একটি ব্যাংক যদি কাউকে ১০ লাখ টাকা ঋণ দেয়, তাহলে কি সেই টাকা আগে কোথাও ছাপা হয়েছিল? উত্তরটা অনেকের জন্যই চমকপ্রদ না, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে টাকার বড় অংশ তৈরি হয় ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সময়। আর এখানেই ‘টাকা ছাপানো’ আর ‘টাকা তৈরি’র মধ্যে বড় পার্থক্য।
যে টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক তৈরি করে
সহজ করে বললে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৈরি টাকা হলো সেন্ট্রাল ব্যাংক মানি। এর প্রধান দুটি রূপ মানুষের হাতে থাকা নোট এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা রিজার্ভ। অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক যখন নতুন নোট ইস্যু করে বা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় রিজার্ভ বাড়ায়, তখন সেটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ তৈরির অংশ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থাতেও এই দুই স্তরের কাঠামোই প্রচলিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভিত্তি তৈরি করে, আর তার ওপর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আমানতভিত্তিক অর্থ তৈরি করে।
কিন্তু এখানেই একটি প্রচলিত ভুল ধারণা আছে। আমরা ভাবি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১০০ টাকা ছাপল, তারপর ব্যাংক সেটি পাঁচবার ঋণ দিয়ে ৫০০ টাকা বানিয়ে ফেলল। বাস্তব ব্যাংকিং ব্যবস্থা এতটা সরল নয়। ‘মানি মাল্টিপ্লায়ার’ মূলত অর্থনীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থের তুলনায় মোট অর্থের পরিমাণ কত তার একটি অনুপাত। এটি এমন কোনো যন্ত্র নয়, যেখানে ১০০ টাকা ঢুকিয়ে দিলে নিশ্চিতভাবে ৫০০ টাকা বের হয়ে আসবে। ব্যাংক ঋণ দেওয়ার সময় নতুন আমানত তৈরি করে এটাই আধুনিক অর্থ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।
তাহলে ব্যাংক ঋণ দিলেই নতুন টাকা আসে কীভাবে?
ধরুন, আপনি একটি ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা ব্যবসায়িক ঋণ নিলেন। ব্যাংক সাধারণত তার ভল্ট থেকে ১০ লাখ টাকা এনে আপনার হাতে দেয় না। বরং আপনার হিসাবে ১০ লাখ টাকা জমা করে। আপনার কাছে সেটি নতুন টাকা আপনি সেই টাকা দিয়ে পণ্য কিনবেন, কর্মীদের বেতন দেবেন কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের বিল পরিশোধ করবেন। অর্থাৎ ব্যাংকের হিসাবে আপনার ১০ লাখ টাকার ডিপোজিট তৈরি হলো, একই সঙ্গে ব্যাংকের হিসাবে আপনার কাছে ১০ লাখ টাকার ঋণও তৈরি হলো।
এই জায়গাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক শুধু আগের আমানত অন্যকে ধার দেয় এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যাংক নতুন ডিপোজিট তৈরি করতে পারে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও ব্যাখ্যা করেছে, অধিকাংশ অর্থ বাণিজ্যিক ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে তৈরি হয় এবং ঋণ পরিশোধ হলে সেই আমানতভিত্তিক অর্থও কমে যায়। অর্থাৎ ব্যাংক টাকা তৈরি করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে সেই টাকা ধ্বংসও করতে পারে।
একটু থামুন এখানে একটি মজার বিষয় আছে। ব্যাংক টাকা তৈরি করতে পারে মানেই ব্যাংক ইচ্ছামতো টাকা বানাতে পারে না। ঋণগ্রহীতার চাহিদা, ব্যাংকের মূলধন, তারল্য, ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রক বিধি, সুদের হার এবং ঋণ ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সবকিছুই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান তথ্যেও এর বাস্তব উদাহরণ দেখা যায়। মার্চ ২০২৬-এ দেশের বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, যেখানে একই সময়ে মোট ডিপোজিট ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ ব্যাংকের কাছে অর্থ থাকলেই তা ঋণে পরিণত হচ্ছে না।
বাংলাদেশের হিসাবে ‘১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা’ কথাটা কোথা থেকে আসে?
