রেলওয়ের অব্যবহৃত ও নিষ্কণ্টক জমিকে কাজে লাগিয়ে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় আকারের একটানা জমি চিহ্নিত করে তা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অন্তত ১০ একর একটানা খালি জমি প্রয়োজন হবে। কারণ ছোট ছোট খণ্ডিত জমিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প অর্থনৈতিকভাবে লাভজনকভাবে চালানো কঠিন। তাই একসঙ্গে থাকা বড় আকারের নিষ্কণ্টক (মামলা বা দখল জটিলতামুক্ত) জমি চিহ্নিত করার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে রেলওয়ের জমিতে পরিবেশবান্ধব সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সেখানে কয়েকটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সম্ভাব্য পরিকল্পনা ও তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য বিপুল সংখ্যক সোলার প্যানেল বসাতে হয়। এ কারণে বড় জমির প্রয়োজন অপরিহার্য হয়ে ওঠে। উদ্যোক্তাদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গড়ে প্রায় তিন একর জমি প্রয়োজন হয়। তবে প্রকল্পকে লাভজনক করতে সাধারণত বিনিয়োগকারীরা অন্তত ১০ একর বা তার বেশি একটানা জমি চান।
এ কারণে রেল কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে, এমন জমি চিহ্নিত করতে হবে যা একসঙ্গে বড় পরিসরে রয়েছে এবং যেগুলোতে কোনো আইনি জটিলতা নেই। এরপর বিনিয়োগকারীরা সেই জমি সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করবেন। বিশেষ করে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযোগের দূরত্ব এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হবে। গ্রিড কাছাকাছি থাকলে প্রকল্প বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ ও লাভজনক হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, “সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে সম্প্রতি একটি বৈঠক হয়েছে, যেখানে সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত কমপক্ষে ১০ একর জমি চান। তাই বড় ও ঝামেলামুক্ত জমি খুঁজে প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করা হবে।”
তিনি আরও জানান, এই উদ্যোগ থেকে রেল কীভাবে লাভবান হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), জমি ভাড়া দেওয়া, মুনাফা ভাগাভাগি বা কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার মতো বিভিন্ন মডেল বিবেচনায় রয়েছে। উপযুক্ত জমি পাওয়া গেলে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।
রেলওয়ের দুটি অঞ্চল—পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। সূত্র বলছে, ১০ একর বা তার বেশি একটানা নিষ্কণ্টক জমি পশ্চিমাঞ্চলে তুলনামূলক বেশি পাওয়া যেতে পারে। এর মধ্যে পাকশী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও সৈয়দপুর এলাকাকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলে চট্টগ্রামের দোহাজারী ও কক্সবাজার এলাকার কিছু জমি সম্ভাব্য তালিকায় রাখা হচ্ছে।
তবে রেলওয়ের ভূসম্পত্তি শাখার তথ্য বলছে, বিপুল পরিমাণ জমি থাকলেও এর একটি বড় অংশ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে মামলা-মোকদ্দমা ও অবৈধ দখলের কারণে অনেক জমি রেলের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে। ফলে বড় সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তা থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না—এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে।
রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ৬০ হাজার ২১ একর। এর মধ্যে ৩০ হাজার ২৮৬ একর ব্যবহার হচ্ছে রেল অপারেশনাল কাজে। বৈধভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৪১১ একর। অব্যবহৃত অবস্থায় আছে ৮ হাজার ৫৫৪ একর জমি। আর অবৈধ দখলে রয়েছে ৬ হাজার ৭৫৪ একর জমি।
বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) সেন্টার ফর এনার্জি রিসার্চের পরিচালক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে জমির সংকট বড় বাধা। রেলসহ সরকারি সংস্থার অব্যবহৃত জমি কাজে লাগানো গেলে তা জাতীয় স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতে সরকারের আয়ও বাড়বে। তবে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে শুরু থেকেই যুক্ত রাখা এবং গ্রিড সংযোগের পরিকল্পনা আগে থেকেই নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান সতর্ক করে বলেন, এই উদ্যোগ যেমন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে জমি বেসরকারি খাতে দিলে ভবিষ্যতে রেলের নিজস্ব প্রয়োজন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। পাশাপাশি জমি বরাদ্দ ও হস্তান্তরে স্বচ্ছতা না থাকলে অনিয়মের আশঙ্কা থেকে যায়। চুক্তির শর্ত ভারসাম্যপূর্ণ না হলে রেল কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুবিধা নাও পেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, জমির অবস্থান, গ্রিড সংযোগ, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থ—সব বিষয় বিবেচনায় নিয়েই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা উচিত। যথাযথ নিয়ন্ত্রক কাঠামো ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এটি রেলের জন্য লাভজনক উদ্যোগ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা রেলের জমিকে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহারযোগ্য সম্পদে রূপান্তরের এই উদ্যোগকে একটি সম্ভাবনাময় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

