দেশের বিমান পরিবহন খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে যাচ্ছে সরকার। আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে মোট ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এপ্রিল মাসের মধ্যেই এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন টাকা, যা প্রায় ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিপুল বিনিয়োগকে দেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থায় একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সম্প্রতি এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী জানান, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহরে বর্তমানে আন্তর্জাতিক রুটের জন্য ১৯টি উড়োজাহাজ রয়েছে। তবে ক্রমবর্ধমান যাত্রী চাহিদা সামাল দিতে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫টি উড়োজাহাজ প্রয়োজন। সেই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৪–৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টি উড়োজাহাজে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি শুধু একটি ক্রয় প্রকল্প নয়, বরং পুরো বিমান বহর পুনর্গঠনের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আকাশপথে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা কম হলে আয়ের পাশাপাশি দেশের সুনামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার একই সঙ্গে ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একটি মিশ্র বহর গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমে।
স্বল্পমেয়াদে চাহিদা পূরণের জন্য আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে লিজ বা ভাড়ার ভিত্তিতে আরও উড়োজাহাজ যুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এটি বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এছাড়া সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে আন্তর্জাতিক রুট সম্প্রসারণও। আগামী জুন মাসে জাপানের টোকিওতে সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা আগে স্থগিত ছিল। এই পদক্ষেপকে আন্তর্জাতিক সংযোগ বাড়ানোর কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে শুধু যাত্রী পরিবহন সক্ষমতাই বাড়বে না, বরং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থানও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া, উন্নত সেবা এবং রুট সম্প্রসারণের সুযোগও তৈরি হবে।
তবে বিশ্লেষকরা এটাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শুধু উড়োজাহাজ কেনা যথেষ্ট নয়। বিমান ব্যবস্থাপনা, রক্ষণাবেক্ষণ, দক্ষ জনবল এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা না গেলে এই বিনিয়োগের পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বোয়িং থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের আকাশ পরিবহন খাতে একটি বড় রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এটি একদিকে যেমন সক্ষমতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবস্থাপনার দক্ষতার ওপরও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