এখানেই আসে মানি মাল্টিপ্লায়ার। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ ২০২৬-এ দেশের মানি মাল্টিপ্লায়ার ছিল ৫ দশমিক ২৭। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় মাপা মোট অর্থের পরিমাণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ মানির প্রায় ৫ দশমিক ২৭ গুণ ছিল। এর আগের বছরের একই সময়ে অনুপাতটি ছিল ৫ দশমিক ২৫।
তাই কেউ যদি বলেন, ‘১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার অর্থ তৈরি হয়েছে’, সেটি একটি অনুপাত বোঝানোর উদাহরণ হিসেবে মোটামুটি ঠিক। কিন্তু এটাকে এমনভাবে বোঝানো ঠিক নয় যে বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ টাকা ছাপল এবং বাণিজ্যিক ব্যাংক বাধ্যতামূলকভাবে সেটিকে ৫০০ টাকায় পরিণত করল। কারণ বাস্তবে মানি মাল্টিপ্লায়ার অনেকগুলো ব্যাংকিং সিদ্ধান্ত ও মানুষের আচরণের ফল। বাংলাদেশ ব্যাংকের আগের মুদ্রানীতির তথ্যেও দেখা যায়, FY26-এর জন্য মানি মাল্টিপ্লায়ার ৫ দশমিক ২৯ ধরে নেওয়া হয়েছিল; পরবর্তী সময়ে এপ্রিল ২০২৬-এ তা ৫ দশমিক ৩৮-এ দাঁড়ায়।
এ কারণেই ‘১০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা’কে একটি হিসাবের ছবি হিসেবে দেখা ভালো, টাকা তৈরির সরাসরি মেশিন হিসেবে নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই অনুপাত স্থির নয়। ব্যাংক কতটা ঋণ দিচ্ছে, মানুষ কতটা নগদ হাতে রাখছে, ব্যাংকের রিজার্ভ কত, ঋণের চাহিদা কেমন এসব পরিবর্তনের সঙ্গে অনুপাতও বদলায়।
তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ শতাংশ নীতি সুদ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
এখানেই পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের জায়গাটা আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি প্রতিটি ব্যাংককে কত টাকা ঋণ দিতে হবে তা ঠিক করে না। বরং নীতি সুদ, তারল্য ব্যবস্থাপনা, রিজার্ভ সংক্রান্ত নিয়মসহ বিভিন্ন উপায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থার অর্থের দাম ও ঋণপ্রবাহকে প্রভাবিত করে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতি সুদহার ১০ শতাংশ, আর প্রচলিত ব্যাংকের জন্য সিআরআর ৪ শতাংশ।
সুদের হার বেশি হলে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। ফলে ব্যবসা বা ভোক্তার ঋণের চাহিদা কমতে পারে, ব্যাংকের নতুন ঋণ দেওয়ার গতিও কমে। উল্টো দিকে সুদের হার কমলে ঋণের চাহিদা বাড়তে পারে এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নতুন ডিপোজিট তৈরির গতি বাড়ার সুযোগ থাকে। তবে এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকিও জড়িত। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ শুধু ‘টাকা বাড়ানো’ নয়; অর্থের প্রবাহ কতটা দ্রুত বাড়বে, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করা।
বর্তমান বাংলাদেশের চিত্রটি বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ। এপ্রিল ২০২৬-এ দেশের ব্রড মানি বা এম২-এর প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ৪ শতাংশ, কিন্তু বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, উচ্চ খেলাপি ঋণ, অনিশ্চয়তা ও দুর্বল ঋণচাহিদা ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা ও আগ্রহকে প্রভাবিত করছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা উৎপাদনশীল ঋণে কতটা যাচ্ছে সেটিই বড় প্রশ্ন।
টাকা তৈরি হলে কি সম্পদও তৈরি হয়?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি হওয়ার সুযোগ। ব্যাংক ১০ লাখ টাকার ডিপোজিট তৈরি করলেই দেশের সম্পদ ১০ লাখ টাকা বেড়ে গেল এমন নয়। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে, কিন্তু সেই অর্থ দিয়ে যদি একটি কারখানা তৈরি হয়, উৎপাদন বাড়ে, কর্মসংস্থান হয়, তখন অর্থনীতির বাস্তব সক্ষমতাও বাড়তে পারে। আবার একই টাকা যদি শুধু জমির দাম, শেয়ারবাজার বা অন্য কোনো সম্পদের দাম বাড়ানোর পেছনে যায়, তাহলে অর্থের পরিমাণ বাড়লেও উৎপাদন একই হারে না-ও বাড়তে পারে।
আর যদি ব্যাংকের তৈরি টাকা দিয়ে চাহিদা দ্রুত বাড়ে কিন্তু পণ্য ও সেবার সরবরাহ সেই হারে না বাড়ে, তখন মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে প্রশ্নটি শুধু ‘কত টাকা আছে’ নয়; টাকাটা কোথায় যাচ্ছে এবং তার বিপরীতে কত পণ্য-সেবা তৈরি হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আর ঋণ শোধ করলে সেই টাকা যায় কোথায়?
এখানে আবার গল্পটা উল্টো দিকে ঘোরে। আপনি ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা ঋণ নিলেন এবং কয়েক বছর পর পুরো মূলধন পরিশোধ করলেন। ঋণ পরিশোধের সঙ্গে আপনার ব্যাংক ডিপোজিট কমে এবং ব্যাংকের ঋণসম্পদও কমে। ফলে আগে যে আমানতভিত্তিক অর্থ তৈরি হয়েছিল, তার একটি অংশ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে যায়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে এই বিপরীত প্রক্রিয়াটিকে অর্থ সৃষ্টির ‘উল্টো দিক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে।
তাহলে শেষ পর্যন্ত ‘টাকা ছাপানো’ আর ‘টাকা তৈরি’ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক তৈরি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টাকা নোট ও ব্যাংক রিজার্ভ। আর বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে তৈরি করে অর্থনীতিতে ব্যবহৃত ডিপোজিট মানি। এই দুই স্তর একসঙ্গে কাজ করেই আধুনিক অর্থব্যবস্থা চালায়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থায় এটিকে দুই-স্তরবিশিষ্ট মুদ্রাব্যবস্থা বলা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরো ব্যবস্থার ভিত্তি ও আস্থার জায়গা তৈরি করে, আর বাণিজ্যিক ব্যাংক সেই ব্যবস্থার ওপর ঋণ ও আমানতের মাধ্যমে অর্থের বড় অংশ তৈরি করে।
শেষ পর্যন্ত তাই প্রশ্নটা ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কত টাকা ছাপল?’ এখানেই থেমে গেলে পুরো ছবিটা দেখা হয় না। বরং দেখতে হবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ কতটা বাড়ল, ব্যাংকগুলো কতটা নতুন ঋণ দিল, সেই ঋণ থেকে কতটা নতুন ডিপোজিট তৈরি হলো এবং সেই টাকা গিয়ে অর্থনীতিতে কী তৈরি করল। কারণ অর্থনীতিতে টাকার পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু টাকার গতি, ব্যবহার এবং তার বিপরীতে তৈরি হওয়া বাস্তব পণ্য-সেবাই শেষ পর্যন্ত গল্পের আসল অংশ।

