চাকরি খোঁজার সময় বেতন কত এই প্রশ্নটি এখনও গুরুত্বপূর্ণ। তবে নতুন প্রজন্মের কাছে সেটিই আর একমাত্র প্রশ্ন নয়। কাজের সময় কতটা নমনীয়, ছুটি কেমন, বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ আছে কি না, শেখার সুযোগ কতটা এবং চাকরির বাইরে নিজের জন্য সময় থাকবে কি না এসবও এখন চাকরি বেছে নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছে। বিশ্বজুড়ে তরুণ কর্মীদের পছন্দের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের চাকরির বাজারেও ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলছে। তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের মতো উচ্চ যুব বেকারত্ব ও অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বাজারে তরুণদের কাছে বেতন এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; বরং বেতন, স্থিতিশীলতা ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য তিনটিকেই একসঙ্গে পাওয়ার চেষ্টা বাড়ছে।
আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেলয়েটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল জেন জি অ্যান্ড মিলেনিয়াল সার্ভেতে ৪৪টি দেশের ২২ হাজার ৫০০-এর বেশি তরুণের মতামত নেওয়া হয়েছে। এতে দেখা গেছে, জেন জি ও মিলেনিয়ালরা দ্রুত পদোন্নতির চেয়ে স্থির ও টেকসই ক্যারিয়ার অগ্রগতিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। জেন জির ৪৪ শতাংশ এবং মিলেনিয়ালের ৪৫ শতাংশ ধীর ও ধারাবাহিক ক্যারিয়ার অগ্রগতিকে পছন্দ করেন, যেখানে দ্রুত পদোন্নতিকে পছন্দ করেন যথাক্রমে ২৫ ও ২১ শতাংশ। একই সঙ্গে কাজের চাপ, মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্যও তাঁদের ক্যারিয়ার সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তরুণদের চাওয়া বদলালেও টাকার গুরুত্ব কমেনি
তবে বিষয়টিকে শুধু ‘তরুণেরা বেতনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না’ এভাবে দেখলে ভুল হবে। ডেলয়েটের ২০২৬ সালের জরিপ বরং উল্টো একটি বাস্তবতা দেখাচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় টানা পঞ্চম বছরের মতো জেন জি ও মিলেনিয়ালদের প্রধান উদ্বেগ। ৫৫ শতাংশ জেন জি এবং ৫২ শতাংশ মিলেনিয়াল জানিয়েছেন, আর্থিক পরিস্থিতির কারণে তাঁরা বিয়ে, পরিবার গঠন, উচ্চশিক্ষা বা ব্যবসা শুরুর মতো বড় সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ তরুণেরা ভালো কর্মপরিবেশ চান ঠিকই, কিন্তু সেই পছন্দের ভিত্তি তৈরি হচ্ছে আর্থিক নিরাপত্তার ওপর।
তাহলে পরিবর্তনটা কোথায়? পরিবর্তনটা হলো, একটি চাকরির মূল্য এখন শুধু মাসিক বেতনের অঙ্ক দিয়ে হিসাব করা হচ্ছে না। একই বেতনের দুটি চাকরির মধ্যে যদি একটিতে প্রতিদিন দীর্ঘ যাতায়াত, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ও অনিয়মিত ছুটি থাকে, আর অন্যটিতে তুলনামূলক নমনীয় সময়, শেখার সুযোগ ও ব্যক্তিজীবনের জন্য সময় থাকে অনেক তরুণ দ্বিতীয় চাকরিটিকে দীর্ঘমেয়াদে বেশি মূল্যবান মনে করছেন। ডেলয়েটের আগের বছরগুলোর গবেষণাতেও অর্থ, অর্থপূর্ণ কাজ এবং সুস্থতার মধ্যে ভারসাম্যকে তরুণদের ক্যারিয়ার পছন্দের গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের বাজারে কেন নমনীয় কাজের চাহিদা বাড়ছে
বাংলাদেশের বাস্তবতা অবশ্য উন্নত দেশের শ্রমবাজারের মতো নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৬ সালের বিশ্লেষণ বলছে, দেশে শ্রমবাজারে অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, স্ব-কর্মসংস্থান ও কম মজুরির সমস্যা এখনও বড়। তরুণদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি কঠিন। ২০২৫ সালে আইএলও জানিয়েছিল, বাংলাদেশে তরুণদের বেকারত্বের হার আনুমানিক ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের প্রায় ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণের বাইরে রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের তরুণদের কাছে নমনীয় কাজের আকর্ষণ থাকলেও চাকরি পাওয়ার সুযোগ এবং আয় নিশ্চিত করাই এখনও প্রথম বাস্তব চ্যালেঞ্জ।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ডিজিটাল কাজ, অনলাইন সেবা ও প্রকল্পভিত্তিক কাজের জায়গা তৈরি হচ্ছে। গ্রাফিকস ডিজাইন, কনটেন্ট তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা, সফটওয়্যার ও ওয়েবসেবা, অনলাইন টিউটরিং এবং বিভিন্ন ধরনের দূরবর্তী সেবা এসব কাজে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অফিসে সারাক্ষণ উপস্থিত থাকার প্রয়োজন কম হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের ডিজিটাল কাজবিষয়ক গবেষণাতেও গ্রাফিক ডিজাইন, অনুবাদ, প্রযুক্তিগত লেখা, কোডিং ও সফটওয়্যার উন্নয়নের মতো কাজকে অনলাইনভিত্তিক কাজের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আইএলওর গবেষণায় অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা কর্মীদের একটি অংশ কাজের নমনীয়তা ও বাড়ি থেকে কাজের সুযোগকে কাজ বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
