ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ ও জিআই পণ্য। ইলিশের তিনটি প্রজাতি রয়েছে পদ্ম, গুড়তা ও চান্দিনা। বাংলাদেশ পৃথিবীর ৮৫ শতাংশ ইলিশ আহরণ করে। বাংলাদেশের জিডিপিতে ১ শতাংশ অবদান রাখে এই একটি মাত্র প্রজাতি। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১০ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। এ খাতে প্রায় ২৫ লক্ষ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবিকা নির্বাহের সাথে জড়িত। প্রতি বছর প্রায় ৫ লক্ষ টন ইলিশ নদ-নদী, উপকূল ও অগভীর সমুদ্র হতে আহরণ করা হয়।
ইলিশ মূলত একটি ‘অ্যানাড্রোমাস’ প্রজাতির মাছ – অর্থাৎ এরা বেশিরভাগ সময় বঙ্গোপসাগরে থাকলেও প্রজনন মৌসুমে (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে) বা আশ্বিন কার্তিক মাসের বড় পূর্ণিমা ও অমাবস্যা তিথিতে ডিম ছাড়ার জন্য ৬০-৭০% ইলিশ ঝাঁক বেঁধে পদ্মা ও মেঘনার মতো প্রদ্বীপে চলে আসে। এক একটি মা ইলিশ এক লক্ষ হতে ২০ লক্ষ পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। এটি নির্ভর করে মাছের বয়স ও আকৃতির উপর। ডিম থেকে রেণু, রেণু থেকে পোনা, পোনা থেকে জাটকা পর্যায় পৌঁছাতে প্রায় ১০ সপ্তাহ সময় লেগে যায়। যখন পোনাসমূহ ১২ থেকে ২০ সেন্টিমিটারে উপনীত হয়, তখন সেগুলোকে জাটকা বলা হয়। সাধারণত সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাসের ডিম থেকে সৃষ্ট জাটকা জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের দিকে সমুদ্রে গমন করে। সে কারণে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসে জেলেদের জালে জাটকা বেশি ধরা পড়ে। আর এইসব জাটকা ইলিশ ধরা পরার কারণে পরবর্তী মৌসুমে মা ইলিশ এর সংখ্যা কমে যায়। একটি ইলিশ মাছ পূর্ণাঙ্গ হতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। জাটকা ইলিশসমূহ সমুদ্রে বড় হয়ে আবার নদীতে ডিম পারার জন্য চলে আসে। তাই বর্ষা মৌসুমে মা ইলিশ বেশি ধরা পড়ে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে ইলিশের আহরণ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫.৭১ লাখ টন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৫.০০ লাখ টনে অর্থাৎ উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রাথমিক আহরণ পরিস্থিতি নিম্নমুখী প্রবণতা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তবে ইলিশের সংকটের দায় শুধু জেলেদের ওপর চাপিয়ে দিলে মূল সমস্যার অনেকটাই আড়ালে থেকে যায়। প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংসও এর একটি বড় দায়।সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরদারি ফাঁকি দিয়ে অবৈধ জালের ব্যবহারে অব্যাহত থাকা। ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে মিল না থাকা ইলিশের বড় ক্ষতি করছে।

আর এই সংকটগুলো অধিকাংশই মানবসৃষ্ট। এ পরিস্থিতিতে ইলিশের প্রজনন সুরক্ষায় ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারাদেশে ২২ দিন ইলিশ আহরণে নিষেধাজ্ঞা চলছে। এখন ইলিশ পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময়ও নিষিদ্ধ রয়েছে।দেশের বিভিন্ন এলাকাতে ইলিশের প্রজনন ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে নজরদারি চালানো হচ্ছে।যেমনঃমুন্সীগঞ্জের গজারিয়া এলাকায় মেঘনা ও পদ্মা নদীতে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড নজরদারি শুরু করেছে। নোয়াখালীতে মৎস্য কর্মকর্তারা ইলিশ সংগ্রহ করে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে।
