ফেসবুক বা ইউটিউবে মাঝেমধ্যেই ঘুরেফিরে আসে ‘প্লাস্টিকের চাল’ কিংবা ‘নকল ডিম’ নিয়ে চাঞ্চল্যকর সব ভিডিও। কোথাও দেখা যায় আগুনে চাল পোড়ানো হচ্ছে, কোথাও আবার ডিমের কুসুম নিয়ে অদ্ভুত দাবি করা হচ্ছে। এসব দেখে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—এসব দাবির পেছনে বিজ্ঞানসম্মত কোনো ভিত্তি আছে কি?
এই লেখায় আন্তর্জাতিক গবেষণা, খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তদন্ত প্রতিবেদন এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে।
দুই হাজার এগারো সালের পর থেকেই বিভিন্ন দেশে ছড়াতে শুরু করে ‘প্লাস্টিকের চাল’ সংক্রান্ত দাবি। বলা হতে থাকে, কৃত্রিম উপাদান দিয়ে তৈরি চাল স্বাভাবিক চালের সঙ্গে মিশিয়ে বাজারজাত করা হচ্ছে। ধীরে ধীরে এই গুজব এশিয়া ও আফ্রিকার একাধিক দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
তবে বিভিন্ন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ পেয়ে যেসব নমুনা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করেছে, তার কোনোটিতেই প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি চালের অস্তিত্ব মেলেনি। হংকংয়ের খাদ্য নিরাপত্তাবিষয়ক একটি সংস্থা রাসায়নিক পরীক্ষা চালিয়ে জানিয়েছে, পরীক্ষিত নমুনাগুলো স্বাভাবিক চালই ছিল, কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রান্না করা চালের কিছু স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই এই বিভ্রান্তির কারণ। যেমন স্টার্চের প্রভাবে চাল হাতে গোল করে নেওয়া যায়, কিছু জাতের চাল রান্নার পরও তুলনামূলক শক্ত থাকে, আবার অতিরিক্ত শুকনো বা পুরোনো চালের গঠনও ভিন্ন রকম হতে পারে। এসব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যকেই অনেকে ভুলবশত প্লাস্টিকের লক্ষণ বলে ধরে নেন। এ ছাড়া অনলাইনে ভাইরাল হওয়া বেশ কিছু ভিডিও পরবর্তীতে সম্পাদিত বা বিভ্রান্তিকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
চালের মতো ‘প্লাস্টিকের ডিম’ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা ভিডিও প্রচার হয়ে আসছে। কিন্তু কোনো স্বীকৃত খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থা এখন পর্যন্ত ব্যাপক হারে প্লাস্টিকের ডিম বাজারজাত হওয়ার প্রমাণ দিতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা, নিম্নমানের বা দীর্ঘদিন সংরক্ষণে থাকা ডিমের সাদা অংশ ও কুসুমের গঠনে যে পরিবর্তন আসে, সেটিই অনেক সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করে।
সরাসরি ‘প্লাস্টিকের চাল-ডিম’ তৈরির প্রমাণ না থাকলেও একটি বাস্তব সমস্যা ঠিকই সামনে এসেছে—তা হলো মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিং—প্রতিটি ধাপেই অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা খাদ্যে মিশে যেতে পারে।
বাংলাদেশে পরিচালিত একটি গবেষণায়ও ডিমের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে ডিমগুলো নকল বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি—বরং এটি পরিবেশগত দূষণের একটি প্রতিফলন মাত্র।
খাদ্য জালিয়াতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্লাস্টিক দিয়ে চাল বা ডিম তৈরি করে আসল দামে বিক্রি করাটা বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয়। এ প্রসঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে জানান, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্লাস্টিকের কাঁচামালের দাম প্রকৃত চালের চেয়েও বেশি পড়ে। তাই শিল্প পর্যায়ে এ ধরনের ব্যাপক প্রতারণা বাস্তবসম্মত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও দেখে আতঙ্কিত না হওয়া, আগুনে পোড়ানো বা পানিতে ভাসিয়ে দেখার মতো ঘরোয়া পরীক্ষাকে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা না করা, সন্দেহজনক কিছু চোখে পড়লে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে অভিযোগ জানানো এবং সব সময় নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে খাদ্যপণ্য কেনার অভ্যাস গড়ে তোলার কথা বলছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, ‘প্লাস্টিকের চাল’ বা ‘প্লাস্টিকের ডিম’ ব্যাপকভাবে বাজারে বিক্রি হওয়ার দাবির পক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের কাঁচামাল, অস্বাস্থ্যকর উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ—এগুলোই বরং প্রকৃত ও জরুরি সমস্যা, যা নিয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন। অর্থাৎ ভিত্তিহীন আতঙ্কের বদলে দরকার তথ্যভিত্তিক সচেতনতা, কারণ গুজবের চেয়ে বাস্তব খাদ্য নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জই জনস্বাস্থ্যের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

