বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অর্থনীতি পুনরুজ্জীবন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং রাজনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়ন—এই তিনটি ক্ষেত্রকে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। সংস্থাটি বলছে, শুরুর সময়টিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে সরকারের জন্য সামনে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, নির্বাচন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটলেও নতুন সরকার সেই জনসমর্থনকে স্থিতিশীলতায় রূপ দিতে পারবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তাই অর্থনীতি সচল করা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার না হলে জনঅসন্তোষ দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর খাতে বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে সরকারের জন্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা হবে তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে চলা জরুরি। অন্যথায় এটি বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সংস্থাটি মনে করে, সংস্কার নিয়ে দীর্ঘ টানাপোড়েন সরকারের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করে দিতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা পুনর্গঠন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্য বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা জোরদার করার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাব কমানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খল জনসমাবেশ মোকাবিলায় কার্যকর কৌশল নিতে হবে।
আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। দলটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা দীর্ঘায়িত করা হলে তা রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে। আবার দ্রুত রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরিয়ে আনাও সহজ হবে না। তাই এ বিষয়ে ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মামলা ও গ্রেপ্তার ইস্যুতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া দায়ের করা মামলাগুলো পুনর্বিবেচনা করা এবং বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক দিক থেকেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও নারীদের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত—এই বাস্তবতায় তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। অন্যথায় সামাজিক অস্থিরতা বাড়তে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও ভারসাম্য রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় সতর্ক কূটনৈতিক অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটসহ আঞ্চলিক সমস্যাগুলো সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, নতুন সরকার যদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে দেশ আবারও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। বিপরীতে, এসব ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

