ইউরোপে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ন্যাটোর কোনো একটি সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সীমিত পরিসরে হামলা চালিয়ে জোটের প্রতিক্রিয়া যাচাই করার চেষ্টা করতে পারে বলে সতর্ক করেছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। সম্ভাব্য পদক্ষেপের মধ্যে সীমিত স্থল অভিযান থেকে শুরু করে সাইবার হামলা কিংবা অন্য ধরনের অস্থিতিশীলতামূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ধারণা, চলতি শরৎ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
এই মূল্যায়নকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে, কারণ এর মাধ্যমে রাশিয়া-ন্যাটো সংঘাতের সম্ভাবনা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের আগের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ধারণা ছিল, ইউক্রেনের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে রাশিয়া জড়িয়ে থাকায় রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি হামলার ঝুঁকি নেবেন না।
এখন সেই হিসাবের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
কী ধরনের হামলার আশঙ্কা
গোয়েন্দা মূল্যায়নে সরাসরি বড় আকারের যুদ্ধের পাশাপাশি সীমিত ও পরোক্ষ হামলার সম্ভাবনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার হামলা, পরিচয় গোপন রাখা কোনো গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ এবং ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে সীমিত পরিসরে স্থল অভিযান।
সরাসরি ভূখণ্ড দখলের মতো বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম বলে মনে করা হচ্ছে। তবে সময়ের সঙ্গে এই ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
এ ধরনের পদক্ষেপের পেছনে রাশিয়ার সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে ন্যাটোর রাজনৈতিক ঐক্য ও সামরিক প্রতিক্রিয়া যাচাই করা। কোনো সদস্যদেশ আক্রান্ত হলে জোটের অন্য সদস্যরা কত দ্রুত এবং কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানায়, সেটিও মস্কোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা হতে পারে।
গত মাসে ইউরোপীয় ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সম্ভাব্য কিছু রুশ পরিকল্পনার কথা সামনে এসেছিল। এর মধ্যে পোল্যান্ডের ভূখণ্ডে সশস্ত্র উসকানি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ক্ষেপণাস্ত্র বা চালকবিহীন আকাশযান হামলা এবং ইউক্রেনের ওপর দায় চাপানোর উদ্দেশ্যে সাজানো হামলার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল।
গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধের পঞ্চম বার্ষিকীর আগে ন্যাটোর সদস্যদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা এবং ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়া থেকে পশ্চিমা দেশগুলোকে নিরুৎসাহিত করা রাশিয়ার সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।
পূর্ব ইউরোপে উদ্বেগ বাড়ছে
ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে রুশ হুমকি নিয়ে কয়েক মাস ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলের দেশগুলোর নেতারা। তাদের আশঙ্কা, ইউক্রেন যুদ্ধ চললেও রাশিয়া একই সঙ্গে ন্যাটোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো যাচাই করতে পারে।
বৃহস্পতিবার লিথুয়ানিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীও সতর্ক করে বলেছেন, ক্রেমলিন ইউক্রেনের তৈরি চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করে বাল্টিক অঞ্চলে হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হতে পারে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন তৈরি করা এবং ইউক্রেনের প্রতি পশ্চিমা সমর্থন দুর্বল করে দেওয়া।
এর আগে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংও রাশিয়ার সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, যুক্তরাজ্যকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার যেসব উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আসছে, সেগুলো আরও বড় ধরনের সংকটের কেবল দৃশ্যমান অংশ হতে পারে।
গত মাসে প্লাইমাউথের কাছাকাছি ইংলিশ চ্যানেলে রুশ যুদ্ধজাহাজ নেউস্ত্রাশিমির গোলাবর্ষণের মহড়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শুধু সামরিক প্রদর্শন নয়, বরং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ারও একটি উপায়।
পোল্যান্ড ও বাল্টিক দেশগুলোকে বিশেষ সতর্কতা
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পোল্যান্ড এবং তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্রকে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করেছে। তাদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই রুশ নেতৃত্ব ন্যাটোর বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিতে পারে।
চলতি বছরের শুরুতেই এ বিষয়ে মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে পরিবর্তন আসে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে না পারা এবং পশ্চিমা বিশ্বের চাপ পুতিনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
তবে এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। রাশিয়া যদি ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে সেটি বড় ধরনের সংঘাতের দিকে গড়াতে পারে। কারণ ন্যাটোর যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় একটি সদস্যদেশের ওপর আক্রমণকে পুরো জোটের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে।
