মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও সারের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বল্প সময়ে বড় অঙ্কের বৈদেশিক সহায়তা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সরকার চার মাসের বাড়তি আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের উদ্যোগ নিয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ থেকে জুন—এই সময়ের মধ্যে জ্বালানি ও সার আমদানিতে বাড়তি ব্যয় সামলাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রয়োজন হবে। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভর্তুকির পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। এই চার মাসে অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন প্রায় ৩৮ হাজার ৫৪২ কোটি টাকা, যা বিদ্যমান বাজেট বরাদ্দের তুলনায় অনেক বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে বাজেট সহায়তা হিসেবে ঋণ নিতে চাচ্ছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি বিশ্লেষণী নথিতে বলা হয়েছে, এই ঋণ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে—বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখা, জরুরি আমদানি অব্যাহত রাখা এবং সীমিত আয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়া।
বিশ্ব পরিস্থিতির অবনতির পেছনে সাম্প্রতিক সংঘাত বড় ভূমিকা রেখেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। যদিও সাময়িক যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তবুও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়ায় মূল্য দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি নির্ভর আমদানি কাঠামোর কারণে বাংলাদেশ এ ধরনের বৈশ্বিক ধাক্কায় দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতীতে একই ধরনের সংকটে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে গিয়েছিল এবং ডলারের দাম বেড়ে গিয়ে মূল্যস্ফীতি তীব্র হয়েছিল। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর।
একটি বেসরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, আগের সংকটের পর কয়েক বছরের মধ্যে দেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিতে চাইছে, যাতে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ধরে রাখা যায়।
বর্তমানে জ্বালানি ও সারের আন্তর্জাতিক দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজেলের দাম কয়েকগুণ পর্যন্ত বেড়েছে, তরলীকৃত গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হয়েছে এবং সারের দামও বড় পরিসরে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি ডলার খরচ হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা কমেছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আমদানি ব্যয় মেটানো এবং মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই দ্রুত ঋণ সহায়তা পাওয়া সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এদিকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নিতে গেলে বিভিন্ন নীতিগত শর্ত পূরণের বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। অতীতে বাজেট সহায়তা নিতে গিয়ে সংস্কার বাস্তবায়নের চাপ তৈরি হয়েছিল। এবারও একই ধরনের প্রশ্ন উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আহরণ এবং ভর্তুকি কাঠামোয় সংস্কার জরুরি। তা না হলে প্রতি বৈশ্বিক সংকটেই একই ধরনের চাপের মুখে পড়তে হবে।সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্ত ও কার্যকর নীতি বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে এই সংকট কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করা যাবে।

