বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। প্রায় দুই দশক আগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে দেশের প্রধান ও তুলনামূলক সস্তা জ্বালানি উৎস প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত সীমিত এবং ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বদলে বারবার নেওয়া হয়েছে স্বল্পমেয়াদি সমাধান। এর ফলে সাময়িক স্বস্তি এলেও আজ বাংলাদেশ প্রায় সব ধরনের জ্বালানির জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
জ্বালানি আমদানি শুরুতে বিদ্যুৎ ও শিল্পখাতকে সচল রাখতে সহায়তা করেছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে এই পথ অনুসরণ করার ফলে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা গড়ে ওঠেনি। বরং আমদানিনির্ভর একটি ব্যয়বহুল ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যার চাপ এখন অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের ওপর পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বহু বছর ধরেই বলে আসছেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল—দেশীয় কয়লা ও গ্যাসের কার্যকর ব্যবহার, নতুন গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দ্রুত সম্প্রসারণ। কিন্তু এসব দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের পরিবর্তে সরকারগুলো বারবার দ্রুত সমাধানের পথে হেঁটেছে।
বাংলাদেশের নিজস্ব কয়লার মজুত নিয়েও দীর্ঘদিন আলোচনা হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেশে ৭২৫ মিলিয়ন থেকে ৭.৮ বিলিয়ন টন পর্যন্ত কয়লার সম্ভাব্য মজুতের কথা বলা হয়েছে। এর আর্থিক মূল্য কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে সেই কয়লা ব্যবহার না করে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রায় ১০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ ব্যয় করে কয়লা আমদানি করছে।
একই চিত্র দেখা যায় গ্যাসের ক্ষেত্রেও। দেশে নতুন গ্যাস আবিষ্কারের সম্ভাবনা থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে বড় কোনো নতুন ক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। ১৯৯৮ সালে সিলেটের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের পর অনুসন্ধান কার্যক্রম কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোয়নি। ফলে গ্যাসের ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির দিকে যেতে হয়েছে।
এলএনজি স্বল্পমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জন্য ব্যয়বহুল সমাধান। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওপর নির্ভরশীল এই জ্বালানি দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
একসময় বাংলাদেশকে শুধু তেলজাতীয় পণ্য আমদানি করতে হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে আমদানির তালিকায় যুক্ত হয়েছে কয়লা, এলএনজি এবং অন্যান্য জ্বালানি। ফলে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থার মূল ভিত্তিই এখন বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরশীল।
গ্যাসের প্রাচুর্যের ধারণা ও বাস্তবতা
১৯৯৮ সালে মার্কিন কোম্পানি ইউনোকল যখন বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে, তখন বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন বর্তমান সময়ের তুলনায় অনেক কম ছিল। গ্যাস সরবরাহও ছিল আজকের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
বিবিয়ানা ছিল বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ। তবে ইউনোকল তখন দাবি করেছিল, বাংলাদেশে এত বেশি গ্যাস রয়েছে যে দেশের বাজার তা ব্যবহার করতে পারবে না। তারা গ্যাস ভারতে রপ্তানির সম্ভাবনার কথাও তুলেছিল।
পরবর্তী সময়ে সরকার দুটি কমিটি গঠন করে দেশের গ্যাস মজুত ও ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাই করে। এসব কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ গ্যাসে “ভাসছে”—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। বরং ভবিষ্যতে দেশে গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ফলে গ্যাস রপ্তানির পরিকল্পনা বাতিল হয় এবং বিবিয়ানা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে ইউনোকলকে অধিগ্রহণ করে শেভরন। একসময় বিবিয়ানা থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস উৎপাদিত হয়েছে, যা দেশের মোট গ্যাস উৎপাদনের বড় অংশ সরবরাহ করত।
এই সময় আরেকটি বড় সম্ভাবনা ছিল দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প। সেখানে বিপুল কয়লা মজুত থাকলেও এশিয়া এনার্জির প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। স্থানীয় জনগণের বিরোধিতা ও ২০০৬ সালের আন্দোলনের পর প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।
তবে সমস্যা হলো, প্রকল্পটি বাতিল হওয়ার পর বাংলাদেশ আর কোনো বিকল্প দেশীয় কয়লা ব্যবহারের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারেনি।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কেন থেমে গেল
২০০৮ সালের পর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকার একাধিক উদ্যোগ নেয়। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, তেলভিত্তিক ভাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন এবং বড় বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।
