১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে সাদ্দাম হোসেন দ্রুত বিজয়ের আশায় ইরানের ওপর পুরোদস্তুর স্থল ও বিমান হামলার নির্দেশ দেন। তিনি ইরাকি জনগণকে বলেছিলেন যে তিনি কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তেহরানে পৌঁছাবেন। কিন্তু তার পরিবর্তে, যুদ্ধটি প্রায় আট বছর ধরে চলেছিল এবং এতে দশ লক্ষেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল।
ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের বাইরেও- এই যুদ্ধই ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে আজকের এই ব্যবস্থায় রূপ দিতে সাহায্য করেছে।
সেই সময়ে ইরান তখনও ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের অস্থিরতা সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিল, যে বিপ্লবে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রধান মিত্র শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল।
বিপ্লবোত্তর ইরানি সেনাবাহিনী ভেঙে পড়ছিল, অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী, বামপন্থী এবং এমনকি মধ্যপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো ইরানের প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বাধীন চরম রক্ষণশীল আলেমদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিল।
সাদ্দাম হোসেনের আক্রমণ শুধু খোমেনির শাসনের পতন ঘটাতেই ব্যর্থ হয়নি, বরং তা শেষ পর্যন্ত খোমেনির শাসনকে আরও দৃঢ় করতে সাহায্য করেছিল।
এই যুদ্ধ নতুন নেতৃত্বকে তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করতে, বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করতে এবং ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুসংহত করতে সাহায্য করেছিল।
|
সেই বছরগুলোতে, ইরানের শহরগুলোর দেয়ালে খোমেনির নামে প্রচলিত একটি উক্তি দেখা যেত: “যুদ্ধ একটি আশীর্বাদ।”
প্যারিস-ভিত্তিক ইরানি বিরোধী নেতা এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের সমালোচক বেহরুজ ফারাহানির মতে, এটি ছিল খোমেনির নির্মমতাকে ঢাকার একটি আবরণ।
একটি স্বৈরাচারী শাসনের জন্য যুদ্ধই শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ, কারণ এর অজুহাতে যেকোনো ভিন্নমতকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায় এবং সর্বগ্রাসী শাসনের ভিত্তি আরও মজবুত করা যায়।
১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক যুদ্ধের অবসান ঘটে। এক বছর পর খোমেনি মারা যান এবং ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে পুনর্গঠনের কাজ পুরোদমে শুরু হয়।
সময়ের সাথে সাথে খোমেনির উদ্ধৃতি সম্বলিত গ্রাফিতিগুলো ম্লান হয়ে যায় এবং তার জায়গায় খামেনেইয়ের বিবৃতি স্থান পায়।
কিন্তু সেই যুদ্ধ থেকে শাসকগোষ্ঠী যে শিক্ষা লাভ করেছিল, তা তখন থেকেই রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রতি তাদের প্রতিক্রিয়াকে রূপ দিয়েছে।
বিগত দশকগুলোতে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারকারী অনেক ব্যক্তিত্বই ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এসেছিলেন।
তাদের মধ্যে ছিলেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)-এর কুদস ফোর্সের নিহত কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি, তার উত্তরসূরি ইসমাইল কানি এবং ১৭ মার্চ ইসরায়েলের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হওয়া সাবেক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি।
এমনকি যারা এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তারাও যুদ্ধ দ্বারা প্রভাবিত একই প্রজন্মের অংশ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কূটনীতিতে আসার আগে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আইআরজিসি-তে কর্মরত ছিলেন।
আর সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, যিনি বর্তমানে ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি, যুদ্ধের পরেও বহু বছর সামরিক পদে ছিলেন এবং পরে তা ত্যাগ করে বেসামরিক পদে যোগ দেন।
