ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার পর জামানতি সম্পত্তি নিলামে বিক্রি হয়ে গেলে ঋণগ্রহীতা কী প্রতিকার পেতে পারেন; এই প্রশ্নটি বাংলাদেশের অর্থঋণ আদালত আইন সংক্রান্ত মামলাগুলোতে বারবার উঠে আসে। এ.টি.এম. আশরাফুল ইসলাম হেলাল বনাম বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য মামলা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নিলাম প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ ছাড়া এবং ক্রেতার নামে দলিল নিবন্ধন ও নামজারি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে রিট পিটিশনের মাধ্যমে নিলাম বাতিলের আবেদন সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়।
মামলার প্রেক্ষাপট
আবেদনকারী এ.টি.এম. আশরাফুল ইসলাম হেলাল ২০১৭ সালের ১৯ জুলাই তারিখের একটি মঞ্জুরিপত্রের মাধ্যমে রেসপনডেন্ট নং ৫ (ঋণদাতা ব্যাংক) থেকে ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ গ্রহণ করেন। কোভিড-১৯ এর কারণে আর্থিক সংকটের ফলে তিনি যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, ফলে তার বকেয়া দাঁড়ায় ৪২ লক্ষ ৮০ হাজার ৭৪৫ টাকায়।
এই বকেয়া আদায়ের লক্ষ্যে ব্যাংক অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ধারা ১২(৩) অনুযায়ী ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর একটি নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে । নিলাম সম্পন্ন হওয়ার প্রায় দশ মাস পর আবেদনকারী এই রিট পিটিশন দায়ের করেন। প্রাথমিকভাবে আদালত একটি রুল নিশি জারি করেন এবং কিছু অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ প্রদান করেন, যার মধ্যে ছিল তিন মাসের জন্য নিলাম প্রক্রিয়া স্থগিতাদেশ (তবে শর্ত থাকে যে আবেদনকারীকে ৯০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ করতে হবে, ব্যর্থ হলে রুল খারিজ বলে গণ্য হবে) এবং সম্পত্তির দখল ও অবস্থান সংক্রান্ত স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ। আদালত ব্যাংককে আবেদনকারীর সংশ্লিষ্ট আবেদনগুলো ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশও দেন।
পরবর্তীতে আবেদনকারী অভিযোগ করেন যে, তিনি অর্থ পরিশোধের চেষ্টা করলেও ব্যাংক তা গ্রহণ করছে না। এর প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ১৪ জুন আদালত ব্যাংককে তাৎক্ষণিকভাবে অর্থ গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থার আদেশ সময়ে সময়ে বর্ধিত হতে থাকে।
আবেদনকারীর পক্ষে যুক্তি
আবেদনকারীর পক্ষে অ্যাডভোকেট জনাব মোহাম্মদ আহসান যুক্তি দেন যে, তার মক্কেলকে বকেয়া পরিশোধের প্রকৃত সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং তিনি নিলাম বিজ্ঞপ্তিতে দাবিকৃত সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ করেছেন। তাই সম্পত্তিটি তার অনুকূলে পুনরুদ্ধার করে নিলাম ক্রেতাদের দরের টাকা ফেরত দেওয়া উচিত। তিনি আরও দাবি করেন যে, আবেদনকারীর নিলাম প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোনো জ্ঞান ছিল না এবং ব্যাংক ম্যানেজার ও নিলাম ক্রেতাদের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ তোলেন।
আপিল বিভাগের কয়েকটি সিদ্ধান্তের উদ্ধৃতি দিয়ে (১২ এলএম (এডি) ৬৮৩, ১২ এলএম (এডি) ২৪২, ১৮ এডিসি ৫৬৯, ১৭ এডিসি ৮৬৯) তিনি যুক্তি দেন যে, বৈধ নিলামের পরও ঋণগ্রহীতা নিলাম ক্রেতাকে “সোলাটিয়াম” (ক্ষতিপূরণ) প্রদানের মাধ্যমে সম্পত্তি ফেরত পেতে পারেন।
ব্যাংক ও নিলাম ক্রেতাদের পক্ষে যুক্তি
রেসপনডেন্ট নং ৫ (ব্যাংক)-এর পক্ষে অ্যাডভোকেট জনাব জ্যোতির্ময় বড়ুয়া দৃঢ়ভাবে আপত্তি জানান এবং বলেন যে, আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের একাধিক সিদ্ধান্তে ইতিমধ্যে স্থির হয়ে গেছে যে, অর্থঋণ আদালত আইনের ধারা ১২(৩) অনুযায়ী শুরু হওয়া নিলাম প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করার কোনো আইনি সুযোগ রিট পিটিশনের মাধ্যমে নেই। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নিলামের পূর্বে ঋণগ্রহীতাকে পূর্ব-নোটিশ দেওয়ার কোনো বিধান আইনে নেই।
তিনি ৬৩ ডিএলআর (এডি) ১৬০ উদ্ধৃত করে যুক্তি দেন যে, নিলাম বিক্রয়ে কোনো অবৈধতা বা অনিয়ম থাকলে তা ধারা ১২(৮)-এ নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।
