুন কাঠামো কার্যকর হলে সর্বনিম্ন মূল বেতন দাঁড়াবে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের মূল বেতন হবে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
অঙ্কের হিসাবে ১৯৭৩ সালের তুলনায় সর্বনিম্ন সরকারি বেতন বেড়েছে প্রায় ১৫৩ গুণ। সর্বোচ্চ বেতন বেড়েছে প্রায় ৭৮ গুণ। একই সময়ে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৬২ গুণ এবং মাথাপিছু আয় বেড়েছে ২৭ গুণ।
এই তুলনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে। রাষ্ট্রের কর্মচারীদের বেতন যে গতিতে বেড়েছে, দেশের গড় নাগরিকের আয় কি সেই গতিতে বেড়েছে? পরিসংখ্যান বলছে, ব্যবধান রয়েছে। অর্থাৎ সরকারি চাকরির বেতন কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আয় বৃদ্ধির চেয়ে দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হয়েছে।
অবশ্য শুধু এই তুলনা দিয়ে সরকারি কর্মীদের বেতন বৃদ্ধিকে অন্যায্য বলা যাবে না। সরকারি চাকরির দায়িত্ব, দক্ষতার প্রয়োজন, চাকরির কাঠামো, অবসরকালীন সুবিধা, নিয়োগের প্রতিযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই বেতন নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কিন্তু রাষ্ট্র যখন সীমিত সম্পদ থেকে একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায়, তখন সেই সিদ্ধান্তের সামগ্রিক সামাজিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হয়।
নতুন কাঠামোয় ১ম থেকে ১১তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন দ্বিগুণ করার কথা বলা হয়েছে। ১২তম গ্রেড থেকে নিচের দিকে বৃদ্ধির হার ১০০ শতাংশেরও বেশি। সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধির হার ২০তম গ্রেডে, ১৪২ শতাংশ।
শতাংশের হিসাবে নিচের গ্রেডের কর্মীরা বেশি সুবিধা পেয়েছেন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বুঝতে হলে টাকার অঙ্কও দেখতে হবে। উচ্চ গ্রেডের একজন কর্মকর্তার বেতন একবারে কয়েক দশ হাজার টাকা বাড়লেও নিম্ন গ্রেডের কর্মীর প্রকৃত মাসিক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ১২ থেকে ২০তম গ্রেডে মূল বেতন বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় ১২ হাজার থেকে ১৩ হাজার ৩০০ টাকার মধ্যে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয় রয়েছে। শতাংশের হিসাব অনেক সময় প্রকৃত সুবিধার চিত্র পুরোপুরি তুলে ধরে না। ১০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া কারও আয় ১০০ শতাংশ বাড়লে তা হয় ২০ হাজার টাকা। কিন্তু ৭৮ হাজার টাকা বেতন পাওয়া কারও আয় একই হারে বাড়লে বৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭৮ হাজার টাকা। ফলে নিম্ন বেতনভোগীদের জন্য শতাংশের বড় বৃদ্ধি থাকলেও টাকার প্রকৃত সুবিধায় উচ্চ বেতনভোগীদের সঙ্গে পার্থক্য থেকেই যায়।
আয়বৈষম্যের বিষয়টি বিবেচনায় নিলে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে আয়বৈষম্য দীর্ঘদিন ধরে বাড়ছে। ১৯৭৪ সালে দেশের গিনি সহগ ছিল শূন্য দশমিক ৩৬। ২০২২ সালে তা বেড়ে প্রায় শূন্য দশমিক ৫০ হয়েছে। অর্থাৎ আয়ের বণ্টন আগের তুলনায় বেশি অসম হয়েছে। দেশের মোট আয়ের বড় অংশ সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। বিশ্ব বৈষম্য প্রতিবেদন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট সম্পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে।
এই পরিস্থিতিতে সরকারি বেতন বৃদ্ধি আয়বৈষম্যকে সরাসরি কতটা বাড়াবে, সেটি নির্ভর করবে বেতন বৃদ্ধির অর্থ কীভাবে অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয় এবং একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের আয় ও সামাজিক সুরক্ষায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় তার ওপর। সরকারি কর্মীরা অতিরিক্ত আয় করলে তার একটি অংশ ভোগব্যয়ে যাবে। এতে বাজারে চাহিদা বাড়তে পারে। অর্থনীতিতে উৎপাদন সক্ষমতা সেই বাড়তি চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলে আবার মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অবশ্য বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতি বাড়বে—এমন সরল সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। সরকারি কর্মীদের আয় বৃদ্ধির একটি অংশ সঞ্চয়, ঋণ পরিশোধ কিংবা উৎপাদনশীল বিনিয়োগেও যেতে পারে। আবার অর্থনীতিতে উৎপাদন বাড়লে বাড়তি চাহিদার প্রভাবও সামলানো সম্ভব। তাই নতুন পে-স্কেলের মূল্যস্ফীতিগত প্রভাব নির্ভর করবে এর অর্থায়ন, বাস্তবায়নের গতি, সামগ্রিক সরকারি ব্যয় এবং অর্থনীতির উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ অবশ্য সরকারি কোষাগারের ওপর বাড়তি চাপ। নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই অর্থ কোনো শূন্যস্থান থেকে আসবে না। সরকারের রাজস্ব আয়, ঋণ, ব্যয় সংকোচন কিংবা অন্যান্য খাতের বরাদ্দ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমেই এই ব্যয় সামলাতে হবে।
