বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই এই রোগ ছড়িয়ে পড়েছে, আর এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। ইতোমধ্যে শতাধিক শিশুর মৃত্যু হওয়ায় পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
সংস্থাটির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে বিরতি এবং শিশুদের পুষ্টিহীনতা—এই তিনটি কারণ বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে তীব্র করেছে। একসময় হাম নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি তৈরি হয় এবং সম্পূরক টিকাদান দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বিপুলসংখ্যক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক শিশু একেবারেই টিকা পায়নি, আবার কেউ পেয়েছে মাত্র একটি ডোজ। এমনকি টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়স হওয়ার আগেই অনেক শিশু আক্রান্ত হচ্ছে। এক থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও প্রতিরোধ ঘাটতির স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত এক মাসে হাজার হাজার সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। পরীক্ষায় নিশ্চিত রোগীর সংখ্যাও কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। প্রতিদিন নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, যা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে এবং মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। গত কয়েক সপ্তাহে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, যা সংক্রমণের তীব্রতা নির্দেশ করে।
ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতে। রাজধানীর ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগেও উল্লেখযোগ্য সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আক্রান্তদের বড় অংশই পাঁচ বছরের নিচের শিশু। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের মধ্যেও এই বয়সসীমার শিশুরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। দুই বছরের কম বয়সী এবং এমনকি নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও উল্লেখযোগ্যভাবে আক্রান্ত হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নবজাতক সাধারণত মায়ের শরীর থেকে কিছু প্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। তবে মা যদি নিজে টিকা না নিয়ে থাকেন বা আগে আক্রান্ত না হন, তাহলে সেই সুরক্ষা কমে যায়। ফলে শিশুরা টিকার বয়স হওয়ার আগেই ঝুঁকিতে পড়ে। সংক্রমণ বেশি হলে এই সীমিত প্রতিরোধ ক্ষমতাও কাজ করে না।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। সংক্রমণের পর জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। জটিল ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো গুরুতর সমস্যা তৈরি হতে পারে, যা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশব্যাপী টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের পাশাপাশি কম বয়সী শিশুদেরও টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ, হাসপাতালের প্রস্তুতি বৃদ্ধি এবং নজরদারি জোরদার করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত টিকার কভারেজ অন্তত ৯৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি সংক্রমণ দ্রুত শনাক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই প্রাদুর্ভাব আরও বিস্তৃত হতে পারে। তাই টিকাদান কর্মসূচি শক্তিশালী করা এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানোই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