সম্ভবত ২৮শে ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের মুখে এই নেতারা এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য সদস্যরা যখন তাদের শাসনকে আরও সুদৃঢ় করবে, তখন তারাও খোমেনির সেই মন্ত্রটিই আওড়াবে যে যুদ্ধ একটি “আশীর্বাদ”।
মিত্র নেই, বিকল্পও নেই
ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে ইসলামী প্রজাতন্ত্র যে প্রথম শিক্ষাগুলো লাভ করেছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল এই যে, বিপ্লবোত্তর প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তার হাতে বাস্তব কোনো বিকল্প খুব কমই ছিল।
১৯৭৯ সালের পর ইরানের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে যে মতাদর্শ রূপ দিয়েছিল, তা নতুন শাসকদের জন্য খুব কম মিত্রই রেখেছিল।
যুদ্ধ শুরু হলে শুধু পশ্চিমা শক্তিগুলোই সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন করেনি, বরং সিরিয়া এবং মাঝে মাঝে লিবিয়া ছাড়া এই অঞ্চলের অধিকাংশ আরব দেশই ইরানের বিরুদ্ধে পক্ষ নিয়েছিল।
|
এবং ইরাকের সামরিক বাহিনী দ্রুত শক্তিশালী প্রমাণিত হওয়ায়, ইরান আক্রমণকারী বাহিনীর কাছে তেলসমৃদ্ধ খুজেস্তান প্রদেশের কিছু অংশ হারায়।
বিচ্ছিন্নতা, অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা এবং অস্ত্র সংগ্রহের সংগ্রাম সত্ত্বেও, ইরান প্রায় এক বছর পর ইরাকি বাহিনীকে পিছু হটাতে সক্ষম হয়েছিল।
শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়েও অবিচল থাকার সেই গতিশীলতা এই সাম্প্রতিক যুদ্ধে আবারও প্রতিফলিত হয়েছে।
সমসাময়িক ইরানি ইতিহাসের একজন বিশিষ্ট গবেষক এবং ‘ইরান অ্যাট ওয়ার: ইন্টারঅ্যাকশনস উইথ দ্য মডার্ন ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড দ্য স্ট্রাগল উইথ ইম্পেরিয়াল রাশিয়া’ গ্রন্থের লেখক মাজিয়ার বেহরুজ বলেছেন, মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে দেশটির প্রতিক্রিয়া চার দশক আগের সেই সংঘাত থেকে ইরানের নেতাদের শেখা শিক্ষাকেই প্রতিফলিত করে।
“যখন ইরান ইরাকের আক্রমণের শিকার হচ্ছিল, তখন তারা [ইরানি কর্তৃপক্ষ] বুঝতে পেরেছিল যে তারা বাইরে থেকে কোনো সাহায্য পাবে না, তাই তাদের নিজেদের ওপরই নির্ভর করতে হয়েছিল” তিনি ব্যাখ্যা করেন।
সেই যুদ্ধ থেকে শিক্ষা ছিল ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি, যা তারা রিভার্স-ইঞ্জিনিয়ারিং করে উন্নত করেছিল। আজ আমরা এর ফল দেখতে পাচ্ছি, ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উভয়ের মধ্যেই, যা এখন যারা ইরানকে আক্রমণ করেছে তাদের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে।
বেহরুজ ইরান-ইরাক যুদ্ধ থেকে প্রাপ্ত আরেকটি শিক্ষার কথাও তুলে ধরেন: গুরুত্বপূর্ণ অভিযানগুলো গোপনে পরিচালনা করা।
১৯৮৮ সালে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর, ইরান পাহাড়ের গভীরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা নির্মাণ শুরু করে এবং তার পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু অংশ ভূগর্ভে সরিয়ে নেয়।
এই পরিবর্তনটি ছিল অন্যতম কারণ, যার জন্য গত কয়েক সপ্তাহ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর দিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ বন্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে।
কিন্তু আত্মনির্ভরশীলতা শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ইরানের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল।
ভার্জিনিয়ার উইলিয়াম অ্যান্ড মেরি কলেজের অধ্যাপক ও ইরানি ইতিহাসবিদ পেয়মান জাফারি বলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধ তেহরানকে সর্বক্ষেত্রে স্বাধীনতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
১৯৭৯ সালের আগে দেশটি সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রেই পশ্চিমা শক্তিগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল ছিল।
ইরান-ইরাক যুদ্ধ চলাকালীন এবং তার পরে সেই বিষয়টি মৌলিকভাবে বদলে গিয়েছিল।
