টুথপেস্টের পর এবার দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়ার তথ্য দিয়েছেন গবেষকরা। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা এসব সাধারণ পণ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মেলার খবরে জনমনে দেখা দিয়েছে নতুন করে উদ্বেগ।
এর আগে বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার বিষয়টি সামনে আসার পরই এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবার পৃথক তিনটি গবেষণায় দুধ, চিনি ও সয়াবিন তেলেও এই ক্ষতিকর কণার উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু সয়াবিন তেল থেকেই একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ দৈনিক গড়ে প্রায় সতেরো থেকে আঠারোটি প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করছেন, যা বছরে দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ছয় হাজারে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক শিশুদের ক্ষেত্রে—একটি শিশু দৈনিক গড়ে প্রায় সাতাত্তরটি, অর্থাৎ বছরে প্রায় আটাশ হাজার কণা গ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে খাদ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশের তিনটি প্রধান পথ চিহ্নিত হয়েছে। প্রথমত, প্লাস্টিকের বোতল, প্যাকেট ও বস্তা থেকে সরাসরি খাবারে কণা মিশে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় কারখানার যন্ত্রপাতি, পাইপ ও কনভেয়ার বেল্ট ক্ষয়ে গিয়ে নতুন কণা তৈরি হচ্ছে। তৃতীয়ত, পরিবেশ দূষণের ফলে প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে তা পানি, মাটি ও বাতাসের মাধ্যমে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করছে।
গবেষকদের ভাষ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বড় অংশই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না। এই অব্যবস্থাপনার কারণেই বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে তা খাদ্যচক্রে ফিরে আসছে।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কাঁচা দুধ এবং সুপারশপের প্রক্রিয়াজাত দুধ সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালায়। ফলাফলে দেখা যায়, প্রতি দশ মিলিলিটার প্রক্রিয়াজাত দুধে গড়ে দেড়শোর বেশি এবং কাঁচা দুধে প্রায় নব্বইটির বেশি প্লাস্টিক কণা রয়েছে।
গবেষক দলের প্রধান জানান, খামার থেকে দুধ সংগ্রহের পর পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, কর্মীদের ব্যবহৃত গ্লাভস এবং সবশেষে প্যাকেজিং—প্রতিটি ধাপেই দুধ প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাপ্ত কণাগুলোর বেশিরভাগ স্বচ্ছ ও তন্তু আকৃতির, যার মধ্যে টেফলন, পিইটি, নাইলন ও পিভিসির মতো ক্ষতিকর পলিমারও শনাক্ত হয়েছে। বিশেষত চার থেকে দশ বছর বয়সী শিশুরা দুধের ওপর বেশি নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি বলে মনে করছেন গবেষকরা।
একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত পৃথক এক গবেষণায় ঢাকার খুচরা বাজার থেকে সংগ্রহ করা সাত ধরনের চিনি পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায়, ব্র্যান্ডেড চিনিতে প্রতি কেজিতে গড়ে তিনশর বেশি এবং খোলা চিনিতে চারশর কাছাকাছি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। যদিও পার্থক্য খুব বেশি নয়, তবে খোলা চিনিতে দূষণের মাত্রা তুলনামূলক বেশি বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।
সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য এসেছে সয়াবিন তেল নিয়ে করা গবেষণায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের যৌথ উদ্যোগে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে ষাটটি নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে দেখা গেছে, খোলা সয়াবিন তেলে প্রতি লিটারে গড়ে চল্লিশ থেকে সত্তর হাজার এবং বোতলজাত তেলে চুয়াল্লিশ থেকে চুয়ান্ন হাজারের মতো কণা রয়েছে।
গবেষণা দলের প্রধান জানান, শিল্প-কারখানার আধিক্য, টেক্সটাইল বা প্লাস্টিক কারখানার নিকটবর্তী অবস্থান এবং খোলা তেল বিক্রির সময় পাত্রের বারবার ব্যবহারই এই উচ্চ মাত্রার মূল কারণ। তিনি এ বিষয়ে আরও গবেষণা এবং সমাধানের উপায় খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে বোঝানো হয় এমন প্লাস্টিক কণা, যার আকার এক ন্যানোমিটার থেকে পাঁচ মিলিমিটারের মধ্যে। এর দুটি প্রধান উৎসের কথা বলছেন পরিবেশবিদরা। একটি হলো ইচ্ছাকৃতভাবে তৈরি ক্ষুদ্র কণা, যা প্রসাধনী পণ্যে ব্যবহার করা হয়। আরেকটি হলো বড় প্লাস্টিক পণ্য যেমন মোড়ক, খাবারের পাত্র, সিন্থেটিক কাপড় বা টায়ার ভেঙে তৈরি হওয়া কণা।
বৈশ্বিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু একটি বছরেই বিশ্বে প্রায় সাতাশ লাখ টন মাইক্রোপ্লাস্টিক পরিবেশে যুক্ত হয়েছিল, এবং আগামী দেড় দশকের মধ্যে এই পরিমাণ দ্বিগুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করার প্রভাব তাৎক্ষণিক নয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে তা মারাত্মক হতে পারে। ছোট আকারের কণা সরাসরি রক্তপ্রবাহে মিশে যেতে পারে বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের ধারণা, যার ফলে পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা, হরমোনজনিত সমস্যা, প্রদাহ ও কোষের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বজুড়ে একাধিক গবেষণায় মানবদেহের হাড়, রক্তনালি, এমনকি মস্তিষ্কেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্কে সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় বহুগুণ বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা এখনো নিশ্চিত নন যে নির্দিষ্ট মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে একজন স্বাস্থ্যবান মানুষের শরীরে প্রভাব ফেলে।
গবেষকরা পরামর্শ দিচ্ছেন, প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম করা বা প্লাস্টিক মোড়ানো টি-ব্যাগ গরম পানিতে ভেজানোর মতো অভ্যাস মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গমনের হার বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই এ ধরনের অভ্যাস এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
দেশের মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থাটি জানিয়েছে, পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা পণ্যকে অনিরাপদ বলা সমীচীন নয়। তারা ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বিস্তারিত তথ্য এবং পরীক্ষার পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে, পাশাপাশি উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকেও কাঁচামাল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, কোনো পণ্য মান পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টিকে কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্যের সমস্যা হিসেবে না দেখে সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবেই বিবেচনা করছে সরকার। খাদ্য ও পানির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই সমস্যা মোকাবিলায় সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সামগ্রিকভাবে দেখা যাচ্ছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং তা খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে প্রবেশ করে ফেলেছে। স্বাস্থ্যের ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও, ইতিমধ্যে প্রাপ্ত তথ্যই যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর মতো দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে বলেই মত সংশ্লিষ্টদের।

