মেধা ও পেশাদারিত্বকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রশাসন সাজানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে তা বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয় আনুগত্য এবং প্রশাসনিক সংস্কৃতির কারণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে গতি পাচ্ছে না নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়া।
বিশ্বের সফল রাষ্ট্রগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দক্ষ প্রশাসনের সমন্বয় থাকলে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ইতিবাচক ফল আসে। উদ্ভাবনী চিন্তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং নাগরিকসেবা নিশ্চিত করার সক্ষমতাই একটি কার্যকর প্রশাসনের মূল শক্তি। তবে বাংলাদেশে এই লক্ষ্য অর্জন এখনও কঠিন হয়ে আছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সরকার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসে ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ কমানো এবং বিভিন্ন দপ্তরে কর্মকর্তাদের বদলি শুরু হয়েছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য ব্যক্তি বাছাই করতে গিয়ে দেখা দিচ্ছে জটিলতা। অনেক কর্মকর্তার গোপনীয় মূল্যায়ন সন্তোষজনক নয়, আবার যাদের মূল্যায়ন ভালো তাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সচিবসহ উচ্চপদে নিয়োগের গতি কমে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা দিয়ে মেধা নির্ধারণ করা যায় না। একজন কর্মকর্তাকে সঠিক স্থানে বসানো, স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়া এবং তার কাজের মূল্যায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। এ তিনটির সমন্বয় ছাড়া প্রকৃত অর্থে মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ে ওঠে না। কিন্তু বাস্তবে দলীয় আনুগত্যের প্রভাব এখনও প্রবল থাকায় পেশাদারিত্ব অনেক সময় পিছিয়ে পড়ছে।
বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদে মোট ৮১ জন কর্মকর্তা দায়িত্বে রয়েছেন, যার মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থায় নতুন প্রধান নিয়োগ দেয়া হয়েছে, পাশাপাশি কিছু পদে পুনরায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগও দেয়া হয়েছে। এতে একদিকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সুযোগ তৈরি হলেও অন্যদিকে নিয়মিত পদোন্নতির ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে। আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি ছাড়া সীমিত পরিসরে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রশাসনে দক্ষতা নিশ্চিত করতে হলে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও পদ্ধতিগত ও নিরপেক্ষ করতে হবে। কর্মদক্ষতা, সততা এবং অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একটি স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা জরুরি। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ তদন্ত ও যাচাই ব্যবস্থাও জোরদার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবে একটি শক্তিশালী কাঠামোর মধ্যে গড়ে উঠেছে, যা অনেক সময় পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই বাস্তবায়ন হয়নি। কারণ হিসেবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এবং প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধকে দায়ী করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনকে পাশ কাটিয়ে নয়, বরং তাদের অংশীদার করে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় কাঠামোগত পরিবর্তন টেকসই হবে না। একই সঙ্গে প্রশাসনের ভেতরে জবাবদিহিতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে কেন্দ্রীয়করণ বেড়েছে এবং সেবামুখী সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগও প্রশাসনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। শতাধিক প্রস্তাবের মধ্যে অল্প কয়েকটি বাস্তবায়িত হয়েছে, যা পরিবর্তনের গতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে বিদ্যমান শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে পরিবর্তন আনা, অন্যদিকে সেই কাঠামোকে জনগণমুখী ও গতিশীল করে তোলা। প্রশাসন যদি নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান থেকে বেরিয়ে সেবামুখী ভূমিকায় না আসে, তাহলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুফলও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে না।
সরকার বলছে, নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে যেন কোনো ধরনের প্রভাব না থাকে, সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য। মেধাভিত্তিক নীতি বাস্তবায়নে যাচাইয়ের স্পষ্ট মানদণ্ড তৈরি করা হবে। তবে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিকীকরণ থেকে বেরিয়ে এসে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসন গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ এবং কঠিন কাজ বলেও স্বীকার করছেন সংশ্লিষ্টরা। সব মিলিয়ে, কাঙ্ক্ষিত মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গড়ে তুলতে শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তব পদক্ষেপ, স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিক প্রয়াসই এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
সিভি/কেএইচ

