ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ হঠাৎ কমে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নতুন করে চাপে পড়েছে। তীব্র গরমের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে আমদানি প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। আগে যেখানে প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল, এখন তা কমে ৭০০–৮০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এতে আগে থেকেই জ্বালানি সংকটে থাকা জাতীয় গ্রিডে চাপ আরও বেড়েছে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম। একদিকে তাপপ্রবাহের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে উৎপাদন সেই হারে বাড়ছে না। সাম্প্রতিক এক হিসাবে দেখা গেছে, সর্বোচ্চ চাহিদা ১৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও উৎপাদন রয়েছে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট কম। ফলে নিয়মিত ঘাটতি মোকাবিলায় লোডশেডিংই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ও শিল্প খাতে। শহর ও গ্রামে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ও মাত্রায় বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, আবার গ্রামাঞ্চলে টানা কয়েক ঘণ্টা থেকে শুরু করে ৭-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার ঘটনাও ঘটছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রটির যান্ত্রিক একটি অংশে ত্রুটি ধরা পড়ায় ইউনিটটি বন্ধ রাখতে হয়েছে। মেরামত শেষ করে পুনরায় চালু করতে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে। ততদিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কমই থাকবে।
এদিকে দেশের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থাও নানা সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। দৈনিক যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, তা দিয়ে মোট সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। সামান্য অতিরিক্ত গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেলে উৎপাদন কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি অনিশ্চিত।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না, কারণ প্রয়োজনীয় কয়লা সরবরাহে ঘাটতি রয়েছে। বড় কিছু কেন্দ্র আংশিক সক্ষমতায় চলছে, আবার কিছু ইউনিট বন্ধও রয়েছে। ফলে এই খাত থেকেও প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দামের অস্থিরতা ও সরবরাহ ঝুঁকির কারণে সেটি সীমিত রাখা হচ্ছে। ফলে এই উৎস থেকেও পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ এখন একাধিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। গ্যাস ও কয়লার ঘাটতি, আমদানি কমে যাওয়া এবং বাড়তি চাহিদা—এই তিনটি চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে এবং বন্ধ ইউনিট চালু না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। তাই সরবরাহ ও উৎপাদনের এই ব্যবধান কমাতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে দেশজুড়ে লোডশেডিং আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

