ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন। এর মধ্যে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথিদের ঝড়ের গতির অগ্রযাত্রা নতুন মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের জন্য। গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা থেকে বাব এল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত দ্বীপ পর্যন্ত হুথিদের অবস্থান এখন এমন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে, যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দুই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহনপথই একসঙ্গে চাপের মুখে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সরাসরি মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ চাইলেও আপাতত তাতে ‘না’ বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন, হুথি সংকট সামলাতে কি কৌশলগত দ্বিধায় পড়ে গেছে ওয়াশিংটন?
ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে গত কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক হিসাব অনেকটাই পাল্টে দিয়েছে। হুথি যোদ্ধারা দ্রুত অগ্রসর হয়ে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর মোখা দখল করেছে। এরপর তাদের বাহিনী বাব এল-মান্দেব প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মাইয়ুন বা পেরিম দ্বীপেও প্রবেশ করেছে। এর মাধ্যমে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের ওপর হুথিদের নিয়ন্ত্রণ নাটকীয়ভাবে বেড়েছে।
বাব এল-মান্দেব কোনো সাধারণ সমুদ্রপথ নয়। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করা সরু এই জলপথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল বাণিজ্য চলাচল করে। হরমুজ প্রণালিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে আগে থেকেই জাহাজ চলাচল চাপের মুখে। সেই সময়ে বাব এল-মান্দেবে হুথিদের শক্ত অবস্থান সৌদি আরবের জন্য যেন ‘দ্বিতীয় দরজাটিও বিপদের মুখে পড়া’র মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
হুথিদের অবশ্য গোটা প্রণালি বন্ধ করে দিতে হবে এমন নয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি জাহাজে হামলা কিংবা হামলার বিশ্বাসযোগ্য হুমকিই যথেষ্ট। তাতেই আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো জলপথকে উচ্চঝুঁকির হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। ফলে জাহাজকে হাজার হাজার কিলোমিটার ঘুরে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ হয়ে যেতে হতে পারে – বাড়ে সময়, জ্বালানি ব্যয় ও বীমা খরচ। আল জাজিরার বিশ্লেষণেও এই বিষয়টিই বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
এমবিএসের দুই ফোন, কিন্তু ট্রাম্পের জবাব ‘না’
পরিস্থিতি কতটা গুরুতর হয়ে উঠেছে, তার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত এসেছে রিয়াদ থেকে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম Axios-এর তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান বৃহস্পতিবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে দুবার ফোন করেন। দ্বিতীয় ফোনে তিনি সরাসরি হুথিদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক হামলার অনুরোধ জানান। কিন্তু ট্রাম্প তাতে সম্মতি দেননি।
CBS News-ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ সরাসরি মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ চেয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াশিংটন আপাতত নিজস্ব বাহিনী দিয়ে হুথিদের ওপর হামলা না চালিয়ে সৌদি আরবকে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে সহায়তা দেওয়ার পথে রয়েছে।
এর পেছনে ট্রাম্প প্রশাসনের বড় হিসাব ইরান।
ইরানের সঙ্গে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুল সামরিক শক্তি ইতোমধ্যে হরমুজ ও পারস্য উপসাগরকেন্দ্রিক পরিস্থিতিতে ব্যস্ত। মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন এখন নতুন করে ইয়েমেনে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধফ্রন্ট খুলতে চায় না। মার্কিন বাহিনীকে ইরান ও হরমুজের দিকে মনোযোগী রাখাই তাদের অগ্রাধিকার।
কিন্তু সমস্যা হলো – যে যুদ্ধ এড়িয়ে ট্রাম্প ইয়েমেনে সরাসরি নামতে চাইছেন না, সেই যুদ্ধই ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক মিত্র সৌদি আরবের দরজায় এসে পৌঁছাচ্ছে।
সৌদি ভূখণ্ডেও হুথিদের আঘাত
সংঘাত এখন আর ইয়েমেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই।
হুথিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হয়েছে এবং এসব ঘটনায় বহু মানুষ আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ৮ সেপ্টেম্বরের বড় হামলার পর রিয়াদ কঠোর প্রতিশোধের ঘোষণা দেয়।
এরপরও হামলা থামেনি। ১৪ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে এপি জানিয়েছে, হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে আরও আক্রমণ চালিয়েছে, অন্যদিকে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীও পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে কয়েক বছর তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকার পর ইয়েমেন আবার বড় ধরনের আঞ্চলিক যুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
‘বিভ্রান্ত’ ট্রাম্প?
