লক্ষ্মীপুরের এক যুবককে গত বছর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল সেনানিবাসে বাবুর্চির কাজের। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁকে সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়া হয় ইউক্রেন সীমান্তের যুদ্ধক্ষেত্রে। সাত মাস অমানবিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দেশে ফিরে আসেন তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল, পরে মাত্র একদিনের প্রশিক্ষণে তা চালানো শেখানো হয়। একসঙ্গে থাকা ষোলোজনের মধ্যে চারজন মারা যাওয়ার পর বাকি দিনগুলো কাটে চরম আতঙ্কে। পরে অসুস্থ হয়ে দুই মাস হাসপাতালে কাটিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরেন তিনি।
এই একটি ঘটনাই যেন প্রতিফলন ঘটাচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারের বর্তমান জটিল বাস্তবতার। রাশিয়া কখনোই দেশের বড় শ্রমবাজার ছিল না—ঐতিহ্যগতভাবে অদক্ষ শ্রমিকেরা মূলত মধ্যপ্রাচ্যেই যেতেন, কিছুসংখ্যক যেতেন মালয়েশিয়ায়, আর অপেক্ষাকৃত সচ্ছলরা পাড়ি জমাতেন ইউরোপে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বহু মানুষ এখন রাশিয়া ও কম্বোডিয়ার মতো অপ্রচলিত গন্তব্যে যাচ্ছেন, আর সেখানে গিয়েই প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অনেকে।
সরকারি জনশক্তি ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় বারো হাজারের বেশি বাংলাদেশি কম্বোডিয়া যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন, যার ফলে দেশটি বাংলাদেশের শ্রমবাজার তালিকায় অষ্টম স্থানে উঠে এসেছে। একই সময়ে রাশিয়ায় গেছেন প্রায় সাড়ে চার হাজার সাতশ কর্মী, যা মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া বা লেবাননের চেয়েও বেশি।
তবে সামগ্রিক চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক নয়। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে বিদেশ যাওয়ার জন্য ছাড়পত্র নিয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী, যেখানে গত বছর একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে সাত লাখের কাছাকাছি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেই বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ কমে গেছে।
একটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সংগঠনের সাবেক একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের বাজার সংকুচিত হয়ে গেছে, মালয়েশিয়ার বাজার একেবারেই বন্ধ। দেশে কর্মসংস্থানের অভাবে অনেকে যেকোনো উপায়ে বিদেশযাত্রার চেষ্টা করতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন, ঘটছে মানব পাচারের ঘটনাও। তাঁর দাবি অনুযায়ী, প্রায় সত্তর শতাংশ কর্মী সৌদি আরবে যাচ্ছেন স্বল্পমেয়াদি ভিত্তিতে, আর সেখানে গিয়ে অনেকেই কাজই পাচ্ছেন না। তিনি মনে করেন, পুরোনো বন্ধ বাজার সচল করা এবং নতুন বাজার তৈরি করা না গেলে পাচার ও প্রতারণা কমানো সম্ভব নয়, আর এ জন্য দরকার সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ।
উনিশশো ছিয়াত্তর সাল থেকে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হলেও এর প্রকৃত সম্প্রসারণ ঘটে নব্বইয়ের দশকে। গত পাঁচ বছরে বার্ষিক গড় কর্মী প্রেরণের সংখ্যা দশ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, আর সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছিল কয়েক বছর আগে, যখন এক বছরেই তেরো লাখের বেশি কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন। এই শ্রমশক্তির পাঠানো অর্থই দেশের বৈদেশিক মুদ্রার একটি বড় উৎস—গত পাঁচ অর্থবছরে গড়ে বছরে প্রায় ছাব্বিশশ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দেশে এসেছে, যা রেমিট্যান্স প্রাপ্তির দিক থেকে বাংলাদেশকে বিশ্বে সপ্তম স্থানে রেখেছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, দীর্ঘদিন ধরে এই বাজার হাতে গোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গত পনেরো বছরে মোট দুইশতাধিক দেশে কর্মী পাঠানো হলেও সোয়া এক কোটির বেশি মোট কর্মীর প্রায় আশি শতাংশই গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে, আর চুরানব্বই শতাংশ গেছেন দশটি দেশে। শীর্ষ এই দশ দেশের মধ্যে সাতটিই মধ্যপ্রাচ্যের, বাকিগুলো এশিয়ার অন্যান্য দেশ। অথচ প্রায় একশত দেশে দেড় দশকে একশজন কর্মীও পাঠানো যায়নি, যদিও এসব দেশের অনেকগুলোর অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো এবং শ্রমবাজারে চাহিদাও রয়েছে।
এই সীমিত কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরতাই এখন সংকটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ সেসব দেশের অনেকগুলোতেই বাজার হয় সংকুচিত হয়েছে, নয়তো সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। কয়েক বছর আগে মালয়েশিয়ায় এক বছরেই সাড়ে তিন লাখের বেশি কর্মী গিয়েছিলেন, কিন্তু নানা অনিয়মের কারণে দেশটির শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। একইভাবে ওমানের বাজারও কার্যত অচল হয়ে পড়ে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের চিত্রও একই রকম—এক সময় যেখানে বছরে প্রায় এক লাখ কর্মী যেতেন, এখন তা নেমে এসেছে মাত্র কয়েক হাজারে। বাহরাইনেও দীর্ঘদিন ধরে কর্মী যাওয়া বন্ধ। লেবাননে চলমান সংঘাতের কারণে সেখানেও কর্মী রপ্তানি অনেক কমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রম কেবল সৌদি আরব, যেখানে আসন্ন বিশ্বকাপ আয়োজনকে কেন্দ্র করে অবকাঠামো নির্মাণে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বেড়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, এই প্রবণতা আগামী বছর থেকে না-ও থাকতে পারে। উপরন্তু, এ বছরের প্রথমার্ধে সৌদি আরবগামী কর্মীর সংখ্যা আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে, এবং সেখানে গিয়ে চুক্তি অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার অভিযোগও অনেকের।
