রাজধানীর গুলশানে বসে দেশের স্বনামধন্য ইউএস-বাংলা গ্রুপের নাম ব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ‘ইউএস-বাংলা হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামে ভুয়া একটি প্রকল্প দেখিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছে তারা। কক্সবাজারের ইনানী সৈকতে বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণের নামে এই প্রতারণার জাল বিস্তার করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
ইউএস-বাংলা গ্রুপ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কক্সবাজারের ইনানীতে এ নামে কোনো হোটেল বা রিসোর্ট প্রকল্প তাদের নেই। অথচ প্রতারক চক্রটি নিজেদেরকে গ্রুপটির ‘সিস্টার কনসার্ন’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, ইউএস-বাংলা অ্যাসেটস লিমিটেড এবং ফুডিকে অংশীদার দেখিয়ে এই কথিত প্রকল্পে বিনিয়োগের প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
গ্রাহক সেজে করা অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিবারই চক্রটি নিজেদের ইউএস-বাংলা গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান দাবি করছে। এই কথোপকথনের অডিও ও তথ্য প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। চক্রটির মূল হোতা হিসেবে পরিচয় পাওয়া ব্যক্তি মো. জাহাঙ্গীর। তিনি নিজেকে ইউএস-বাংলা গ্রুপের ‘হেড অব সেলস’ পরিচয় দিয়ে গুলশান-১ এলাকার এডব্লিউআর টাওয়ারের ষষ্ঠ তলায় একটি অফিস পরিচালনা করছেন। এই অফিসকেই তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইউএস-বাংলা গ্রুপের অফিস হিসেবে উপস্থাপন করছেন।
জাহাঙ্গীর বিনিয়োগকারীদের ‘ইউএস-বাংলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে কথিত চার তারকা হোটেলে শেয়ার কেনার জন্য প্রলুব্ধ করছেন। এখানে বিনিয়োগ করলে ভবিষ্যতে বড় লাভের আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। শুধু অফিস নয়, অনলাইনেও সক্রিয় এই প্রতারণা চক্র। ‘ইউএস-বাংলা হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখানে আকর্ষণীয় ছবি, বুকিং অপশন এবং গ্যালারি যুক্ত করা হয়েছে। প্রথম দেখায় এটি একটি বাস্তব ও বিলাসবহুল হোটেল প্রকল্প বলেই মনে হয়।
ওয়েবসাইটের মূল পাতায় বড় করে ইউএস-বাংলা নাম ব্যবহার করা হয়েছে এবং কক্সবাজারের ইনানীতে হোটেল নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বুকিং সিস্টেম ও ছবির মাধ্যমে এটি চালু বা চালুর কাছাকাছি অবস্থায় রয়েছে—এমন ধারণা তৈরি করা হয়। তবে অনুসন্ধানে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বাস্তবে এমন কোনো হোটেল বা নির্মাণকাজের অস্তিত্ব নেই। প্রকল্পের কোনো অনুমোদন, সরকারি ছাড়পত্র বা প্রকৃত ডেভেলপারের তথ্যও ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়নি। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি কৃত্রিমভাবে তৈরি বিনিয়োগ ফাঁদ।
এছাড়া ওয়েবসাইটে ‘কাস্টমার রিভিউ’ নামে ইতিবাচক মন্তব্যও যুক্ত করা হয়েছে, যা প্রকৃত নয় বলে অনুসন্ধানে প্রমাণ পাওয়া গেছে। যেহেতু প্রকল্পটির বাস্তব অস্তিত্ব নেই, তাই এসব রিভিউ সম্পূর্ণভাবে মনগড়া বলে ধারণা করা হচ্ছে। যোগাযোগের জন্য গুলশান-১ এর এডব্লিউআর টাওয়ারের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। একটি মোবাইল নম্বর (+880 1994-444558) দেওয়া হয়েছে, যা সরাসরি জাহাঙ্গীর ব্যবহার করেন বলে জানা গেছে।
প্রতারণার ধরন যাচাই করতে প্রতিবেদক নিজেকে একটি গার্মেন্টস কারখানার কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কথোপকথনের সময় তিনি ১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগের আগ্রহ দেখালে জাহাঙ্গীর আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি শেয়ার প্রতি ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দামের কথা জানান এবং ‘বৈশাখী অফার’-এর মাধ্যমে ৫ লাখ টাকায় শেয়ার পাওয়ার সুযোগ আছে বলে প্রচার করেন। মাত্র ১ লাখ টাকা দিলেই বুকিং নিশ্চিত করা যাবে বলেও তিনি দাবি করেন।
আলোচনায় জাহাঙ্গীর স্বীকার করেন, ইতোমধ্যে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি বা বিনিয়োগকারীদের অবস্থান সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ তথ্য তিনি দিতে পারেননি। এমনকি কোনো বৈধ কাগজপত্র বা সরকারি অনুমোদনও দেখাতে ব্যর্থ হন।
কথোপকথনের এক পর্যায়ে ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার চেষ্টা করা হয়। জাহাঙ্গীর আরও একজন ব্যক্তিকে যুক্ত করেন, যিনি নিজেকে বিজয় কুমার নামে পরিচয় দেন এবং ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা দাবি করেন। তিনি বলেন, তার পরিচিত অনেকেই এখানে বিনিয়োগ করেছেন এবং এটি একটি নির্ভরযোগ্য প্রকল্প।
পরবর্তীতে আরও দাবি করা হয়, বিভিন্ন পেশার মানুষ, এমনকি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এখানে বিনিয়োগ করেছেন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের জন্য এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয় বলে অভিযোগ।
জাহাঙ্গীর জানান, প্রকল্পটি ২০৩১ সালে হস্তান্তর করা হবে এবং পাঁচ বছরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন হবে। সরকারিভাবে লাইসেন্সপ্রাপ্ত এবং ইউএস-বাংলার সিস্টার কনসার্ন হিসেবে এটি পরিচালিত হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন। কিস্তিতেও বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে প্রচার করা হয়।
তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম স্পষ্টভাবে জানান, ইউএস-বাংলা গ্রুপের অধীনে ‘ইউএস-বাংলা হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রকল্প নেই। এটি গ্রুপের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক। তিনি সবাইকে এ ধরনের ভুয়া প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কোনো ধরনের বিনিয়োগ বা লেনদেন না করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি এই বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।

