বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য সাম্প্রতিক রফতানি পরিসংখ্যান একদিকে আশার খবর দিচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পের ভেতরের বাস্তবতা তৈরি করছে উদ্বেগ। দেশের পোশাক রফতানি বাড়ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও রয়েছে শক্তিশালী। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির সুফল কি সত্যিই উদ্যোক্তাদের হাতে থাকছে?
বাস্তব চিত্র বলছে, রফতানি আয় বাড়লেও পোশাক কারখানার মুনাফা আগের মতো নেই। বরং গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, ডিজেল ব্যবহার, বাড়তি শ্রমঘণ্টা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের চাপ—সব মিলিয়ে কারখানাগুলোর লাভের পরিমাণ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
বাইরে থেকে দেখলে আগস্ট মাসের রফতানি প্রবৃদ্ধি বেশ ইতিবাচক। তৈরি পোশাক রফতানি বেড়েছে প্রায় ১৪ শতাংশ। মোট পণ্য রফতানিতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির আড়ালে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—উচ্চ উৎপাদন খরচ বাদ দেওয়ার পর উদ্যোক্তাদের হাতে আসলে কতটা মুনাফা থাকছে?
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ প্রায় ৩৬১ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রফতানি করেছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নিট ও ওভেন—দুই ধরনের পোশাক রফতানিতেই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তবে রফতানির এই বৃদ্ধি সরাসরি মুনাফা বৃদ্ধির অর্থ নয়। কারণ পোশাক তৈরির প্রতিটি ধাপেই এখন খরচ বেড়েছে।
একটি পোশাক তৈরি করতে প্রয়োজন সুতা, কাপড়, রং, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শ্রম, পরিবহনসহ নানা উপকরণ। এসব খাতে ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে নির্ধারিত পোশাকের দাম সবসময় বাড়ানো যায় না। ফলে বাড়তি খরচের বড় অংশই উদ্যোক্তার মুনাফা থেকে সমন্বয় করতে হচ্ছে।
পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় কারণ হলো জ্বালানি সংকট। বিশেষ করে গ্যাসের স্বল্পচাপ শিল্প উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করছে।
গত ২১ জুলাই একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় গ্যাস সরবরাহে সংকট আরও তীব্র হয়। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, ঢাকা ও ময়মনসিংহের মতো শিল্পাঞ্চলে অনেক কারখানা প্রয়োজনীয় চাপের গ্যাস পাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্পিনিং, বুনন, ডায়িং ও ফিনিশিং কারখানা। কারণ এসব শিল্প সরাসরি গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে নিট পোশাক খাতে স্থানীয় টেক্সটাইল মিল থেকে কাপড় সংগ্রহ করা হয়। সেখানে উৎপাদন কমে গেলে পোশাক কারখানার কাঁচামাল সরবরাহেও সমস্যা তৈরি হয়।ফলে সংকট শুধু গ্যাস বিল বাড়াচ্ছে না, বরং পুরো উৎপাদন চেইনের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় অনেক বড় কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না এবং ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠানোর চেষ্টা করা যাচ্ছে।কিন্তু এর মূল্য দিতে হচ্ছে বাড়তি খরচের মাধ্যমে।
ডিজেলের দাম গ্যাসের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় একই পরিমাণ পণ্য উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অনেক কারখানা আবার উৎপাদন ঘাটতি পূরণ করতে অতিরিক্ত সময় কারখানা চালাচ্ছে। এতে বাড়ছে শ্রম ব্যয়, বিদ্যুৎ ব্যয় এবং যন্ত্রপাতি ব্যবহারের খরচ।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদনে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। উদ্যোক্তারা ডিজেল ব্যবহার করে এই ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সমাধান নয়।
কারণ আন্তর্জাতিক ক্রেতার কাছে পণ্যের দাম সাধারণত আগে থেকেই নির্ধারিত থাকে। উৎপাদন খরচ বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি খরচ সবসময় ক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা সম্ভব হয় না।
