প্রায় ১৭ দিন বন্ধ থাকার পর আগামী ৭ মে আবারও উৎপাদনে ফিরতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সংকট কাটিয়ে উৎপাদন পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ক্রুডবাহী জাহাজ দেশে পৌঁছালে রিফাইনারি চালু করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন পরিচালিত ইআরএল দেশের একমাত্র পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি। প্রতিষ্ঠানটি শতভাগ আমদানিনির্ভর অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ব্যবহার করে। মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সরকারিভাবে এসব তেল আমদানি করা হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি পরিবহনে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। এর প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাতেও। বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে এক লাখ টন ক্রুড বহনকারী একটি ট্যাংকার হামলার আশঙ্কায় হরমুজ প্রণালির কাছে আটকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও সংকটময় হয়ে ওঠে।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও নির্ধারিত সময়ে আরেকটি ক্রুডবাহী জাহাজ ছাড়তে পারেনি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ঝুঁকির কারণে জাহাজ মালিকপক্ষ অনাগ্রহ দেখানোয় সেই পরিবহন কার্যক্রম বাতিল হয়ে যায়। ফলে ইআরএলে অপরিশোধিত তেলের মজুত দ্রুত কমে আসে।
পরিস্থিতির অবনতি হলে গত ১২ এপ্রিল বিকেল থেকে ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রধান ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট (সিডিইউ) বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর সঙ্গে সিডিইউনির্ভর অন্যান্য প্ল্যান্টও কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়। এতে দেশে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে। সংকট সামাল দিতে সরকারকে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে পরিশোধিত জ্বালানি কিনতে হয়েছে।
তবে এখন পরিস্থিতির উন্নতির আশা দেখা যাচ্ছে। সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ‘এমটি নিনেমিয়া’ নামের একটি জাহাজ বাংলাদেশের পথে রয়েছে। জাহাজটি আগামী ৬ মে কুতুবদিয়া অ্যাংকরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, জাহাজটি নির্ধারিত সময়ের আগেই আনার চেষ্টা চলছে। কোনো জটিলতা না হলে ৭ মে রিফাইনারি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা করছেন।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমডোর মাহমুদুল মালেক জানান, জাহাজটি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই ক্রুড লাইটারিং কার্যক্রম শুরু হবে। এজন্য আগাম দুটি লাইটারেজ জাহাজ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মে মাসেই আরও দুই লাখ টন অপরিশোধিত তেল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ টন আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দর থেকে এবং আরেক লাখ টন সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে।
ফুজাইরা বন্দরকে বর্তমানে বিকল্প ও নিরাপদ রুট হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কারণ এই বন্দর থেকে জাহাজগুলোকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে হয় না। ফলে যুদ্ধ ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। একইভাবে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরও এখন বিকল্প রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশ্বের মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের বড় একটি অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এই রুটে যেকোনো অস্থিরতা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে প্রভাব ফেলে। চলমান সংঘাতের কারণে ইরান ওই প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। এর মধ্যে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করে ইস্টার্ন রিফাইনারি।