এই কারণেই বিশ্লেষকদের কাছে সরাসরি স্থল হামলার চেয়ে পরোক্ষ ও সীমিত আক্রমণের আশঙ্কা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাইবার হামলা, অন্তর্ঘাত, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কিংবা পরিচয় গোপন রাখা কোনো গোষ্ঠীর মাধ্যমে হামলা চালালে সরাসরি সামরিক সংঘাতে না গিয়েও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা করা সম্ভব হতে পারে।
ন্যাটোও প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে
ন্যাটোর সাম্প্রতিক গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, পুতিন সামরিক শক্তি দিয়ে পুরো ন্যাটো জোটকে পরাজিত করাকে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেন। ফলে সরাসরি বড় যুদ্ধের পরিবর্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অন্তর্ঘাত এবং বিভিন্ন ধরনের মিশ্র কৌশল ব্যবহারের দিকে রাশিয়া বেশি মনোযোগ দিতে পারে।
ন্যাটোর পক্ষ থেকে অবশ্য সম্ভাব্য হুমকির বিষয়ে প্রস্তুত থাকার কথা জানানো হয়েছে। জোটের মুখপাত্র কর্নেল মার্টিন ও’ডনেল বলেছেন, প্রয়োজন হলে প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষার জন্য ন্যাটো প্রস্তুত রয়েছে। সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই জোটটি প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানান তিনি।
অর্থাৎ একদিকে রাশিয়ার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, অন্যদিকে ন্যাটোও নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। এই পারস্পরিক প্রস্তুতি ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
জার্মান বিমানবন্দরের ঘটনাও বাড়িয়েছে উদ্বেগ
রাশিয়াকে ঘিরে নতুন উদ্বেগের মধ্যে জার্মানিতেও একটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। গত মঙ্গলবার লাইপজিগ/হালে বিমানবন্দরে একটি ইউক্রেনীয় কার্গো বিমানের পাশে বিস্ফোরক বহনকারী একটি চালকবিহীন আকাশযান পাওয়া যায়।
আকাশযানটির উৎস এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। তবে জার্মানির কয়েকজন রাজনীতিক এ ঘটনায় মস্কোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন।
মধ্যরাতের কিছু আগে অ্যান্টনভ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানের কাছে আকাশযানটি শনাক্ত করা হয়। এতে সেমটেক্স নামের শক্তিশালী বিস্ফোরক ছিল বলে জানা গেছে। ঘটনার পর বার্লিন কর্তৃপক্ষ সন্ত্রাসবিরোধী তদন্ত শুরু করে এবং বিমানবন্দরটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়।
পূর্ব জার্মানির এই বিমানবন্দরটি সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। জার্মান সেনাবাহিনী ও ন্যাটোর মিত্রদেশগুলোর সামরিক সরঞ্জাম পরিবহনে বিমানবন্দরটি ব্যবহৃত হয়। অ্যান্টনভের বড় আকারের পরিবহন বিমানও এখানে অবস্থান করে। ন্যাটো জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত।
সীমান্তে একের পর এক ঘটনা
এর আগেও বাল্টিক অঞ্চলে রাশিয়া-সম্পর্কিত নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত মে মাসে ভিলনিয়াসের দিকে এগিয়ে আসা একটি আক্রমণকারী চালকবিহীন আকাশযান ঠেকাতে ন্যাটোর যুদ্ধবিমান আকাশে ওঠে। ওই ঘটনার পর লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে নিরাপদ ভূগর্ভস্থ আশ্রয়ে যেতে হয়েছিল।
গত মাসে পোল্যান্ডের একটি গ্রামের কাছেও একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বস্ত হয়। ন্যাটো এ ঘটনায় রাশিয়ার বিরুদ্ধে বেপরোয়া হামলার অভিযোগ তোলে।
ইউক্রেন সীমান্ত থেকে প্রায় ৬০ মাইল দূরে টারনাওয়া-কলোনিয়া গ্রামের কাছে ক্ষেপণাস্ত্রটি আঘাত হানে। এটিকে রাশিয়ার কেএইচ-১০১ ক্ষেপণাস্ত্র বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণে প্রায় ১০ মিটার এলাকাজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বড় যুদ্ধের চেয়ে ‘ধূসর অঞ্চলের’ সংঘাতই বড় উদ্বেগ
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখনই রাশিয়া-ন্যাটো পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়। বরং এমন কর্মকাণ্ড, যেগুলো সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই একটি দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে, সেগুলোই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাইবার হামলা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নাশকতা, সীমান্তে সীমিত অনুপ্রবেশ, চালকবিহীন আকাশযানের ব্যবহার কিংবা রাজনৈতিক বিভাজন তৈরির প্রচেষ্টা—এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাশিয়া ন্যাটোর ঐক্য পরীক্ষা করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য ধরে রাখা। কারণ একটি সীমিত হামলার জবাবে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া বড় সংঘাত তৈরি করতে পারে, আবার দুর্বল প্রতিক্রিয়া দেখালে তা ভবিষ্যতে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপের উৎসাহ হিসেবে কাজ করতে পারে।
তাই আগামী কয়েক বছর ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। রাশিয়া সরাসরি সামরিক সংঘাতের পথে যাবে, নাকি সীমিত ও পরোক্ষ পদক্ষেপের মাধ্যমে ন্যাটোর সক্ষমতা পরীক্ষা করবে—এখন সেই প্রশ্নই সামনে। আর মার্কিন গোয়েন্দাদের সাম্প্রতিক সতর্কতা বলছে, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ইউরোপকে এখন থেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।