পোশাক শিল্পে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বড় উৎসব মৌসুমের জন্য তৈরি পোশাকের অর্ডার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে হয়।
কিন্তু গ্যাস সংকটে উৎপাদন পিছিয়ে গেলে সময়মতো পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে। তখন সমুদ্রপথের পরিবর্তে আকাশপথে পণ্য পাঠানোর প্রয়োজন হতে পারে।
সমুদ্রপথে যেখানে প্রতি কেজি পণ্য পরিবহনে তুলনামূলক কম খরচ হয়, সেখানে আকাশপথে সেই ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ব্যস্ত মৌসুমে এই খরচ আরও বাড়তে পারে।
ফলে কয়েক দিনের উৎপাদন বিলম্ব একটি বড় চালানের পুরো মুনাফা নষ্ট করে দিতে পারে।
এর পাশাপাশি বিদেশি ক্রেতারা দেরিতে পণ্য পাওয়ার কারণে মূল্যছাড় দাবি করতে পারেন। অর্থাৎ উদ্যোক্তারা একই সঙ্গে দুটি চাপের মুখে পড়ছেন—একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিক্রয়মূল্য বাড়ছে না।
বর্তমান রফতানি প্রবৃদ্ধি অনেকটা আগের পাওয়া অর্ডারের ফল। কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নতুন অর্ডারের প্রবাহ।
পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন ক্রয়াদেশের গতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জুলাই মাসে আগের মাসের তুলনায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন (ইউডি) ইস্যুর পরিমাণ কমেছে।
বিদেশি ক্রেতার অর্ডার পাওয়ার পর কাঁচামাল আমদানির জন্য এই অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তাই ইউডি কমে যাওয়া ভবিষ্যতের উৎপাদন ও রফতানির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থাৎ আগস্টের রফতানি প্রবৃদ্ধি বর্তমান পরিস্থিতির পুরো চিত্র নয়। এটি মূলত কয়েক মাস আগের অর্ডারের প্রতিফলন। বর্তমান সংকটের প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও স্পষ্ট হতে পারে।
পোশাক উদ্যোক্তাদের মতে, উৎপাদন ব্যয়ের চাপ নতুন নয়। গত কয়েক বছরে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ, শ্রমিক মজুরি বৃদ্ধি এবং অন্যান্য খরচের কারণে উৎপাদন ব্যয় প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়েছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের দাম সেই অনুপাতে বাড়েনি।
ফলে উদ্যোক্তাদের লাভের জায়গা ছোট হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকশ পোশাক কারখানা বন্ধ হওয়ার তথ্যও শিল্পখাতে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বড় কারখানাগুলো হয়তো কিছু সময় বাড়তি খরচ বহন করতে পারবে, কিন্তু ছোট ও মাঝারি কারখানার জন্য এই চাপ অনেক বেশি কঠিন।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতা করে আসছে। কম খরচে উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল বাংলাদেশের বড় শক্তি।
কিন্তু উৎপাদন ব্যয় যদি ধারাবাহিকভাবে বাড়তে থাকে, তাহলে সেই প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমে যাবে।
বর্তমান সংকট শুধু রফতানি কমে যাওয়ার ভয় নয়। এর চেয়েও বড় বিষয় হলো—রফতানি ধরে রাখতে গিয়ে উদ্যোক্তারা যেন মুনাফা হারিয়ে না ফেলেন।কারখানা চালু রাখতে ডিজেল ব্যবহার করা যায়, জরুরি সময়ে আকাশপথে পণ্য পাঠানো যায়। কিন্তু এসব কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
দীর্ঘমেয়াদে পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে রফতানিমুখী শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দেখতে হবে—উৎপাদন বাড়ছে কি না, নতুন বিনিয়োগ হচ্ছে কি না এবং উদ্যোক্তারা যুক্তিসংগত মুনাফা করতে পারছেন কি না।কারণ মুনাফা কমতে থাকলে একসময় রফতানি বাড়লেও নতুন কারখানা তৈরি হবে না, বিনিয়োগ কমবে এবং কর্মসংস্থানেও প্রভাব পড়বে।
বাংলাদেশের পোশাক খাত এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু বেশি রফতানি নয়—কম খরচে, স্থিতিশীলভাবে এবং লাভজনকভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

