দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে প্রকৌশল শিক্ষার অবস্থান এখনও দুর্বল রয়ে গেছে। সীমিত গবেষণা, অবকাঠামোগত ঘাটতি ও শিল্পখাতের সঙ্গে দুর্বল সংযোগ—এসব কারণে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৭০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও এর মধ্যে প্রায় ১৬০টির মতো প্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চলছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকৌশল অনুষদ থাকলেও আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে দেশের উপস্থিতি খুবই সীমিত। বিভিন্ন বৈশ্বিক তালিকায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে বাংলাদেশ থেকে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই জায়গা করে নিতে পেরেছে।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিষয়ে আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ থেকে মাত্র দুটি বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ তালিকায় রয়েছে। সেখানে তাদের অবস্থানও তুলনামূলকভাবে মাঝামাঝি পর্যায়ে। এই র্যাংকিং নির্ধারণে মূলত কর্মসংস্থানের সুযোগ, গবেষণার মান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গুরুত্ব পায়—যেখানে বাংলাদেশের ঘাটতি স্পষ্ট।
দেশে প্রতিবছর হাজার হাজার প্রকৌশলী তৈরি হলেও তাদের বড় অংশ পর্যাপ্ত ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে না। বিশেষ করে আধুনিক ল্যাব, গবেষণা সহায়তা এবং উদ্ভাবনী পরিবেশের অভাব বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই, কোথাও ল্যাবের সংকট, আবার কোথাও শিক্ষক ঘাটতি প্রকট।
শিক্ষাবিদদের মতে, দেশের প্রকৌশল শিক্ষা এখনও তাত্ত্বিক জ্ঞানকেন্দ্রিক। বাস্তবমুখী উদ্ভাবন বা নতুন প্রযুক্তি তৈরির চর্চা খুব সীমিত। ফলে শিক্ষার্থীরা যন্ত্র চালাতে পারলেও নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এ কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়ছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দুর্বল সংযোগ। উন্নত দেশগুলোতে শিল্প ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা থাকলেও বাংলাদেশে এই সমন্বয় খুবই কম। ফলে গবেষণার ফল বাস্তব উৎপাদন বা প্রযুক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে না।
এছাড়া শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কম থাকাও একটি বড় কারণ। জিডিপির তুলনায় শিক্ষায় ব্যয় এখনও অনেক কম, যার ফলে অধিকাংশ অর্থ অবকাঠামো নির্মাণেই ব্যয় হয়ে যায়। আধুনিক গবেষণাগার, উন্নত যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় দেখা যায়, এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন চীন, ভারত, জাপান বা মালয়েশিয়ায় অনেক বেশি বিশ্ববিদ্যালয় বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এসব দেশে গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকায় তারা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি পরিবর্তনে শিক্ষা ব্যবস্থায় আউটকামভিত্তিক পদ্ধতি পুরোপুরি চালু করা, আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি অর্জন এবং আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি।
তাদের মতে, শিক্ষায় অন্তত জিডিপির পাঁচ শতাংশ বিনিয়োগ, আধুনিক ল্যাব স্থাপন, গবেষণায় বাড়তি বরাদ্দ এবং শিল্পখাতকে গবেষণায় যুক্ত করা গেলে প্রকৌশল শিক্ষার মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হতে পারে। সব মিলিয়ে, মেধাবী শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং গবেষণা পরিবেশের অভাবে বাংলাদেশ এখনও বৈশ্বিক প্রকৌশল শিক্ষায় প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই পিছিয়ে পড়া কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

