চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দেশের প্রথম ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্প–সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, আগামী জুন মাসেই এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটি শুরু হয় গত বছরের ২৬ মার্চ। প্রায় ৭০ কোটি টাকার এই উদ্যোগে বড় অংশজুড়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। এর মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি টাকার সহায়তা দিয়েছে চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি। বাকি ২০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
৪২০ টেরাবাইট সক্ষমতার স্টেশন:
নতুন এই গ্রাউন্ড স্টেশনে প্রায় ৪২০ টেরাবাইট তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতা থাকবে। তবে পূর্ণভাবে চালু করতে এখনো কিছু পরিচালনাগত কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশনটি ১১টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এর মধ্যে প্রায় ৭টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে আংশিক সংযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে। চীনের কয়েকটি স্যাটেলাইট থেকে মানসম্পন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি জাপান ও নাসার স্যাটেলাইট থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বর্তমানে কোন স্যাটেলাইট থেকে কোন ধরনের তথ্য সবচেয়ে কার্যকরভাবে পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে তথ্য বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ সফটওয়্যার তৈরিও এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী জুনে চীনা প্রতিনিধিদলের পরিদর্শনের সময় স্টেশনটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের পূর্বাভাসের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল। এই গ্রাউন্ড স্টেশন চালু হলে সেই নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। প্রকল্প–সংশ্লিষ্টদের মতে, এখন যেখানে তথ্য পেতে ২০ থেকে ৩০ ঘণ্টা সময় লাগে, সেখানে নতুন ব্যবস্থায় তা মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিনিটে পাওয়া সম্ভব হবে।
এর ফলে ঘূর্ণিঝড় ট্র্যাকিং, উপকূলীয় বন্যার মডেলিং, আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্লেষণ আরও দ্রুত করা যাবে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে সম্ভাব্য মাছ ধরার অঞ্চল শনাক্ত করাও সহজ হবে, যা টেকসই মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হতে পারে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি–১৪) অর্জনেও ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোসলেম উদ্দিন। তিনি জানান, এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক নয়, বরং গবেষণা ও শিক্ষার প্রসার। তার ভাষায়, শিক্ষার্থী ও গবেষকেরা নির্ধারিত নিয়মে গবেষণা প্রস্তাব জমা দিয়ে এই স্টেশন থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। এতে একাডেমিক গবেষণা ও প্রকাশনা বাড়বে।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি ডাউনলিংক স্টেশন, যেখানে শুধু তথ্য গ্রহণ করা হয়, প্রেরণ করা হয় না। তাই নিরাপত্তা বা উদ্বেগের বড় কোনো কারণ নেই। চীনের সম্পৃক্ততা মূলত প্রযুক্তিগত সহায়তা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অংশ।
চলতি বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট স্টেশনটিকে স্বতন্ত্র কেন্দ্র হিসেবে অনুমোদন দেয়। এর নাম রাখা হয়েছে ‘স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডেটা ইনোভেশন সেন্টার’। এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান অধ্যাপক মোসলেম উদ্দিন। এদিকে প্রকল্পটি সচল রাখতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক করার পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এতে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ ব্যয় ভাগাভাগি করা সম্ভব হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক চাপ কমবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আল-ফোরকান জানান, প্রকল্পের কাজ প্রায় সম্পন্ন। আগামী ৭ থেকে ৯ জুনের মধ্যে এটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হতে পারে। ভবিষ্যতে স্টেশনটির সক্ষমতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
সিভি/এম