রেসপনডেন্ট নং ৬ ও ৭ (নিলাম ক্রেতা)-এর পক্ষে অ্যাডভোকেট জনাব মাহবুবুর রহমান কিশোর যোগ করেন যে, বিক্রয় দলিল ইতিমধ্যে নিবন্ধিত এবং খতিয়ানে তাদের নাম নামজারি সম্পন্ন হয়ে গেছে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রি করেই এই সম্পত্তি ক্রয় করেছেন, তাই তাদের স্বত্বও সমানভাবে সুরক্ষিত হওয়া উচিত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ
আদালত মূলত দুটি স্তরে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। প্রথমত, রুল জারির আদেশে অন্তর্নিহিত শর্ত (default clause): আদালত লক্ষ্য করেন যে, প্রাথমিক রুল জারির আদেশেই একটি স্পষ্ট শর্ত ছিল যদি আবেদনকারী ৯০ দিনের মধ্যে সম্পূর্ণ বকেয়া পরিশোধ না করেন, তবে রুল স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ হয়ে যাবে এবং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহৃত হবে। এটি স্বীকৃত সত্য যে, আবেদনকারী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। যদিও ২০২৩ সালের ১৪ জুনের আদেশে ব্যাংককে অর্থ গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তবে সেই আদেশে পূর্বের শর্তসাপেক্ষ ফলাফল বাতিল বা সংশোধন করা হয়নি। ফলে আদালতের অভিমত অনুযায়ী, ৯০ দিন পার হওয়ার পরই রুল ও তার সাথে সম্পর্কিত স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থার আইনি অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, নিলাম প্রক্রিয়ার অনিয়ম সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের অনুপস্থিতি: আদালত রিট পিটিশনের সমস্ত গ্রাউন্ড পর্যালোচনা করে দেখেন যে, ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নিলাম প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট অবৈধতা বা অনিয়মের অভিযোগ আবেদনপত্রে উত্থাপিত হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে আদালত অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ধারা ১২(২), ১২(৩) ও ১২(৮)-এর বাধ্যতামূলক বিধান বিবেচনা করে সিদ্ধান্তে আসেন যে, এমন পরিস্থিতিতে রিট পিটিশন গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ আইনেই একটি বিকল্প ও পর্যাপ্ত প্রতিকার (সোলাটিয়াম দাবির মাধ্যমে) নির্ধারিত আছে।
চূড়ান্ত রায় ও নির্দেশনা
আদালত নিম্নলিখিত সিদ্ধান্ত প্রদান করেন:
১. রুলটি খরচ ছাড়াই খারিজ করা হয়।
২. রুল জারির সময় প্রদত্ত এবং পরবর্তীতে বারবার বর্ধিত স্থগিতাদেশ ও স্থিতাবস্থার আদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়।
৩. তবে ন্যায্যতার বিবেচনায়, রেসপনডেন্ট নং ৫ (ব্যাংক)কে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, আবেদনকারীর জমা করা অর্থের যে অংশ বকেয়া বাদে অবশিষ্ট থাকে, তা তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দিতে হবে।
আইনি তাৎপর্য ও পর্যবেক্ষণ
নিলাম প্রক্রিয়ায় সুনির্দিষ্ট অনিয়ম বা অবৈধতার অভিযোগ ছাড়া, এবং বিক্রয় দলিল নিবন্ধন ও নামজারি সম্পন্ন হয়ে যাওয়ার পর, রিট পিটিশনের মাধ্যমে নিলাম বাতিলের আবেদন গ্রহণযোগ্যতা হারায়। অর্থঋণ আদালত আইনের ধারা ১২(৮)-এ প্রদত্ত সোলাটিয়াম সংক্রান্ত বিকল্প প্রতিকারকে আদালত একটি “সমানভাবে কার্যকর প্রতিকার” হিসেবে বিবেচনা করেন, যা রিট এখতিয়ারের প্রয়োগকে সীমিত করে। এই সিদ্ধান্ত ৬৩ ডিএলআর (এডি) ১৬০ ও ৬৮ ডিএলআর ২৫৫-এ প্রতিষ্ঠিত নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, যা ঋণগ্রহীতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা—নিলাম সম্পন্ন হওয়ার পর দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট আইনি পদক্ষেপ না নিলে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে যেতে পারে।
তথ্যসূত্র ও উদ্ধৃত মামলাসমূহ
- অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ — ধারা ১২(২), ১২(৩), ১২(৮)
- বাংলাদেশের সংবিধান — অনুচ্ছেদ ১০২
- ১২ এলএম (এডি) ৬৮৩
- ১২ এলএম (এডি) ২৪২
- ১৮ এডিসি ৫৬৯
- ১৭ এডিসি ৮৬৯
- ৬৩ ডিএলআর (এডি) ১৬০
- ৬৮ ডিএলআর ২৫৫
- রিট পিটিশন নং ১২৬৭৫/২০২২, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (রায়: ১৬.০৭.২০২৬)

