রাজধানী ঢাকায় নিরাপদ ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও ঝুঁকিসহনশীল নির্মাণ নিশ্চিত করতে নেওয়া গবেষণায় উঠে এসেছে, বালু নদের অববাহিকার বিস্তীর্ণ এলাকা ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পরিচালিত আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের (ইউআরপি) আওতায় পরিচালিত পরীক্ষায় দেখা গেছে, এ এলাকার প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার ভূমি ভূমিকম্পের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্বল মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের কাছাকাছি থাকায় এ এলাকায় নির্মিত আবাসন প্রকল্প ও বড় অবকাঠামো শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানীর বাইরের অংশে জলাশয় ও জলাভূমি ভরাট করে গত দুই দশকে যেসব আবাসন প্রকল্প ও বড় স্থাপনা তৈরি হয়েছে, সেগুলো তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজউকের ইউআরপি প্রকল্পের আওতায় ঢাকার চার শতাধিক স্থান থেকে মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, পুরান ঢাকার তুলনায় রাজধানীর সম্প্রসারিত এলাকাগুলোর ভূমি ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে এলাকাভেদে ঝুঁকির মাত্রায় পার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে বালু নদের অববাহিকায় নির্মিত অবকাঠামোগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
ইউআরপি প্রকল্পের পরিচালক ও রাজউকের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ড. আবদুল লতিফ হেলালী বলেন, ঢাকার মাটির অবস্থা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সবচেয়ে দুর্বল অবস্থা বালু নদের আশপাশের এলাকায়। এ অঞ্চলে নির্মিত অবকাঠামোগুলো মূলত পানির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তিনি বলেন, বনশ্রী থেকে আফতাবনগর, মাদানি এভিনিউ হয়ে বসুন্ধরা ৩০০ ফুট সড়ক ধরে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত পুরো এলাকাই ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। জলাভূমি ভরাট করে যেসব এলাকায় উন্নয়ন করা হয়েছে, সেগুলো ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে এখনো ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হয়নি। গত বছর যে বড় ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছিল, সেটির মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। কিন্তু ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে বালু ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রাজউকের ইউআরপি প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের চেয়ারম্যান ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারী। রাজউকের সংগৃহীত তথ্য ও পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে তিনি পৃথক গবেষণা করেন। তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনা প্লাটফর্ম স্প্রিংগার নেচার লিংকে প্রকাশিত হয়।
মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, রাজউকের পরীক্ষায় বালু নদের অববাহিকার প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, ভূমির গঠনগত কারণে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মূলত দুটি কারণে বাড়ে। প্রথমত, ভূগর্ভে নরম কাদামাটি বা আলগা বালির স্তর থাকলে ভূমিকম্পের কম্পনের তীব্রতা বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, আলগা বালির স্তরের সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কাছাকাছি থাকলে ভূমিকম্পের সময় মাটি ভার বহনের ক্ষমতা হারাতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে মাটি তরলীকরণ বলা হয়। এতে ভবন মাটির নিচে বসে যেতে পারে কিংবা হেলে পড়তে পারে। রাজউকের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বালু নদের অববাহিকার কিছু এলাকায় সাত মিটার পর্যন্ত আলগা বালির স্তর রয়েছে। এর নিচে রয়েছে প্রায় ৩৫ মিটার পর্যন্ত নরম কাদামাটি। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে সেখানে মাটি তরলীকরণ ও কম্পনের তীব্রতা বৃদ্ধি—দুই ধরনের ঝুঁকিই তৈরি হতে পারে।
বালু নদের অববাহিকার প্রায় ১২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা একসময় জলাশয় ও জলাভূমি ছিল। ঢাকার আগের পরিকল্পনাগুলোতে এ এলাকাকে সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে রাখার সুপারিশ করা হয়েছিল।
১৯৯৫ সালে প্রণীত ২০ বছর মেয়াদি ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যানে মোট পাঁচটি এলাকাকে সংরক্ষিত জলাধার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে তিনটি জলাধার ছিল বালু নদের অববাহিকার ওই এলাকায়। তবে পরবর্তী সময়ে এসব জলাধার ভরাট করে আবাসন ও অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে বলে রাজউকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
ঢাকার সর্বশেষ বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাতেও বালু নদের অববাহিকার আবাসন প্রকল্পগুলোকে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, এ এলাকায় ভবন নির্মাণে বিশেষ ধরনের ভিত্তি নকশা ব্যবহার করা প্রয়োজন।
রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও ড্যাপের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, বনশ্রী থেকে আবদুল্লাহপুর পর্যন্ত পুরো বালু নদের অববাহিকা আগে প্রাকৃতিক জলাধার ছিল। ভরাটের কারণে এসব এলাকা ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে পড়েছে। ড্যাপে বিষয়টি মানচিত্রের মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ঢাকার ভূমির গঠন ও ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করেন। গবেষণায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকার মাটি ও ভূপ্রকৃতির সঙ্গে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় বলা হয়, ঢাকার ভূমি প্রধানত দুই ধরনের। সদরঘাট থেকে গাজীপুরের মধুপুর পর্যন্ত বিস্তৃত অংশটি প্রাচীন লাল মাটির ভূমি। পুরান ঢাকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বিমানবন্দর, টঙ্গী, গাজীপুর ও সাভারের কিছু অংশ এ ধরনের তুলনামূলক শক্ত ভূমির অন্তর্ভুক্ত।
গবেষকদের মতে, এসব এলাকায় পাঁচ থেকে ১০ তলা ভবন নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রে গভীর ভিত্তির প্রয়োজন নাও হতে পারে।অন্যদিকে কেরানীগঞ্জ, হেমায়েতপুর, বালু নদের অববাহিকা ও নারায়ণগঞ্জের কিছু অংশ সাম্প্রতিক প্লাবন সমভূমির অন্তর্ভুক্ত। বন্যা ও বর্ষার পানির সঙ্গে আসা পলি জমে এসব ভূমি তৈরি হয়েছে। এ ধরনের এলাকায় ভবন নির্মাণে মাটির ধরন অনুযায়ী ৩০ থেকে ৪০ মিটার পর্যন্ত গভীর ভিত্তি প্রয়োজন হতে পারে। তবে যথাযথ ভিত্তি নির্মাণ করলেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না বলে গবেষকরা মনে করছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান বলেন, ঢাকার পুরনো অংশের ভূমি প্রায় ১৮ থেকে ২৫ লাখ বছর আগে গঠিত হয়েছে। শক্ত লাল কাদামাটি ও বালির স্তরের ওপর এ অংশের ভূমি তৈরি হওয়ায় এটি তুলনামূলক স্থিতিশীল।
তিনি বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশে এ ধরনের ভূমির পরিমাণ মাত্র ৮ শতাংশ। এসব এলাকায় পাঁচ থেকে ১০ তলা ভবন নির্মাণে সাধারণত গভীর ভিত্তির প্রয়োজন কম।
তবে ঢাকার সম্প্রসারিত অংশে জলাভূমি ও নিচু জমি ভরাট করে অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এসব এলাকায় প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে ভিত্তি নির্মাণ জরুরি। কিন্তু সঠিক নিয়মে ভিত্তি নির্মাণ করা হলেও দুর্বল মাটির কারণে ভূমিকম্পের সময় ভূমি বসে যেতে পারে। তখন ভবন অক্ষত থাকলেও মাটি নিচে নেমে ভিত্তি উন্মুক্ত হয়ে যেতে পারে কিংবা ভবন হেলে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