এসব উদ্যোগ দ্রুত বিদ্যুৎ সংকট কমাতে সাহায্য করলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ পিছিয়ে যায়।
২০১২ সালে একটি কয়লা বিদ্যুৎ উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে দেশীয় কয়লা, গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মাধ্যমে দেশের অর্ধেকের বেশি প্রাথমিক জ্বালানি চাহিদা স্থানীয় উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে দেশীয় কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ কয়লা ব্যবহার না করলেও বড় বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য বিদেশ থেকে কয়লা আমদানি শুরু করে।
বর্তমানে বাংলাদেশ বছরে প্রায় ২ কোটি টন কয়লা আমদানি করে, যার পেছনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১.২ থেকে ১.৩ বিলিয়ন ডলার।
গভীর সমুদ্র গ্যাস অনুসন্ধানের হারানো সুযোগ
বাংলাদেশের জ্বালানি ইতিহাসে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্র গ্যাস অনুসন্ধান ছিল আরেকটি বড় সম্ভাবনা।
২০০৮ সালে মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস বঙ্গোপসাগরের দুটি ব্লকে অনুসন্ধানের অনুমতি পায়। দীর্ঘ জরিপের পর তারা এমন একটি সম্ভাব্য গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পায়, যেখানে ৫ থেকে ৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস থাকার সম্ভাবনা ছিল।
কোম্পানিটি সেখানে ৩ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায়। তবে চুক্তির কিছু শর্ত পরিবর্তনের দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ ও পাইপলাইন নির্মাণসহ বিভিন্ন বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত কনোকোফিলিপস বাংলাদেশ থেকে সরে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তখন যদি একটি সমঝোতা করা সম্ভব হতো, বাংলাদেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি অনেক ভিন্ন হতে পারত। কারণ আজ যে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে, তার তুলনায় ওই প্রকল্পের সম্ভাব্য খরচ কম হতে পারত।
বর্তমানে বাংলাদেশ এলএনজি আমদানিতে বছরে প্রায় ৩.৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে, যা ২০২৯-৩০ সালের মধ্যে ৮.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগও কাজে লাগেনি
বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল অনেক আগেই। ২০০৮ সালে একটি নীতিমালায় ২০১৫ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ৫ শতাংশ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ১০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রাখা হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। ২০২০ সালে দেশের বিদ্যুতের মাত্র প্রায় ২.৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে এসেছে।
পরবর্তীতে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে ৩১টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যার মোট সক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৩০০ মেগাওয়াট। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে শত শত মিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি কমানো সম্ভব হতো এবং হাজারো কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারত।
কিন্তু পরবর্তীতে এসব প্রকল্প বাতিল করা হয়। সমালোচকদের মতে, বাতিল না করে প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন ও আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল।
সামনে বাংলাদেশের করণীয়
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আমদানিনির্ভরতা কমানো। শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়।
দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য শক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ এবং বাস্তবসম্মতভাবে নিজস্ব কয়লা সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানোর জন্য নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি অফশোর উইন্ড পাওয়ার বা সমুদ্রভিত্তিক বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যেতে পারে।
তবে একই সঙ্গে স্থল ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো জরুরি। দেশের গ্যাস ব্যবহারেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শিল্প ও বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং অপ্রয়োজনীয় অপচয় কমাতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—স্বল্পমেয়াদি সমাধান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। যে সতর্কবার্তা দুই দশক আগে দেওয়া হয়েছিল, সেটিকে গুরুত্ব না দেওয়ার ফল আজ দেশকে ভুগতে হচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের ভিত্তি। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—বাংলাদেশ কি চিরদিন জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভর করবে, নাকি নিজের সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী জ্বালানি ভবিষ্যৎ তৈরি করবে।

