কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে দেশে বাড়ছে ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের লক্ষ্য করে তৈরি করা ভুয়া ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠ। সাম্প্রতিক সময়ে এমন একাধিক ঘটনা সামনে এসেছে, যেখানে পরিচিত মুখ ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে ভুয়া, বিভ্রান্তিকর বা যৌন উত্তেজক কনটেন্ট। এই প্রেক্ষাপটে সরকার প্রণয়নাধীন জাতীয় কৃত্রিম জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা ২০২৬-২০৩০ এবং বিদ্যমান সাইবার আইনের কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন আসে এই আইনগুলো ডিপফেকের মতো নতুন প্রযুক্তিগত হুমকি মোকাবিলার জন্য কতটা যথেষ্ট? আসুন দেখি –
বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামো বিশ্লেষন
ডিপফেক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য বাংলাদেশে কোনো একক, সুনির্দিষ্ট আইন নেই। বরং একাধিক পুরোনো আইনের প্রাসঙ্গিক ধারা ব্যবহার করে এসব অপরাধের বিচার করার চেষ্টা করা হয়।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০
এই আইন মূলত শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌতুক-সংক্রান্ত অপরাধ ও শিশু নির্যাতন মোকাবিলার জন্য প্রণীত। ডিজিটাল বা প্রযুক্তিনির্ভর যৌন নিপীড়নের ধারণা তৈরির অনেক আগে এই আইন করা হয়েছিল বলে এতে ডিপফেক বা সিন্থেটিক মিডিয়ার মতো বিষয় সরাসরি অন্তর্ভুক্ত নেই।
পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২
এই আইনে পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও বিতরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ব্যক্তিগত অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ছবি বা ভিডিও প্রতিশোধমূলকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার (রিভেঞ্জ পর্ন) ঘটনায় সাধারণত এই আইনই প্রয়োগ করা হয়। তবে আইনটি রচিত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন “এআই-জেনারেটেড” ছবির ধারণা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, ফলে সত্যিকারের ধারণকৃত উপকরণ ও সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি সিন্থেটিক উপকরণের মধ্যে আইনি পার্থক্য নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যায়।
ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫
এআই নীতিমালার ভিত্তি হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে এই দুটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যেগুলো ব্যক্তির মুখচ্ছবি, কণ্ঠস্বর বা বায়োমেট্রিক উপাত্তের মতো স্পর্শকাতর তথ্যের সুরক্ষা ও সরকারি সংস্থার মধ্যে নিরাপদ উপাত্ত আদান-প্রদানের কাঠামো তৈরি করে। এগুলো ডিপফেক মোকাবিলার প্রত্যক্ষ আইন না হলেও, একজন ব্যক্তির মুখাবয়ব বা কণ্ঠস্বর সম্মতি ছাড়া ব্যবহার করে সিন্থেটিক কনটেন্ট তৈরির বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে আইনি ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
বিদ্যমান আইনের পর্যালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের কোনো প্রচলিত আইনে “ডিপফেক”, “এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট” বা “সিন্থেটিক মিডিয়া” শব্দগুলোর আইনি সংজ্ঞা নেই। দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, বাংলাদেশে গোপনে তোলা ছবি বা ভিডিও ছড়ানোর মতো অপরাধ এখনো সাইবার সুরক্ষা আইন বা পর্নোগ্রাফি আইনের মধ্যে বিচার করা হয়, অথচ যুক্তরাজ্য বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে যেভাবে “ইমেজ-বেইজড অ্যাবিউজ” নামে একটি সুনির্দিষ্ট, স্বতন্ত্র অপরাধের বিধান রয়েছে, বাংলাদেশে তেমন কিছু এখনো তৈরি হয়নি। ফলে প্রকৃত ঘটনা (যেমন গোপনে ধারণ করা ছবি) এবং সম্পূর্ণ কৃত্রিমভাবে তৈরি ছবি; দুটোকেই একই ধারায় বিচার করতে হয়।
দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে ডিপফেক যৌন উপকরণ তৈরি বা ছড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নিছক সংরক্ষণ বা দেখার কাজকেও পৃথক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যাতে চাহিদার দিকটিও নিরুৎসাহিত করা যায়। বাংলাদেশের আইনে অপরাধের কেন্দ্রবিন্দু মূলত তৈরি ও বিতরণের ওপর, দখল বা সংরক্ষণের ওপর নয়, ফলে বিতরণ নেটওয়ার্কের ভোক্তা পর্যায়ে জবাবদিহিতা তৈরি হয় না।
সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া ডিপফেক কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের TAKE IT DOWN Act-এর ধাঁচে কোনো “নোটিশ-অ্যান্ড-টেকডাউন” বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের আইনে স্পষ্টভাবে নেই। ভুক্তভোগীকে সাধারণত থানায় অভিযোগ করে গতানুগতিক আইনি প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে যেতে হয়, কিন্ত ক্ষতিকর কনটেন্ট ততক্ষণে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া, ডিপফেক শনাক্তকরণের জন্য প্রয়োজন ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম। থানা পর্যায়ে বা এমনকি সাইবার ট্রাইব্যুনালেও এ ধরনের কারিগরি সক্ষমতা এখনো সীমিত, ফলে অভিযোগ প্রমাণে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সাউথ কোরিয়ান মডেল