তারপরও জেলেরা ইলিশ মাছ ধরার জন্য সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ জালসমূহ ব্যবহার করে। এতে অল্প সময়ে অনেক মাছ ধরা পড়ে। কারেন্ট জাল একটি নিষিদ্ধ জাল যা আধাঘণ্টা নদীতে রাখলেই সারাদিনের জন্য প্রয়োজনীয় উপার্জন জেলেদের উঠে আসে। সে কারণে তারা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত জাল ব্যবহার না করে নিষিদ্ধ জালসমূহ ব্যবহার করে। এসব নিষিদ্ধ জালে মাছ যত বেশি সময় থাকে তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে মাছের গুণাগুণ হ্রাস পায় এবং বাজার দরও কমে যায়। একটি নৌকায় পাঁচ থেকে আটজন জেলে কাজ করে। নৌকার মালিক মাছ বিক্রি হতে প্রাপ্ত আয়ের ৩৫% পেয়ে থাকে। আর জেলেরা ৬৫% পেয়ে থাকে।
নিষেধাজ্ঞার সময়ে মাছ ধরা বন্ধ রাখার নির্দেশনা থাকলেও অনেক জেলে জীবিকার তাগিদে সংকটে পড়েন।মাদারীপুরের ১৫১ জন জেলে পরিবারের প্রত্যেককে ২৫ কেজি করে সরকারি সহায়তার ভিজিএফের চাল বিতরণ করা হয়। কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়, তাই এ সময়ে অনেক জেলে ধারদেনা করে, সঞ্চয় ভেঙে, আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে কিংবা অন্যের কাজে শ্রম দিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কেউ কেউ কৃষিকাজ, দিনমজুরি, নৌকা ও জাল মেরামত, মাছের আড়তে শ্রমিকের কাজ কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায় যুক্ত হন। তবে সবার জন্য বিকল্প কাজের সুযোগ থাকে না।
প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যে কোনো মূল্যেই হোক নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে তার হদিস পুরোপুরি মিলছে না। মানিকগঞ্জের পদ্মা মেঘনায় অবাদে ইলিশ ধরা আর বিক্রি চলছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে শুধু আইন প্রয়োগ ও অভিযান যথেষ্ট নয়; জেলেদের জন্য ন্যায্য সহায়তা, দাদন প্রথা বন্ধে সহজ শর্তে ঋণ, প্রকৃত জেলেদের সঠিক তালিকা প্রণয়ন এবং সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।”
বাংলাদেশের জেলেরা উন্নত বিশ্বের মতো মাছ ধরার জন্য লাইসেন্স ব্যবস্থার আওতায় নেই। তাই নৌকা, জাল ও জেলেদের নিয়ন্ত্রণের কাঠামো তৈরি হয়নি। ইলিশ মাছ উৎপাদন টেকসই করার লক্ষ্যে সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়ন অত্যাবশ্যক। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মৎস্য অধিদপ্তর থেকে প্রতি জেলায় পর্যাপ্ত কৌশল গ্রহণ করতে হবে। ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বহুমুখী প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সরকার কর্তৃক নির্ধারিত নিষিদ্ধ সময়ে নদীতে এবং সমুদ্রে মাছ ধরা বন্ধ কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন ও ব্যবহার বন্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ, জাটকা নিধন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ এবং জেলেদের নৌকার সংখ্যা সীমিত রাখা অত্যাবশ্যক। ইলিশ মাছের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত এবং মানব সৃষ্ট প্রতিকূলতা রোধ করা গেলে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৭ লক্ষ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদন সম্ভব। মাছ উৎপাদন সংশ্লিষ্ট জেলাসমূহে মৎস্য বিভাগের সৎ, কর্মঠ এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মকর্তা পদায়ন করতে হবে।
তাই,বৈশ্বিক ইলিশ উৎপাদনে ইলিশকে এক নাম্বারে ধরে রাখতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স) সিটিজেন্স ভয়েস