এখানেই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে কঠিন হিসাবটি সামনে আসে। সরকারের কর আদায় কাঠামো এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। ব্যাংক খাতেও চাপ রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগে গতি সীমিত। একই সময়ে জ্বালানি ও অন্যান্য সরকারি ব্যয়ের চাপ রয়েছে। এমন বাস্তবতায় স্থায়ীভাবে বড় অঙ্কের বেতন ব্যয় যুক্ত হলে বাজেট ব্যবস্থাপনায় নতুন চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
সরকার যদি এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করে, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের দায় বাড়বে। আর যদি কর বাড়িয়ে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কোন শ্রেণির ওপর সেই করের চাপ পড়ছে? পরোক্ষ করের ওপর বেশি নির্ভরতা থাকলে নিম্নআয়ের মানুষও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবেন না। কারণ পণ্য ও সেবার ওপর কর শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ব্যয়ের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়।
আর যদি সরকারের ব্যয় সামলাতে ভর্তুকি কমানো হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি সংকুচিত হয় কিংবা উন্নয়ন ব্যয়ে কাটছাঁট করতে হয়, তাহলে তার প্রভাবও সাধারণ মানুষের ওপর পড়তে পারে। ফলে একটি গোষ্ঠীর আয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক বোঝা অন্য একটি গোষ্ঠী বহন করছে কি না, সেটিও দেখতে হবে।
এখানে সরকারি ও বেসরকারি খাতের আয়ের কাঠামোগত পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন নির্ধারণ হয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। সাধারণত কয়েক বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়। ফলে দীর্ঘ সময়ের মূল্যস্ফীতির ক্ষতি একবারে সমন্বয় করার সুযোগ থাকে।
বেসরকারি খাতে পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে বেতন বাড়ানোর বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের আয়, কর্মীর দক্ষতা, শ্রমবাজারের চাহিদা, মালিকের সিদ্ধান্ত এবং কর্মীর দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মীদের দর-কষাকষির সুযোগ আরও কম। ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়লেও অনেক মানুষের আয় একই হারে বাড়ে না।
এই পার্থক্য দীর্ঘমেয়াদে শ্রমবাজারে একটি দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। একদিকে রাষ্ট্রের কর্মীরা নিয়মিত কাঠামোগতভাবে বেতন সমন্বয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে বেসরকারি ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা বাজারের অনিশ্চয়তার ওপর নির্ভরশীল থাকছেন।
এমন ব্যবধান যদি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়, তাহলে শুধু আয়বৈষম্য নয়, কর্মসংস্থানের পছন্দের ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে। সরকারি চাকরির স্থায়িত্ব ও সুবিধা আগে থেকেই অনেক তরুণের কাছে আকর্ষণীয়। এর সঙ্গে যদি বেতন কাঠামোর সুবিধা আরও বাড়ে, তাহলে মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ সরকারি চাকরির দিকে আরও বেশি ঝুঁকতে পারেন। এতে বেসরকারি খাতের দক্ষ জনবল পাওয়ার ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে সরকারি কর্মীদের বেতন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার দিকটিও উপেক্ষা করা যাবে না। মূল্যস্ফীতির দীর্ঘমেয়াদি চাপের কারণে সরকারি কর্মীদের প্রকৃত জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। একটি দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তুলতে উপযুক্ত বেতন কাঠামো দরকার। অতিরিক্ত কম বেতনও দুর্নীতি, অনিয়ম ও কর্মীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রশ্নটি বেতন বাড়ানো হবে কি না—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কীভাবে বেতন বাড়ালে তা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই এবং সামাজিকভাবে ন্যায্য হবে।
এখানে নীতিনির্ধারকদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য তৈরি করা। সরকারি কর্মীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষার জন্যও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণও এই উদ্বেগকে গুরুত্ব দেয়। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশের নিম্নআয়ের মানুষের আয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। ফলে তাদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া এবং দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছে।