এই প্রেক্ষাপটেই ট্রাম্পের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষকদের একটি অংশের প্রশ্ন- যুক্তরাষ্ট্র যদি লোহিত সাগরে অবাধ জাহাজ চলাচলকে সত্যিই নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় স্বার্থ মনে করে, তাহলে বাব এল-মান্দেবের পরিস্থিতি এতটা খারাপ হওয়ার আগেই কেন হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না?
সৌফান সেন্টারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং দীর্ঘদিনের ইরান বিশ্লেষক কেনেথ কাৎজমান ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতিরও সমালোচক। এর আগে তিনি আল জাজিরাকে বলেছেন, ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন একটি কৌশলগত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে- আর সেই বৃহত্তর সংকটের মধ্যেই এখন যুক্ত হয়েছে ইয়েমেন ও হুথি ফ্রন্ট।
তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিতে পরিস্থিতি ভিন্ন। ওয়াশিংটনের যুক্তি হলো- যুক্তরাষ্ট্র নিজে প্রতিটি আঞ্চলিক যুদ্ধে সরাসরি না নেমে সৌদি আরব ও ইয়েমেনের স্বীকৃত সরকারকে সামনে রেখে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ, বিশেষ করে লোহিত সাগরে নৌচলাচলের স্বাধীনতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ভূমিকা রাখবে।
অর্থাৎ আপাতদৃষ্টিতে এটি ‘কিছু না করা’ মনে হলেও বাস্তবে ট্রাম্প একটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসাব কষছেন – সৌদিকে সহায়তা করবেন, কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন যুদ্ধ শুরু করবেন না।
কিন্তু সেই হিসাব কত দিন টিকবে?
এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
হুথিরা যদি সৌদি তেল স্থাপনায় হামলা বাড়ায়, অথবা বাব এল-মান্দেব দিয়ে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত করতে শুরু করে, তাহলে ট্রাম্পের সামনে বিকল্প সংকুচিত হয়ে আসবে।
একদিকে ইরান ও হরমুজ। অন্যদিকে হুথি ও বাব এল-মান্দেব।
আরব উপদ্বীপের দুই পাশে বিশ্বের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ যদি একই সময়ে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, তার প্রভাব ইয়েমেন কিংবা সৌদি আরবেই আটকে থাকবে না। বিশ্ববাজারে তেলের দাম, জাহাজের বীমা, পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং ইউরোপ- এশিয়ার সরবরাহব্যবস্থায়ও বড় ধাক্কা লাগতে পারে। সাম্প্রতিক অস্থিরতায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ ইতোমধ্যে বেড়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, হুথিদের জন্য বাব এল-মান্দেব সম্পূর্ণ বন্ধ করাও হয়তো প্রয়োজন নেই। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য ‘এই পথ নিরাপদ নয়’ – এমন ধারণা তৈরি করতে পারাটাই তাদের বড় অস্ত্র।
এবং ঠিক সেই জায়গাতেই সংকটে পড়েছে ওয়াশিংটন।
সৌদি আরব চায় শক্তিশালী মার্কিন সামরিক আঘাত। ট্রাম্প চান নতুন যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে। হুথিরা মিনহোয়াইল যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন অবস্থান শক্ত করছে। আর ইরান দেখছে তার ঘনিষ্ঠ একটি আঞ্চলিক শক্তি এমন এক সমুদ্রপথের কাছে পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকেও চাপ দেওয়া সম্ভব।
ফলে হুথিদের এই অগ্রযাত্রা শুধু ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধের আরেকটি অধ্যায় নয়; এটি এখন ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য কৌশল, সৌদি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ- তিনটির জন্যই বড় পরীক্ষা।
ট্রাম্প আপাতত সরাসরি যুদ্ধে নামছেন না। কিন্তু বাব এল-মান্দেবের উত্তাল পানি হয়তো শেষ পর্যন্ত তাকেও একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে।
সূত্র: আল জাজিরা, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), অ্যাক্সিওস, সিবিএস নিউজ ও এবিসি নিউজ।

