বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহে ঘাটতি সামাল দিতে প্রতি মাসেই বড় অঙ্কের ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হয় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড–কে। তবে এবার সেই ভর্তুকির অর্থ ছাড়ে কড়াকড়ি আরোপ করেছে অর্থ বিভাগ, যা খাতটির জন্য নতুন চাপ তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিল পরিশোধে প্রায় ২ হাজার ৬৭ কোটি টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে একাধিক শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধে ভর্তুকির অর্থ ব্যবহার করা যাবে না এবং নির্দিষ্ট কিছু বিদ্যুৎ কেন্দ্র ছাড়া অন্য কোথাও এই অর্থ ব্যয় করা যাবে না। এছাড়া যেসব প্রকল্প সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পায়নি, সেগুলোর বিল পরিশোধেও এই অর্থ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ভর্তুকির অর্থ পেতে হলে বিদ্যুৎ খাতকে আরও কিছু শর্ত মানতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা, বিদ্যমান ট্যারিফ সমন্বয় করা এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মাসভিত্তিক ক্ষতির পৃথক হিসাব তৈরি করা। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ক্রয়-বিক্রয়ের পার্থক্যজনিত ক্ষতির বিস্তারিত প্রতিবেদন নিয়মিতভাবে অর্থ বিভাগে জমা দিতে হবে।
খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও বিক্রয়মূল্য কম থাকায় বিপুল আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫২ হাজার কোটি টাকার বেশি। এমন পরিস্থিতিতে নতুন শর্তগুলো কার্যকর হলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে আমদানি করা বিদ্যুতের বিল পরিশোধে নিষেধাজ্ঞা থাকায় পরিস্থিতি জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে বিদেশ থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হচ্ছে এবং এই খাতে কয়েক হাজার কোটি টাকার বকেয়া জমেছে। সময়মতো বিল পরিশোধ না হলে সরবরাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এদিকে নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হওয়ায় ব্যয় আরও বাড়ছে। কিছু প্রকল্পের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন না থাকায় সেগুলোর বিলও ভর্তুকির অর্থ দিয়ে পরিশোধ করা যাচ্ছে না। এতে আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তাদের মতে, ভর্তুকির অর্থ সাধারণত বিভিন্ন কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় করে ব্যয় করা হয়, যাতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যায়। কিন্তু নতুন শর্তের কারণে এই সমন্বয় প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এই অঙ্ক আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। জ্বালানি আমদানির উচ্চ খরচ, বিশেষ করে এলএনজি ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে, ভর্তুকি ছাড়ে কঠোর শর্ত আরোপ বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হলেও, বাস্তব প্রয়োগে এটি সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সিভি/কেএইচ