অর্থাৎ নতুন পে-স্কেল এমন এক সময়ে আসছে, যখন অর্থনীতির একটি বড় অংশের মানুষ নিজেদের আয় দিয়ে আগের জীবনযাত্রা ধরে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন। এই বাস্তবতায় সরকারি বেতন বৃদ্ধিকে কেবল সরকারি ব্যয়ের একটি হিসাব হিসেবে দেখলে সমস্যার পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু তার কর্মীদের বেতন নিশ্চিত করা নয়। জনগণের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের অংশ। একজন সরকারি কর্মীর বেতন বাড়ার পাশাপাশি একজন দিনমজুর, পোশাকশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী কিংবা নিম্নবেতনের বেসরকারি কর্মীর প্রকৃত আয়ও যেন মূল্যস্ফীতির কাছে পরাজিত না হয়—সেটিই হওয়া উচিত বৃহত্তর নীতিগত লক্ষ্য।
এ ক্ষেত্রে সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা আরও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে। নিম্নআয়ের পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা, নগদ সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ব্যয় কমানো এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করে সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ কমানোও জরুরি।
একই সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে উৎপাদনশীলতার সম্পর্ক তৈরি করা প্রয়োজন। শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বেতন বাড়ানো হলে সরকারি ব্যয় বাড়বে। কিন্তু কর্মদক্ষতা, সেবার মান, ডিজিটালাইজেশন ও জবাবদিহি বাড়লে সেই ব্যয়ের বিপরীতে রাষ্ট্রও বেশি সেবা পাবে। নতুন পে-স্কেলের সফলতা তাই শুধু সরকারি কর্মীদের হাতে অতিরিক্ত টাকা পৌঁছানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; জনগণ সেই বাড়তি ব্যয়ের বিনিময়ে কতটা উন্নত সরকারি সেবা পাচ্ছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আরেকটি বিষয় হলো বাস্তবায়নের সময়সূচি। একবারে বিপুল ব্যয় না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বেতন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা থাকলে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে কর্মীদের প্রকৃত প্রত্যাশাও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতি যদি একই সময়ে অব্যাহত থাকে, তাহলে বেতন সমন্বয়ের প্রকৃত সুফল কমে যেতে পারে।
সরকারের জন্য সবচেয়ে টেকসই সমাধান হতে পারে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত না করে কেবল ঋণ নিয়ে সরকারি ব্যয় বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। করব্যবস্থায় ন্যায্যতা, কর ফাঁকি কমানো, বড় করদাতাদের কাছ থেকে কার্যকরভাবে রাজস্ব আদায় এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। এতে নতুন পে-স্কেলের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা ও উন্নয়ন খাতেও প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সবশেষে প্রশ্নটি অর্থনীতির চেয়েও বড়—ন্যায্যতার। একজন সরকারি কর্মী দীর্ঘদিন ধরে মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত আয় হারালে তার বেতন সমন্বয় করা যৌক্তিক। কিন্তু একই মূল্যস্ফীতিতে একজন বেসরকারি কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা নিম্নআয়ের শ্রমিক যখন প্রতিদিনের বাজার খরচ সামলাতে গিয়ে সঞ্চয় হারান, তখন তার জন্যও রাষ্ট্রের একটি কার্যকর নীতি থাকা প্রয়োজন।
কারণ একই দেশের নাগরিক হয়েও যদি একজনের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য করার জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে সুরক্ষিত হয় এবং অন্যজনকে সম্পূর্ণভাবে বাজারের অনিশ্চয়তার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে আয়বৈষম্যের চাপ আরও গভীর হতে পারে।
নতুন পে-স্কেল তাই সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের মূল্যস্ফীতি ও পুরোনো বেতন কাঠামোর ক্ষতি বিবেচনায় এর যৌক্তিক ভিত্তিও রয়েছে। কিন্তু অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের পরীক্ষায় শুধু একটি শ্রেণির বেতন বাড়ানো যথেষ্ট নয়।
রাষ্ট্রকে একই সঙ্গে দেখতে হবে—এই বেতন বৃদ্ধির অর্থ কোথা থেকে আসছে, এর প্রভাব মূল্যস্ফীতির ওপর কতটা পড়ছে, বাজেট কতটা চাপ সামলাতে পারছে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
কারণ সরকারি বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সুফল যদি একদিকে স্বস্তি তৈরি করে, আর অন্যদিকে সেই ব্যয়ের ভার কর, মূল্যস্ফীতি কিংবা কমে যাওয়া সামাজিক সহায়তার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর ফিরে আসে, তাহলে অর্থনৈতিক ভারসাম্য অর্জিত হবে না।
অতএব নতুন পে-স্কেলের সাফল্য মাপার মানদণ্ড শুধু সরকারি কর্মীদের বেতন কত শতাংশ বাড়ল—এতে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। দেখতে হবে, দেশের সামগ্রিক মজুরি কতটা বাড়ল, মূল্যস্ফীতি কতটা নিয়ন্ত্রণে এলো, নিম্নআয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কতটা ফিরল এবং আয়বৈষম্য কমল কি না।
সরকারি কর্মীদের স্বস্তি তখনই অর্থবহ হবে, যখন একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার চাপও কমবে। অন্যথায় একটি শ্রেণির বেতন সমন্বয় হয়তো প্রশাসনিকভাবে সফল হবে, কিন্তু বৃহত্তর অর্থনীতিতে ন্যায্যতার প্রশ্নটি থেকেই যাবে।

