রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগে ‘মহামান্য’, ‘মাননীয়’ শব্দ বাদ দেওয়ার এক পরিপত্র জারি করেই সরকার যেন একটি প্রতীকী কাজ সেরে ফেলল। কাগজে-কলমে এটি প্রশংসনীয়—রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদের সামনে সামন্তীয় ভাষার ব্যবহার কমানো ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের সবচেয়ে ওপরের সারিতে যে সংস্কার শুরু হলো, তা কি আদৌ পৌঁছাবে দেশের সেই আমলাতান্ত্রিক স্তরে, যেখানে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এই সম্মানসূচক শব্দের কাছে জিম্মি হয়ে থাকেন? নাকি এটি রয়ে যাবে শুধু একটি নথির শোভাবর্ধনকারী পরিবর্তন হিসেবে, যার প্রভাব থানার ডেস্ক বা ভূমি অফিসের জানালা পর্যন্ত পৌঁছাবে না?
সামন্ত প্রথা কাগজে বিলুপ্ত, বাস্তবে জীবিত
ঔপনিবেশিক আমলে ‘স্যার’, ‘হুজুর’, ‘জাঁহাপনা’ এই সম্বোধনগুলো ছিল প্রভু আর প্রজার সম্পর্কের প্রতীক। ব্রিটিশ শাসকরা এই শব্দগুলোর মধ্য দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব আর শাসিতের অধীনতা প্রতিষ্ঠিত করত। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও, প্রজাতন্ত্রের দলিলপত্রে ‘সামন্ত প্রথা বিলুপ্ত’ লেখা থাকলেও বাস্তবে তার চর্চা এখনো অক্ষত। সংবিধানে ‘প্রজাতন্ত্র’ শব্দটির অর্থ জনগণের রাষ্ট্র, যেখানে ক্ষমতার উৎস জনগণ, আর সরকারি কর্মচারী সেই জনগণের করের টাকায় বেতনভুক সেবক মাত্র। অথচ বাস্তবতা ঠিক উল্টো। থানা থেকে তহসিল অফিস, ভূমি অফিস থেকে সরকারি হাসপাতাল, পাসপোর্ট অধিদপ্তর থেকে বিআরটিএ সর্বত্র একটাই অলিখিত নিয়ম চালু আছে: ‘স্যার’ না বললে কাজ হবে না। প্রজাতন্ত্রের নথিতে সামন্ত প্রথা বিলুপ্ত হলেও, প্রশাসনের চেয়ার-টেবিলে তা এখনো পুরোদমে জীবিত, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আরও দৃঢ়ভাবে প্রোথিত।
দাপ্তরিক ভাষা আর মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা – দুই ভিন্ন জগৎ
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই পরিপত্র মূলত প্রযোজ্য দাপ্তরিক নথি, চিঠিপত্র ও সারসংক্ষেপে লিখিত সম্বোধনের ক্ষেত্রে। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসের যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন, তা কোনো নথির ভাষা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তা নির্ধারিত হয় কাউন্টারের ওপাশে বসা কর্মকর্তা বা কর্মচারীর মানসিকতা দিয়ে। একটি পরিপত্র প্রধানমন্ত্রীর পদবির আগের শব্দ বদলাতে পারে, কিন্তু তা একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর টেবিলে বসে থাকা কর্মকর্তার আচরণ বদলাতে পারে না। ফলে এই সংস্কার যতটা প্রতীকী, ততটাই সীমিত-রাষ্ট্রের চূড়ায় একটি শব্দ পরিবর্তন হলেও, রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত্তিতে ক্ষমতার সেই পুরোনো সমীকরণ অপরিবর্তিত থেকে যায়।

‘স্যার’ না বললেই দুর্ব্যবহার
এটি কোনো অতিরঞ্জিত অভিযোগ নয় দেশের অসংখ্য সেবাপ্রার্থীর নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। জমির খতিয়ান তুলতে গিয়ে, পাসপোর্ট অফিসে লাইনে দাঁড়িয়ে, থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করতে গিয়ে, কিংবা সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা চাইতে গিয়ে বহু মানুষকে শুনতে হয়েছে ধমক, তাচ্ছিল্য কিংবা ইচ্ছাকৃত হয়রানি – শুধু ‘স্যার’ সম্বোধনে সামান্য দেরি বা ঘাটতির কারণে। একজন কৃষক, একজন রিকশাচালক, একজন দিনমজুর কিংবা একজন প্রবীণ নাগরিক যখন একটি সরকারি অফিসে গিয়ে তার ন্যায্য অধিকার চান, তখন তাকে প্রথমেই যে অলিখিত পরীক্ষায় পাস করতে হয়, তা হলো যথেষ্ট বিনয়ের সঙ্গে, মাথা নত করে ‘স্যার’ বলা-নইলে ফাইল নড়ে না, স্বাক্ষর মেলে না, সেবা আটকে থাকে টেবিলের কোণে অনির্দিষ্টকালের জন্য।
এমন ঘটনাও বিরল নয়, যেখানে একজন প্রবীণ ব্যক্তি বা একজন নারী সেবাপ্রার্থী শুধু সম্বোধনের ‘ভুলে’ কর্মকর্তার কাছ থেকে অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন, ফাইল ফেরত পাঠানো হয়েছে ঠুনকো অজুহাতে, কিংবা একই কাজে বারবার অফিসে দৌড়াতে বাধ্য করা হয়েছে। এই ধরনের আচরণ শুধু ব্যক্তিগত অসৌজন্য নয় এটি প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার একধরনের অপব্যবহার, যেখানে রাষ্ট্রীয় সেবা নাগরিকের অধিকার না হয়ে হয়ে ওঠে কর্মকর্তার ‘দয়া’।
এ কেমন প্রজাতন্ত্র, যেখানে নাগরিকের অধিকার নির্ভর করে তার সম্বোধনের ভঙ্গির ওপর?
