বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সূচকে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করলেও, দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এখনো দারিদ্র্যের চক্র থেকে বের হতে পারেনি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের গভীরতম কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল সম্পদ, উৎপাদনের অভাব বা অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার ফল নয়; বরং এর পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, চরম অব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিতার অভাব এবং স্বচ্ছতার মারাত্মক ঘাটতি। ব্যাংকিং খাতের সংকোচন, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ সংকুচিত হওয়া এই পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রের সুশাসনের এই সংকটগুলো কীভাবে সাধারণ মানুষকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে?
সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সরকারি অনুদান বিতরণে দলীয়করণ এবং স্বজনপ্রীতি বাংলাদেশের গ্রামীণ দারিদ্র্য জিইয়ে রাখার অন্যতম প্রধান কারণ। সরকার দরিদ্র মানুষের জন্য বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, কিংবা ভিজিডি (VGD) ও ভিজিএফ (VGF) কার্ডের মতো যেসব জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করে, তার একটি বড় অংশই প্রকৃত অভাবীদের হাতে পৌঁছায় না।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় কোটা এবং স্বজনপ্রীতির কারণে বিত্তশালী বা তুলনামূলক সচ্ছল ব্যক্তিরা এসব কার্ড পেয়ে যান, অথচ প্রকৃত দুস্থরা তালিকার বাইরেই থেকে যান। এই প্রাতিষ্ঠানিক দলীয়করণের ফলে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক তহবিলগুলো দারিদ্র্য বিমোচনে তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
দুর্নীতি ও সর্বগ্রাসী ঘুষ বাণিজ্য দেশের প্রান্তিক এবং নিম্ন-আয়ের মানুষের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। বর্তমানে যেকোনো সরকারি সেবা, নাগরিক সুবিধা, কিংবা আইনি সহায়তা পেতে সাধারণ মানুষকে পদে পদে ঘুষ দিতে হচ্ছে। একজন দরিদ্র কৃষক বা দিনমজুর যখন তার ন্যায্য অধিকার আদায়ে কিংবা ছোটখাটো ব্যবসা পরিচালনায় এই ঘুষের খপ্পরে পড়েন, তখন তার মূল পুঁজি শেষ হয়ে যায়। দুর্নীতি কেবল সরকারি অর্থেরই অপচয় করছে না, বরং এটি গরিব মানুষের কষ্টার্জিত উপার্জনকে এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও দালালের পকেটে চালান করে দিচ্ছে, যা তাদের স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যের সীমার নিচে আটকে রাখছে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে দারিদ্র্য ও বৈষম্য বৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় আঘাতগুলোর একটি এসেছে আর্থিক খাতের ব্যাপক দুর্নীতি, ব্যাংকলুট এবং বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ থেকে। প্রভাবশালী গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ব্যক্তিরা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে তা পরিশোধ না করায় বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাট ও বিদেশে পাচার হয়েছে। এর ফলে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চরম মূলধন ও তারল্য সংকটে ভুগছে।
অনেক ব্যাংক গ্রাহকদের আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে, যা আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও আস্থার সংকট আরও গভীর করছে। এই সংকটের কারণে ব্যাংকগুলো সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় ঋণ সরবরাহে সক্ষম হচ্ছে না, ফলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের এই ব্যাংক লুটপাটের খেসারত শেষ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বাড়তি করের বোঝা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মাধ্যমে এর ভার বহন করতে হচ্ছে দেশের কোটি কোটি মানুষকে।
শ্রমের অন্যায্য মূল্য ও শ্রমজীবী মানুষের চরম শোষণ দেশে কর্মজীবী দরিদ্রের (Working Poor) সংখ্যা বাড়িয়ে তুলছে। দেশের পোশাক খাত, নির্মাণ শিল্প, কৃষি এবং অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত শ্রমিকরা দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলেও তাদের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য। একদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী, অন্যদিকে শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না। শ্রম বাজারের এই অন্যায্যতার কারণে কোটি কোটি মানুষ কঠোর পরিশ্রম করার পরেও শুধু বেঁচে থাকার ন্যূনতম খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে, কোনো রকম সঞ্চয় বা ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ তাদের থাকছে না।
সর্বোপরি, মূল সমস্যার কেন্দ্রে দাঁড়িয়েছে সর্বস্তরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চরম অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি, স্বচ্ছতার অভাবের পাশাপাশি ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ এবং অনিয়মের বিস্তার। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। যখন ব্যাংকলুট, নিয়োগ বাণিজ্য কিংবা ত্রাণ চুরির মতো বড় বড় অপরাধের কোনো সুষ্ঠু বিচার বা জবাবদিহিতা থাকে না, তখন তা দুর্নীতিকে আরও উৎসাহিত করে। এই প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহীনতা ও অপশাসনের প্রত্যক্ষ শিকার হচ্ছে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, যা সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধানকে এক বিপজ্জনক মাত্রায় নিয়ে গেছে।

