বাংলাদেশের ভোজ্যতেল ও পশুখাদ্য শিল্পের বড় একটি নির্ভরতা বিদেশি সরবরাহের ওপর। অথচ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় ও পতিত জমিতে সয়াবিন চাষ বাড়িয়ে সেই আমদানি নির্ভরতার একটি অংশ কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন কৃষি, শিল্প ও উন্নয়ন খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, সয়াবিনকে শুধু একটি কৃষিপণ্য হিসেবে না দেখে ভোজ্যতেল, পশুখাদ্য এবং মানুষের প্রোটিনের উৎস এই তিন দিক থেকে দেখলে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অনেক বড়।
বর্তমানে দেশের ভোজ্যতেলের প্রায় ৯৩ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এ খাতে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার ব্যয় হয় বলে আলোচনায় উঠে এসেছে। একই সঙ্গে পশুখাদ্য শিল্পের জন্য প্রতিবছর প্রায় ২৪ থেকে ২৮ লাখ টন সয়াবিন ও সয়াবিন মিল আমদানি করা হয়। বিপরীতে দেশে উৎপাদিত সয়াবিন দিয়ে জাতীয় চাহিদার মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। অর্থাৎ বাজার আছে, শিল্পের চাহিদাও আছে; ঘাটতিটা মূলত দেশীয় উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায়।
বাজার আছে, কিন্তু কৃষক কেন আরও বেশি সয়াবিন চাষ করবেন?
এই প্রশ্নের উত্তরই আসলে সয়াবিনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। শুধু আমদানি কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করলেই কৃষক সয়াবিন চাষে চলে আসবেন না। তাঁকে নিশ্চিত করতে হবে ভালো বীজ, যন্ত্রপাতি, ন্যায্য দাম এবং ফসল বিক্রির বাজার। সাম্প্রতিক এক গোলটেবিল আলোচনায় কৃষি ও শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, সয়াবিনের উৎপাদন বাড়াতে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও বীজ উৎপাদন, সংগ্রহ ও বাজার তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ করে কৃষকের সঙ্গে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সরাসরি সংযোগ থাকলে উৎপাদন বাড়ানোর ঝুঁকি কমবে।
দেশের বাস্তবতায় সয়াবিনের আরেকটি সুবিধা হলো, সব জমিতে এর চাষ করতে হবে না। বরং ধানের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা না করে পতিত, লবণাক্ততা-সহিষ্ণু বা উপকূলীয় এলাকার উপযোগী জমিকে কাজে লাগানো যেতে পারে। বাংলাদেশে জমির পরিমাণ সীমিত এবং অনেক এলাকায় বছরে একাধিক ফসল হয়। তাই সারা দেশে সয়াবিন ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে যেখানে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও কৃষি-পরিবেশগতভাবে উপযোগী, সেখানেই উৎপাদন বাড়ানো বেশি বাস্তবসম্মত।
সয়াবিন শুধু তেল নয়, বড় বাজার পশুখাদ্যেও
সয়াবিনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব এখানেই। এর দানা থেকে তেল পাওয়া যায়, আবার তেল নিষ্কাশনের পর পাওয়া সয়াবিন মিল পোলট্রি, মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে দেশীয় সয়াবিন উৎপাদন বাড়লে এর প্রভাব শুধু ভোজ্যতেলের বাজারে সীমাবদ্ধ থাকবে না; পশুখাদ্য শিল্পেও আমদানির ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশের খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ খাত যত বড় হচ্ছে, মানসম্মত প্রোটিনের চাহিদাও তত বাড়ছে। এই জায়গায় সয়াবিনের উৎপাদন বাড়ানো হলে একই ফসল থেকে খাদ্য ও খাদ্যশিল্প দুই বাজারের চাহিদা মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়। স্থানীয় জাতগুলোর কিছুতে প্রোটিনের পরিমাণ আমদানিকৃত সয়াবিনের তুলনায় বেশি হওয়ার দাবিও শিল্পসংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এসেছে। তবে এই সুবিধাকে কাজে লাগাতে হলে উৎপাদনের পর সঠিকভাবে শুকানো, সংরক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ উৎপাদন বাড়ালেই সমস্যা শেষ হবে না। সাম্প্রতিক মৌসুমের অভিজ্ঞতায় স্থানীয় সয়াবিন বীজের একটি অংশ ছত্রাক সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে। ফসল কাটার পর আর্দ্রতা বেশি থাকলে এমন সমস্যা বাড়তে পারে। তাই কৃষকের মাঠ থেকে কারখানা পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় শুকানো ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে ড্রায়ার, গুদাম ও মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা না থাকলে উৎপাদন বাড়িয়েও শিল্পের প্রয়োজনীয় মানের সয়াবিন সরবরাহ করা কঠিন হবে।
২৫ শতাংশ চাহিদা দেশেই মেটানো কি সম্ভব?
বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের সয়াবিনের চাহিদা প্রায় ১ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে বলে একটি পূর্বাভাস এসেছে। এর পুরোটা দেশে উৎপাদনের লক্ষ্যকে বাস্তবসম্মত মনে করছেন না তাঁরা। বরং ওই চাহিদার অন্তত ২৫ শতাংশ দেশীয় উৎপাদন থেকে পূরণ করা সম্ভব হতে পারে বলে মত এসেছে। এর অর্থ, লক্ষ্য হওয়া উচিত পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণতা নয়; বরং আমদানির ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে এমন একটি দেশীয় সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা, যা বাজারের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সামলাতে পারে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্রাজিল বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় সয়াবিন উৎপাদনকারী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি প্রতিযোগিতা করার মতো বিপুল জমি নেই। বাংলাদেশের শক্তি বরং উপকূলীয় ও পতিত জমির ব্যবহার, স্বল্পমেয়াদি জাত, যান্ত্রিক চাষ এবং স্থানীয় বাজারের কাছাকাছি উৎপাদন। ২০২৬-২৭ বিপণন বছরে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ এবং প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার টন উৎপাদনের পূর্বাভাস রয়েছে। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়ানোর জায়গা আছে, কিন্তু সেই বৃদ্ধিকে বাজারের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত আসল বিনিয়োগটা কোথায়?
সয়াবিনের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সবচেয়ে বেশি দরকার একটি পূর্ণাঙ্গ বাজারব্যবস্থা। কৃষক ভালো বীজ পাবেন, যন্ত্র দিয়ে কম খরচে চাষ করতে পারবেন, ফসল কাটার পর দ্রুত শুকাতে পারবেন এবং নিশ্চিত ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে পারবেন এই পুরো চেইন তৈরি না হলে শুধু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে খুব বেশি লাভ হবে না। কৃষকের অভিজ্ঞতাও বলছে, যান্ত্রিক বীজ বপনের মতো ব্যবস্থা শ্রম ও চাষের খরচ কমাতে পারে। অর্থাৎ প্রযুক্তি এখানে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর বিষয় নয়, কৃষকের লাভ ধরে রাখারও উপায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প। দেশীয় সয়াবিন উৎপাদন বাড়লে স্থানীয়ভাবে তেল ও সয়াবিন মিল উৎপাদনের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বড় পশুখাদ্য কোম্পানিগুলো যদি কৃষকের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মানের সয়াবিন কিনতে আগাম অর্থ, নির্ধারিত দাম বা ‘বাইব্যাক’ ব্যবস্থার মতো সুবিধা দেয়, তাহলে কৃষকের বাজারঝুঁকি কমবে। এতে কৃষক উৎপাদনে আগ্রহী হবেন এবং শিল্পও আমদানির বিকল্প হিসেবে স্থানীয় সরবরাহকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করতে পারবে।
সব মিলিয়ে সয়াবিন বাংলাদেশের জন্য রাতারাতি আমদানি বন্ধ করার কোনো সমাধান নয়। কিন্তু ভোজ্যতেল ও পশুখাদ্যের মতো বড় আমদানি বাজারে দেশীয় উৎপাদনের অংশ বাড়াতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষকের নতুন আয়ের সুযোগ তৈরি হবে, উপকূলীয় পতিত জমি কাজে লাগবে এবং দেশের প্রোটিন সরবরাহও শক্তিশালী হতে পারে। তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘বাংলাদেশ কত সয়াবিন উৎপাদন করবে’ তা নয়; বরং কৃষক থেকে তেলকল ও ফিড মিল পর্যন্ত পুরো বাজারটি কতটা কার্যকরভাবে তৈরি করা যায়, সেটিই ঠিক করবে সয়াবিন আমদানি নির্ভরতা কমানোর বাস্তব হাতিয়ার হতে পারবে কি না।

