দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার অব্যবহৃত জমিকে নতুন করে কাজে লাগাতে অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকার ডেমরায় অবস্থিত দুটি বন্ধ পাটকল এবং কুষ্টিয়ার একটি চিনিকলের জমিতে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বছরের পর বছর অলস পড়ে থাকা শিল্প সম্পদকে উৎপাদনশীল খাতে ফিরিয়ে আনা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। চলতি মাসে কর্তৃপক্ষের গভর্নিং বোর্ডের সভায় এ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের জমি হস্তান্তরের মাধ্যমে সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের কার্যক্রম শুরু হবে।
লোকসানের কারণে ২০০০ সাল থেকে বন্ধ থাকা ডেমরার দুটি পাটকল পঞ্চাশের দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের অধীনে আনা হয়। দুই কারখানা মিলিয়ে মোট জমির পরিমাণ ১৩৩ একরের মতো, যা এখন নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ আশা করছে, দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত এই জমি শিগগিরই উৎপাদন ও বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে।
কুষ্টিয়া সুগার মিলসের প্রায় ২২০ একর জমিতেও একই ধরনের অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ষাটের দশকে প্রতিষ্ঠিত এই মিলটি শুরুর দিকে লাভজনক থাকলেও নব্বইয়ের দশক থেকে ধারাবাহিক লোকসানের মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালে উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। মিলটির শত কোটি টাকা মূল্যের যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে পড়ছে। পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবার এই জমিতেই অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার সিদ্ধান্ত নিল সরকার।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জমি হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও কাজ চলছে এবং এক্ষেত্রে আদমজী পাটকলের অভিজ্ঞতাকে মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তার ভাষায়, সরকার আগে এসব বন্ধ মিলের সব বকেয়া দায়দেনা মিটিয়ে তারপর জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় যেতে চায়, ঠিক যেভাবে আদমজীর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল।
কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল ভবিষ্যতে একটি একক বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত হতে পারে। সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া একটি আইনের মাধ্যমে বিদ্যমান কয়েকটি বিনিয়োগ-সংক্রান্ত সংস্থা বিলুপ্ত করে একটি একক সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান গঠনের পথ তৈরি হয়েছে। নতুন এই আইনে শিল্পাঞ্চল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান হস্তান্তরের বিধানও রাখা হয়েছে, যার ফলে ভবিষ্যতে এসব অর্থনৈতিক অঞ্চল একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
অব্যবহৃত শিল্প জমিকে উৎপাদনশীল কেন্দ্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলকে একটি সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করছে কর্তৃপক্ষ। স্বাধীনতার পর জাতীয়করণ হওয়া এই পাটকলটি আর্থিক লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে ক্রমাগত সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ২০০২ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৪ সালে এই জমি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয় এবং ২০০৬ সালে তা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
বর্তমানে প্রায় ২৯৩ একরের এই শিল্প এলাকায় মোট ২৭৬টি প্লটের মধ্যে ৪৭টিতে কারখানা সক্রিয়ভাবে চালু আছে। এ পর্যন্ত এখানে প্রায় সাড়ে আট শ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে এবং প্রায় ৭৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এখান থেকে পোশাক, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস, জুতা ও গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আদমজীর সফলতার আদলে নতুন এই তিন অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়িত হলে তা দেশের অব্যবহৃত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প সম্পদ ব্যবহারের একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। তবে সাফল্য নির্ভর করবে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো—সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ—কতটা সময়মতো নিশ্চিত করা যায়, তার ওপর।

