দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতি নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। গ্রীষ্মের বাড়তি চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন না বাড়ায় লোডশেডিং দুই হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে, ফলে জনজীবন, শিল্প উৎপাদন ও কৃষি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার কর্মঘণ্টা কমানো এবং হোম অফিস চালুর বিষয়ও বিবেচনায় নিচ্ছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গভীর রাতে প্রায় ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। এতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। পিক সময়ে প্রয়োজনীয় উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ বাড়ছে।
জেলাভেদে লোডশেডিংয়ের মাত্রা ভিন্ন হলেও বেশিরভাগ এলাকাতেই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোতে কোথাও ৩০ শতাংশের কাছাকাছি, আবার কোথাও ৪০ শতাংশের বেশি লোডশেডিং দেখা যাচ্ছে। অনেক স্থানে দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনা ঘটছে।
এই সংকটের পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন। বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক কেন্দ্র সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ রয়েছে। কোথাও যান্ত্রিক ত্রুটি, আবার কোথাও জ্বালানির অভাবে উৎপাদন কমে গেছে। ফলে মোট উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, রাতের ঘুমও বিঘ্নিত হচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও একই ধরনের দুর্ভোগ চলছে, বরং গ্রামাঞ্চলে সমস্যা আরও প্রকট।
শিল্প খাতে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। গাজীপুর, সাভারসহ বিভিন্ন শিল্প এলাকায় উৎপাদন কমে যাচ্ছে। অনেক কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় মেশিন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আদেশ সময়মতো সম্পন্ন করা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চামড়া শিল্প, প্লাস্টিক শিল্পসহ বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, জেনারেটর দিয়ে সব ধরনের ভারী যন্ত্র চালানো সম্ভব নয়। ফলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে খরচ বাড়ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। পর্যটন ও সেবাখাতেও একই প্রভাব পড়েছে। হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে গ্রাহকসেবা ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠছে।
কৃষিখাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বোরো মৌসুমে সেচের জন্য বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বেশি থাকায় অনিয়মিত সরবরাহে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। অনেক এলাকায় সময়মতো সেচ দেওয়া যাচ্ছে না, যা ফসলের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি আমদানিতে জটিলতা, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