শুধু ‘ফ্লেক্সিবল’ হলেই চাকরি ভালো নয়
তবে এখানেও একটি ফাঁদ আছে। নমনীয় কর্মঘণ্টা বা বাড়ি থেকে কাজের সুযোগ থাকলেই চাকরিটি ভালো এমন নিশ্চয়তা নেই। অনেক অনলাইন বা ফ্রিল্যান্স কাজ অনানুষ্ঠানিক হওয়ায় লিখিত চুক্তি, নির্দিষ্ট আয়, সামাজিক সুরক্ষা বা কর্মক্ষেত্রের অন্যান্য সুবিধা নাও থাকতে পারে। আইএলও বাংলাদেশের শ্রমবাজার নিয়ে সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে অনানুষ্ঠানিকতা ও স্ব-কর্মসংস্থানের বিস্তারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ফলে তরুণদের জন্য ‘স্বাধীনতা’ আর ‘নিরাপত্তা’ দুটির মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।
এ কারণে কনটেন্ট রাইটিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনা, গ্রাফিকস ডিজাইন, অনলাইন টিউটরিং, অডিও-ভিডিও কনটেন্ট, ডিজিটাল মার্কেটিং কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর সহায়তা এসব পেশাকে শুধু কম চাপের চাকরি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিটি কাজেই দক্ষতা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, ক্লায়েন্ট বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মান বজায় রাখার চাপ রয়েছে। পার্থক্যটা হলো, কিছু কাজে কাজের জায়গা ও সময় নিয়ে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা পাওয়া যায়। আর এই স্বাধীনতাই তরুণদের কাছে বাড়তি মূল্য তৈরি করছে।
অফিসের বাইরে সময়টাও এখন ক্যারিয়ারের অংশ
এই পরিবর্তনের আরেকটি দিক আরও গুরুত্বপূর্ণ তরুণেরা চাকরির বাইরে পাওয়া সময়কে শুধু অবসর হিসেবে দেখছেন না। কেউ নতুন প্রযুক্তি শিখছেন, কেউ ভাষা বা পেশাগত দক্ষতা বাড়াচ্ছেন, কেউ সৃজনশীল কাজ করছেন, আবার কেউ উচ্চশিক্ষা বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ডেলয়েটের ২০২৫ সালের জরিপে জেন জির ৭০ শতাংশ এবং মিলেনিয়ালের ৫৯ শতাংশ জানিয়েছিলেন, তাঁরা সপ্তাহে অন্তত একবার নিজেদের ক্যারিয়ার এগিয়ে নিতে নতুন দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করেন। জেন জির ৬৭ শতাংশ কর্মঘণ্টার বাইরেও দক্ষতা উন্নয়নে সময় দেন।
এখানেই ভবিষ্যৎ চাকরির বাজারের একটি বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। একজন কর্মী এখন শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য কত ঘণ্টা কাজ করেন, সেটি দিয়ে তাঁর উৎপাদনশীলতা বিচার করতে চাইছেন না; কাজের পাশাপাশি তিনি কতটা শিখতে পারছেন, নিজের দক্ষতা বাড়াতে পারছেন এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যারিয়ারের মূল্য বাড়াতে পারছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারের উপযোগী করতে দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। আইএলও বলছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে।
আগামী দিনের চাকরিতে জিতবে কে?
সব মিলিয়ে তরুণদের চাকরির পছন্দে একটি নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। শুধু বেশি বেতন নয়, আবার শুধু বাড়ি থেকে কাজও নয় তরুণেরা এমন একটি চাকরি খুঁজছেন যেখানে আয়, স্থিতিশীলতা, শেখার সুযোগ, কাজের স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিজীবনের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ভারসাম্য থাকবে। ডেলয়েটের ২০২৬ সালের গবেষণাও দেখাচ্ছে, দ্রুত পদোন্নতির পেছনে ছুটার বদলে অনেক তরুণ এখন এমন ক্যারিয়ার চান, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই।
বাংলাদেশের চাকরির বাজারে এই পরিবর্তন পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে এখনও সময় লাগবে। কারণ এখানে তরুণদের বড় অংশের সামনে প্রথম সমস্যা এখনও চাকরি পাওয়া, ভালো আয় নিশ্চিত করা এবং অনিশ্চিত কর্মসংস্থান থেকে বের হওয়া। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশাও বদলাচ্ছে। আগামী দিনে যে প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু বেতন দিয়ে নয়, শেখার সুযোগ, নমনীয়তা, সুস্থ কর্মপরিবেশ এবং কর্মীর ব্যক্তিজীবনের প্রতি সম্মান দিয়ে প্রতিভা ধরে রাখতে পারবে, প্রতিযোগিতায় তারাই এগিয়ে যেতে পারে। চাকরির বাজারে হয়তো তাই নতুন প্রশ্নটি ‘বেতন কত?’ থেকে পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে না; বরং তার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরও একটি প্রশ্ন ‘এই চাকরিতে আমি আমার জীবনটাও কি ধরে রাখতে পারব?’

