চট্টগ্রামে গরম যত বাড়ছে, বিদ্যুৎ সংকটও ততই প্রকট হয়ে উঠছে। প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা লোডশেডিং এখন অনেকটা স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকাগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার এই চক্র জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, বিশেষ করে চলমান এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য এটি বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের হিসাবে লোডশেডিংয়ের ঘাটতি ৭৬ থেকে ১০৯ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ দেখানো হলেও বাস্তব পরিস্থিতি তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন। কারণ, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে বর্তমানে ১০টি কেন্দ্র পুরোপুরি বা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কিছু কেন্দ্র দিনের বেলায় বন্ধ রেখে রাতে চালানো হচ্ছে, আবার কিছু কেন্দ্র যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানি সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধ।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা। বহদ্দারহাটের এক শিক্ষার্থী মরিয়ম আক্তার জানান, দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে, ফলে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। রাতের বেলায় লোডশেডিং পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
শিক্ষা বোর্ডও বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী জানিয়েছেন, পরীক্ষার সময় লোডশেডিং বন্ধ রাখতে বিদ্যুৎ বিভাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। কারণ এই সময় বিদ্যুৎ না থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
উৎপাদন পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, চট্টগ্রামের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও বাস্তবে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় অর্ধেকে। ২০ এপ্রিল অফ-পিক সময়ে উৎপাদন ছিল ২,১৫২.৭০ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে ২,৩৪৯.৫০ মেগাওয়াট। অথচ এই অঞ্চলে দৈনিক চাহিদা ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ মেগাওয়াটের মধ্যে।
সমস্যার মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে গ্যাস সংকট এবং যান্ত্রিক ত্রুটি। রাউজান তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের একটি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ রয়েছে যান্ত্রিক সমস্যার কারণে। অন্য ইউনিটটি সচল থাকলেও গ্যাস না থাকায় সেটিও বন্ধ রাখতে হচ্ছে। অথচ এই কেন্দ্র দুটি সচল থাকলে প্রায় ৪২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতো।
গ্যাস সরবরাহ নিয়েও রয়েছে জটিলতা। কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন ৩৭ থেকে ৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে কিছুদিন রাউজানে গ্যাস দেওয়া হলেও এখন তা বন্ধ করে আবার শিকলবাহায় সরবরাহ করা হচ্ছে, যা উৎপাদনে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করছে।
এদিকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ৫টি ইউনিটের মধ্যে মাত্র ২টি সচল রয়েছে, যা থেকেও উৎপাদন সীমিত। বেসরকারি খাতের কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও কোনো উৎপাদন হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি এখন এক জটিল সংকটের মধ্যে রয়েছে। একদিকে গরমে বাড়তি চাহিদা, অন্যদিকে উৎপাদন ঘাটতি—এই দুইয়ের চাপে লোডশেডিং যেন অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট কেবল সাময়িক নয়; এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার ঘাটতি, জ্বালানি নির্ভরতা এবং অব্যবস্থাপনার ফল। যদি দ্রুত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায় এবং অচল কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করা না হয়, তাহলে সামনে গ্রীষ্ম মৌসুমে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