এসএসসি পাস কর্মচারীও যখন ‘প্রভু’
আরও উদ্বেগজনক দিক হলো, এই ‘স্যার-সংস্কৃতি’র চর্চা শুধু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এসএসসি বা তার কাছাকাছি শিক্ষাগত যোগ্যতার একজন অফিস সহায়ক, পিয়ন কিংবা নিম্নপদস্থ কর্মচারীও অনেক সময় নিজেকে সেবাপ্রার্থীর চেয়ে ‘উঁচু’ মনে করেন, এবং সম্মানসূচক সম্বোধন না পেলে দুর্ব্যবহার করেন। এখানে বিষয়টি শিক্ষাগত যোগ্যতা বা পদমর্যাদার নয়-বিষয়টি একটি পুরো ব্যবস্থার সাংস্কৃতিক মানসিকতার, যেখানে সরকারি চাকরি মানেই যেন ক্ষমতার আসন, আর সাধারণ নাগরিক মানেই যেন প্রার্থী বা প্রজা। একজন উচ্চশিক্ষিত বেসরকারি চাকরিজীবী যখন সরকারি অফিসের গেটে গিয়ে একজন নিম্নপদস্থ কর্মচারীর কাছেও নতজানু হয়ে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে বাধ্য হন, তখন বোঝা যায় এই সংস্কৃতির শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত।
শুধু শব্দ বদলালেই সংস্কার হয় না
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পরিপত্র রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পদবি থেকে সম্মানসূচক শব্দ তুলে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায় এই সংস্কারের ছোঁয়া কি মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে পৌঁছাবে? যতক্ষণ না একজন উপজেলা কর্মকর্তা, একজন থানার ওসি কিংবা একজন ভূমি অফিসের কানুনগো নিজেকে ‘প্রভু’ নয় বরং ‘সেবক’ হিসেবে বিবেচনা করবেন, ততক্ষণ শুধু নথির ভাষা বদলে বাস্তবতার কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না। প্রকৃত সংস্কার দরকার প্রশাসনিক প্রশিক্ষণে, জবাবদিহিতার কাঠামোয়, অভিযোগ নিষ্পত্তির স্বচ্ছ ব্যবস্থায় এবং সর্বোপরি জনসেবার মানসিকতায় কাগজের একটি পরিপত্রে নয়। যতদিন না সরকারি চাকরিতে প্রবেশের প্রথম পাঠেই শেখানো হবে যে ‘আপনি জনগণের সেবক, প্রভু নন’, ততদিন এই ধরনের পরিপত্র নিছক প্রতীকী কাগজ হয়েই থেকে যাবে।
ভিন্নমতও আছে
তবে এ বিতর্কের আরেকটি দিকও আছে। অনেকে মনে করেন, সম্বোধন-সংস্কৃতি রাতারাতি বদলানো যায় না এবং এটি নিছক প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞার বিষয় নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বিষয়। কারও কারও যুক্তি, বিনয়সূচক সম্বোধন সব সময় সামন্তীয় মানসিকতার লক্ষণ নয়, এটি সামাজিক ভদ্রতারও অংশ হতে পারে, এবং পৃথিবীর বহু দেশেই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে সম্মানসূচক সম্বোধনের প্রচলন আছে। তাদের মতে, প্রকৃত সমস্যা সম্বোধনের শব্দে নয়, বরং ক্ষমতার অপব্যবহার ও জবাবদিহিতার ঘাটতিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে শব্দ বন্ধ করলেই দুর্ব্যবহার বন্ধ হয়ে যাবে না, বরং জনগণের উচিত ধীরে ধীরে সম্বোধন-সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার জায়গায় নিয়ে আসা।
তবু বাস্তবতা হলো, যতদিন সেবাপ্রার্থীর সঙ্গে আচরণ নির্ধারিত হবে তার সম্বোধনের ধরনে, ততদিন প্রজাতন্ত্র শব্দের প্রকৃত অর্থ বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে না। রাষ্ট্রপতির পদবি থেকে একটি সম্মানসূচক শব্দ সরানো সহজ; কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো, সেবক থেকে প্রভুর মানসিকতা মুছে ফেলা – এই লড়াই আরও অনেক দীর্ঘ, আরও অনেক কঠিন। প্রকৃত পরিবর্তন তখনই আসবে, যখন একজন কৃষক বা রিকশাচালক ভয় ছাড়া, মাথা নত না করে, একজন সরকারি কর্মকর্তার সামনে দাঁড়িয়ে তার প্রাপ্য অধিকার চাইতে পারবেন।

