বাংলাদেশের সড়কে নীরবে বড় পরিবর্তন ঘটছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, নগরজীবনের ব্যয় বাড়া এবং যানজটের চাপের কারণে ই-বাইক ও ই-স্কুটার দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে এটি এখন বড় শিল্প খাতে রূপ নিচ্ছে, যেখানে কয়েক হাজার কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ আসছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সময়ে ই-বাইক খাতে অন্তত ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। দেশের শীর্ষ শিল্পগোষ্ঠীগুলো এই বাজারে প্রবেশ করছে এবং উৎপাদন ও বিপণন নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। কয়েক বছর আগেও যেখানে মাসে কয়েকশ ইউনিট বিক্রি হতো, এখন তা হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বলছে, তিন বছরের মধ্যে ই-বাইক আমদানি কয়েকগুণ বেড়েছে। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, কিট আকারে আসা পণ্যসহ প্রকৃত বাজার আকার আরও বড়। প্রতিদিনই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ই-বাইক বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদকরা বলছেন, কর কাঠামো কিছুটা সহায়ক হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সংযোজন কার্যক্রম বাড়ছে। সম্পূর্ণ তৈরি ই-বাইকে তুলনামূলক বেশি শুল্ক থাকলেও কিট আকারে আমদানিতে কর কম হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান দেশে সংযোজন কারখানা গড়ে তুলছে।
এই খাতে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর বিনিয়োগও দ্রুত বাড়ছে। নতুন কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে বাজারে একাধিক মডেল এনেছে এবং জেলা পর্যায়ে শোরুম বিস্তৃত করছে। কেউ কেউ দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও নিয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি কোম্পানি শত কোটি টাকার বিনিয়োগে নতুন কারখানা স্থাপন করছে এবং ভবিষ্যতে উৎপাদন বহুগুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
বিদ্যমান বড় উৎপাদকরাও পিছিয়ে নেই। কেউ ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য বাজার অংশীদারিত্ব অর্জন করেছে এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। নতুন কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
প্রচলিত মোটরসাইকেলের তুলনায় ই-বাইকের খরচ অনেক কম হওয়ায় সাধারণ মানুষের আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে। যেখানে পেট্রোলচালিত বাইকে প্রতি কিলোমিটারে কয়েক টাকা খরচ হয়, সেখানে ই-বাইকে খরচ কয়েক পয়সায় সীমাবদ্ধ। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ কম এবং ঘরে বসেই চার্জ দেওয়ার সুবিধা থাকায় এটি ব্যবহারকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
ব্যবহারকারীরা বলছেন, জ্বালানি স্টেশনে লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা নেই এবং মাসিক ব্যয় অনেক কমে যায়। ফলে স্বল্প সময়ে ক্রয়ের খরচও উঠে আসে। তরুণ প্রজন্ম ও নারী ব্যবহারকারীদের মধ্যে এ ধরনের যানবাহনের ব্যবহার বাড়ছে, যা এটিকে শুধু পরিবহন নয়, জীবনধারার অংশ হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করছে।
তবে এই খাতের সামনে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে। দেশে চার্জিং অবকাঠামো এখনো সীমিত এবং বড় শহরের বাইরে সুবিধা খুবই কম। ফলে দীর্ঘপথে চলাচলে ব্যবহারকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এছাড়া নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অনেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে যানবাহন নিবন্ধন করতে পারছেন না।
বর্তমানে দেশে মোটরসাইকেল বাজারের আকার কয়েক হাজার কোটি টাকা এবং এটি দ্রুত বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে, চার্জিং সুবিধা বাড়ানো হলে এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে ই-বাইক খাত ভবিষ্যতে দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পে পরিণত হতে পারে।