টেলিগ্রামভিত্তিক চ্যানেলে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক ডিপফেক যৌন হয়রানির ঘটনায় জনরোষের মুখে দক্ষিণ কোরিয়া ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের যৌন অপরাধ দমন আইন সংশোধন করে। দক্ষিণ কোরিয়া দেশ হিসেবে সবচেয়ে কঠোর ও ভুক্তভোগী ডিপফেক ঘটনা নিয়ে।
ডিপফেক যৌন উপকরণ তৈরি বা বিতরণে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ থেকে বাড়িয়ে সাত বছর করা হয়েছে, বিতরণের অভিপ্রায় প্রমাণের পুরোনো শর্তও তুলে দেওয়া হয়েছে (আর্টিকেল ১৪/২)। এছাড়া এ ধরনের ফাইল সংরক্ষণ, ক্রয় বা দেখার জন্যও তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা প্রায় ২২ হাজার ৬০০ ডলার সমমূল্যের জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ডিপফেইক ইমেজ বা ভিডিও ব্ল্যাকমেইলের কাজে ব্যবহৃত হলে, নূন্যতম ১ বছরের জেল এবং শিশুদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে মৃত্যুদন্ডের কথা বলা হয়েছে।
EU AI Act
ইইউর এআই আইনের ডিপফেককে সংজ্ঞায়িত করেছে এমন এআই-জেনারেটেড বা পরিবর্তিত ছবি, অডিও বা ভিডিও কনটেন্ট হিসেবে, যা কোনো বাস্তব ব্যক্তি, বস্তু, স্থান বা ঘটনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং মিথ্যাভাবে প্রকৃত বলে মনে হতে পারে। ২০২৬ সালের আগস্ট থেকে কার্যকর এই আইনে ডিপফেক তৈরিকারীদের স্পষ্ট, দৃশ্যমান লেবেল যুক্ত করে তা প্রকাশ করতে হবে যে কনটেন্টটি কৃত্রিমভাবে তৈরি তা দর্শক বুঝতে পারে।
Take me down ACT- যুক্তরাষ্ট্র
২০২৫ সালের মে মাসে স্বাক্ষরিত TAKE IT DOWN Act যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম ফেডারেল আইন, যা সম্মতি ছাড়া অন্তরঙ্গ ছবি বা “ডিজিটাল ফরজারি” (ডিপফেক) প্রকাশকে ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা করেছে। এই আইনে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে অভিযোগ পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আপত্তিকর কনটেন্ট অপসারণের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। এই আইনে শিশুদের প্রতি হয়ে যাওয়া অফেন্স কে আরো কঠোর ভাবে দমন করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত জাতীয় এআই নীতি খসড়ায় কী কী আছে?
২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি তথ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে “বাংলাদেশ জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নীতিমালা ২০২৬-২০৩০” এর হালনাগাদ খসড়া প্রকাশ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, যা জনমত গ্রহণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে আইসিটি বিভাগ প্রথম যে খসড়াটি প্রকাশ করেছিল, তা মূলত সেবামুখী দৃষ্টিভঙ্গিতে রচিত ছিল।
খসড়া নীতিমালার উল্লেখযোগ্য দিক হলো নীতিমালায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ডিপফেক, এআই-সৃষ্ট অপতথ্য, প্রযুক্তির মাধ্যমে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ও শিশু শোষণের মতো অপরাধ মোকাবিলায় ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হবে, যা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে।
নীতিমালাটি OECD AI Principles, ইউনেস্কোর AI Ethichs, কাউন্সিল অব ইউরোপ এআই ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন ও আসিয়ান এআই গাইডেন্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা হয়েছে।
খসড়া নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকে যায়, এই বিধান গুলা কতটা কার্যকর হবে? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলছে প্রতিটি ধাপে নাগরিক অধিকার সংস্থা, বিশেষজ্ঞ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা না গেলে এতে ডিপফেক-বিরোধী বিধানগুলো বাস্তব কার্যকরিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।
কীভাবে আরও কার্যকর কাঠামো দাঁড় করানো যায়?
১/ প্রস্তাবিত এআই আইনে বা সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের সংশোধনীতে ডিপফেক, এআই-জেনারেটেড কনটেন্ট ও সিন্থেটিক ডিয়ার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করা প্রয়োজন। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দখল ও দেখাকেও অপরাধের আওতায় আনা যেতে পারে।
২/ প্ল্যাটফর্ম দায়বদ্ধতা ও দ্রুত অপসারণ বাধ্যবাধকতাকে বিবেচনায় রেখে যুক্তরাষ্ট্রের TAKE IT DOWN Act-এর আদলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে অভিযোগকৃত কনটেন্ট অপসারণের আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেতে পারে।
৩/ বিশেষায়িত তদন্ত ইউনিট ও ফরেনসিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে পুলিশের সাইবার ইউনিট ও সাইবার ট্রাইব্যুনালে ডিপফেক শনাক্তকরণের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করতে হবে।
৪/ ইইউর এআই আইনের আদলে বাংলাদেশেও এআই-জেনারেটেড কনটেন্টের জন্য দৃশ্যমান লেবেলিং বাধ্যবাধকতা করা এবং জেনারেটিভ এআই টুল সরবরাহকারীদের জন্য “সেফটি বাই ডিজাইন” মানদণ্ড প্রবর্তন করা যেতে পারে।
৫/ শিশু ভুক্তভোগী বা শিশু অপরাধীর ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের থেকে পৃথক, শিশু-বান্ধব তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। শিশু কেন্দ্রিক অফেন্সকে জিরো-টলারেন্স নীতির আওতায় আনা জরুরি।