“প্রতিষ্ঠানটি উপলব্ধি করেছিল যে তাকে স্বাধীন হতে হবে এবং যতটা সম্ভব নিজস্ব সম্পদের ওপর নির্ভর করতে হবে,” জাফারি ব্যাখ্যা করেন।
সামরিক, শিল্প, গোয়েন্দা এবং অন্য সকল ক্ষেত্রে তাদের জন্য নিজস্ব উদ্যোগের ওপর নির্ভর করা এবং এই কাঠামোর মধ্যে থেকে নীতি-কৌশল নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

ক্ষমতা সংহত করা
এই যুদ্ধ এটাও নির্ধারণ করে দিয়েছিল যে নতুন শাসকগোষ্ঠী দেশের অভ্যন্তরে ক্ষমতার বিষয়টি কীভাবে সামলাবে।
বেহরুজ মার্কিন দূতাবাসের জিম্মি সংকট এবং ১৯৮০ সালে সাদ্দাম হোসেনের আগ্রাসনের মধ্যেকার সাদৃশ্যের দিকে ইঙ্গিত করেন।
ইসলামী বিপ্লবের সময় ইরানি জনগণের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুনাম কম ছিল, কারণ ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থানে সিআইএ জড়িত ছিল, যে অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করে শাহের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
১৯৭৯ সালে দূতাবাসে কয়েক ডজন মার্কিন কূটনীতিক ও নাগরিককে আটক করা হলে, সেই মার্কিন-বিরোধী মনোভাব আরও বেড়ে গিয়েছিল।
বেহরুজ উল্লেখ করেছেন, এর কিছুদিন পরেই সাদ্দাম হোসেন আক্রমণ করেন “এবং তারপরেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়”।
“শাসকগোষ্ঠীটি উদ্দেশ্যের পক্ষে সমর্থন জোগাড় করতে এবং ক্ষমতা সুসংহত করতে উভয় বিষয়কেই ব্যবহার করেছিল,” তিনি ব্যাখ্যা করেন।
এই একত্রীকরণের পেছনে ব্যাপক দমন-পীড়নেরও ভূমিকা ছিল।
১৯৮১ সালের পর, শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্মূল করতে আরও দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, যার শুরুটা হয়েছিল প্রধান বিরোধী দল পিপলস মোজাহেদিন অর্গানাইজেশনকে দিয়ে।
খোমেনি-পন্থী গোষ্ঠীগুলো দেশের প্রথম বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি আবুলহাসান বানি সাদরকে ক্ষমতাচ্যুত করে, কুর্দি সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে এবং বামপন্থী ও জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে ভেঙে দিয়ে তাদের দমন-পীড়ন অব্যাহত রেখেছিল।
এই পদক্ষেপগুলো ইরানের বিপ্লবোত্তর সমাজকেও নতুন রূপ দিয়েছিল। অনেকে নতুন এই ব্যবস্থাকে সমর্থন করলেও, অন্যরা পিছিয়ে এসে অপেক্ষা করেছিল।
“শাসকগোষ্ঠীর প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন ছিল, কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দর্শকও ছিলেন: যারা পিছিয়ে এসে কী ঘটছে তা দেখছিলেন এবং কে জিতবে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিলেন” বেহরুজ বলেন।
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পরেও একই ধরনের গতিপ্রকৃতি দেখা যায়।
সরকার এই যুদ্ধকে ব্যবহার করেছিল জাতীয়তাবাদী অনুভূতিকে উস্কে দিতে এবং জনগণের কাছে তার ভাবমূর্তি কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে, যা জানুয়ারিতে দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভের নৃশংস দমনের পর বিধ্বস্ত হয়েছিল।
তাছাড়া, যুদ্ধটি শাসকগোষ্ঠীকে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার সুযোগ করে দিয়েছিল।
কারারুদ্ধ ভিন্নমতাবলম্বীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বৃদ্ধি পায়, “গুপ্তচরবৃত্তি” এবং “বিদেশী গণমাধ্যমের সাথে যোগাযোগ”-এর ওপর কঠোর আইন প্রবর্তন করা হয় এবং এই অভিযোগগুলিতে গ্রেপ্তার আরও ব্যাপক হয়ে ওঠে।
সিস্টেমটি তৈরি করা
বিরোধী দলগুলোকে নির্মূল করার আবরণ দেওয়ার পাশাপাশি, ইরান-ইরাক যুদ্ধ ইরানের শাসনব্যবস্থা গঠনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
যুদ্ধ শেষ হলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনেক ঊর্ধ্বতন ও মধ্যম-পর্যায়ের কমান্ডার রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এমনকি ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রে প্রবেশ করেন।
জাফারির মতে, এই পরিবর্তন সংঘাত চলাকালীনই শুরু হয়েছিল, কিন্তু যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পর তা আরও ত্বরান্বিত হয়।
সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণের গতি ত্বরান্বিত হয় এবং একই সাথে যুদ্ধক্ষেত্রে বছরের পর বছর কাটানো বিপুল সংখ্যক মানুষকে অন্যান্য খাতে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়।
জাফারি এই প্রক্রিয়াটিকে এক ধরনের “সেনা ভ্রাতৃত্ববোধ” দ্বারা চালিত বলে বর্ণনা করেন।
“আমাদের সেই যুদ্ধের মানবিক দিকটি ভুলে যাওয়া উচিত নয়,” তিনি জোর দিয়ে বলেন।
ইরান-ইরাক যুদ্ধটি ছিল বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর নেতৃত্বের মধ্যে সেনা ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলার একটি প্রয়াস; ‘আমরা যুদ্ধটা পার করেছি’—এই বোধ, যা যুদ্ধরত সকলের মধ্যেই দেখা যায়। কিন্তু যেহেতু সেই যুদ্ধটি খুব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল, তাই সেই ভ্রাতৃত্ববোধ যেন ইস্পাতের মতো দৃঢ় হয়ে উঠেছিল।
যখন এই যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসেন, তখন তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা দৃঢ় বন্ধন নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি এবং রাষ্ট্রের আমলাতান্ত্রিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সম্প্রসারণের পেছনে চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।
এই গভীর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রভাব সাম্প্রতিক যুদ্ধে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আশা করেছিল যে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু বানালে পুরো ব্যবস্থাটাই ভেঙে পড়বে, কিন্তু ফল হয়েছে ঠিক তার উল্টো।
এই ভুল হিসাবের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জাফারি বলেন: “এর মূলে রয়েছে এই কুটিল প্রাচ্যবাদী ধারণা যে, এই ইরানিরা এক ধরনের বর্বর, যারা কোনো আধুনিক রাষ্ট্র গঠন করতে পারে না। এই ব্যবস্থাটি অত্যন্ত সুসংগঠিত, যেখানে রয়েছে বিভিন্ন স্তরের দপ্তর, একটি আর্থিক ব্যবস্থা এবং নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষার পরিকল্পনা।”

একটি অমীমাংসিত সমস্যা
ইরান-ইরাক যুদ্ধ যদি ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে বাহ্যিক হুমকি থেকে টিকে থাকার কৌশল শিখিয়েও থাকে, তবে তা এর অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা নিরসন করতে পারেনি।
এই যুদ্ধের ফলাফল যাই হোক না কেন, ইরানের কিছু অভ্যন্তরীণ সমস্যা অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়েও খোমেনি ও তার অনুসারীদের প্রতি জনগণের অসন্তোষ বিদ্যমান ছিল।
কিন্তু সেই সময়ে শাসকগোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থন ছিল এবং ভিন্নমত দমনে তাদের তেমন কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হতো না।
আজ সেই ভারসাম্য বদলে গেছে, যা ক্ষমতার পরিধিকে সংকুচিত করেছে এবং রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।
বেহরুজ ব্যাখ্যা করেন: “যেকোনো দেশে, যখন আপনি আপনার নাগরিকদের যত্ন নেন না, তখন তারা আপনার ওপর অসন্তুষ্ট হবে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে, তারা আপনাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত করে। অগণতান্ত্রিক দেশগুলোতে, সময়ের সাথে সাথে তৃণমূলের কথা শোনার ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং দমন-পীড়ন তীব্রতর হওয়ার সাথে সাথে তৃণমূল কী চায় তা বোঝা ক্রমশ অসম্ভব হয়ে পড়ে।”
ইসলামী প্রজাতন্ত্র যে শিক্ষাটি গ্রহণ করেনি তা হলো, কেবল দমন-পীড়ন দিয়ে অসন্তোষের সমাধান করা যায় না, কারণ সময়ের সাথে সাথে তা অসন্তোষকে আরও গভীর করে তোলে।
জাফারি আরও সরাসরিভাবে বলেন: “মতাদর্শগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক নাগরিক মনে করেন না যে তাঁরা এই ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত হতে পারবেন। তাছাড়া, আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যা, দারিদ্র্য, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি রয়েছে, আর এ কারণেই সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এই ব্যবস্থার প্রতি বীতশ্রদ্ধ।”
সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