প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক একজন প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, বিদ্যমান বাজারের পাশাপাশি নতুন বাজার খোলার চেষ্টা চলছে, বিশেষ করে আগে সংকুচিত হয়ে যাওয়া বাজারগুলো পুনরায় সচল করার জন্য আলোচনা চলমান রয়েছে। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিদেশে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্যে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
এই সংকটের সুযোগ নিয়েই গড়ে উঠেছে নতুন ধরনের প্রতারণা চক্র। কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশিদের নেওয়া হচ্ছে কলসেন্টারে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে, এরপর সেখানে তাদের দিয়ে করানো হচ্ছে অনলাইন প্রতারণার কাজ। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে সম্প্রতি এসব প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে একমাসেই ছয়শর বেশি বাংলাদেশি কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন, আর প্রতিদিনই আরও অনেকে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
এদিকে রাশিয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো কর্মীদের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। কেউ কেউ পালিয়ে আসতে পারলেও অনেকে সেখানেই প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন। থাইল্যান্ড ও ইউক্রেনভিত্তিক দুটি মানবাধিকার সংগঠনের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে সে সময় পর্যন্ত চৌত্রিশজন নিহত হয়েছেন।
অন্যদিকে উন্নত জীবনের আশায় ইতালি পৌঁছানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ ঘুরে লিবিয়ায় পাড়ি জমাচ্ছেন অনেক বাংলাদেশি। সেখানে গিয়ে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা, এরপর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন। গত বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পৌঁছানো বিভিন্ন দেশের প্রায় ছেষট্টি হাজার মানুষের মধ্যে সমুদ্রে নিখোঁজ বা নিহত হয়েছেন এগারোশর বেশি। চলতি বছরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পথে ইতালি পৌঁছানোদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় বত্রিশ শতাংশই বাংলাদেশি নাগরিক।
পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিটের হিসাব বলছে, গত সাত বছরে পাঁচশর বেশি মামলায় দেড় হাজারের বেশি ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেপ্তার করা গেছে মাত্র সাড়ে তিনশজনকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর প্রায় পঁচানব্বই শতাংশ আসামিই শেষ পর্যন্ত খালাস পেয়ে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পাচারকারীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে এই সমস্যা থামানো কঠিন।
এদিকে লাইসেন্সপ্রাপ্ত রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যাও একটি বড় উদ্বেগের কারণ। প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এজেন্সির সংখ্যা অনেক বেশি—আগে যেখানে নয়শর মতো ছিল, তা বেড়ে প্রায় আড়াই হাজারে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এত বিপুলসংখ্যক এজেন্সির ওপর কার্যকর নজরদারি রাখা প্রায় অসম্ভব, তাই এই সংখ্যা যুক্তিসংগতভাবে কমিয়ে আনা প্রয়োজন। উল্লেখযোগ্য যে, গত জুলাইয়ে একটি বড় দুর্নীতির মামলার প্রেক্ষিতে প্রায় পঞ্চাশটি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
একজন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলছেন, নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে যে উদাসীনতা রয়েছে, তা এখনো দূর হয়নি। যেসব দেশে নিয়োগপত্রের সত্যতা যাচাই করাই সম্ভব হয় না, সেসব দেশে কীভাবে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তব প্রতিফলন দেখাতে হবে, নইলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রবাসী কর্মীরাই।
প্রতারণার শিকার হয়ে দেশে ফেরার সংখ্যাও কম নয়। বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ভ্রমণ অনুমতিপত্র নিয়ে ফিরেছেন পনেরো হাজারের বেশি মানুষ, আর শুধু এক মাসেই ফিরেছেন আট হাজারের বেশি। এসব মানুষ সাধারণত সবকিছু হারিয়ে, পাসপোর্ট ছাড়াই পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পর এই বিশেষ অনুমতিপত্র নিয়ে দেশে ফেরেন।
মাদারীপুরের এক যুবকের গল্প এই বাস্তবতার এক করুণ উদাহরণ। নিজের খাবারের ব্যবসা বিক্রি করে ইতালি যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি, লিবিয়ায় বন্দিজীবন কাটিয়ে বত্রিশ লাখ টাকা খুইয়ে কোনোরকমে প্রাণ নিয়ে দেশে ফিরতে পেরেছেন সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায়। বাড়িতে পরিবার তাঁর জন্য অপেক্ষা করলেও তাঁর মনে এখন একটাই দুশ্চিন্তা—এত টাকা ধার করে যাঁরা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের কী জবাব দেবেন তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে বেরোতে হলে একদিকে যেমন পুরোনো বন্ধ বাজার পুনরায় খোলার কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে, তেমনি অন্যদিকে নতুন বাজার তৈরির প্রক্রিয়ায় নিয়োগপত্র যাচাইসহ কড়া নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। নইলে দেশের লাখো তরুণের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন প্রতারকদের হাতে জিম্মি থেকে যাবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

